বাংলাদেশের নতুন সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিরা দেশে বাস্তবায়িত কয়েকটি মেগা প্রকল্প নিয়ে কিছু অভিযোগ করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন। বিশ্ব বাস্তবতা, বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় নিজস্ব অর্থায়নে (পুরোপুরি নয়) বাস্তবায়িত পদ্মা বহুমুখী সেতু, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এবং বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু দেশ রাশিয়ার আর্থিক এবং কারিগরি সহায়তায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ দুটি সেরা অর্জন। দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে নানা ধরনের ত্রুটি বিচ্ছুতি, প্রান্তিক পর্যায়ে কিছু দুর্নীতির অভিযোগ ছিল বা আছে। তবে পদ্মা সেতুকে ভারতের ভূপেন হাজারিকা সেতু বা রূপপুর প্রকল্পকে ভারতে বাস্তবায়িত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে তুলনা করে যে অভিযোগ তুলছে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সেটি আদৌ সুবিবেচনাপ্রসূত বা বিচক্ষণতার পরিচয় নয়। কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে হলে সঠিক তথ্য জেনে বলাই দূরদর্শী ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক বলে মনে করি। আমি দুটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন সময় থেকেই প্রকল্প দুটি বিষয়ে ব্যক্তিগত তাড়নায় বিস্তারিত জানতে, শিখতে চেষ্টা করেছি। সেই সূত্রে আমি এখানে কিছু ভুল তথ্য খণ্ডন করবো। প্রথমে পদ্মা সেতু নিয়ে কথা বলি। পর্যায়ক্রমে অন্যা মেগা প্রকল্প আলোচনায় আনবো।
পদ্মা বহুমুখী সেতু
ইতিমধ্যে সবাই জেনেছে প্রমত্ত পদ্মা বিশ্বের অন্যতম খরস্রোতা নদী। বর্ষাকালে পদ্মা নদী দিয়ে যে পরিমাণ পানি উজান থেকে ভাটিতে বঙ্গোপসাগরে প্রবাহিত হয় সেটি শুধু মিসিসিপি নদীর সঙ্গেই তুলনীয়। নদীটি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ৪০ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে দেশের কেন্দ্রীয় অঞ্চল এবং উত্তরাঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। দেশের সুষম উন্নয়নের ক্ষেত্রেও ছিল বিশাল প্রতিবন্ধক। সেই সেতুর বাস্তবায়ন শুরুর প্রাথমিক পর্যায়ে ভুল অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে উন্নয়ন সহযোগীরা বিশ্বব্যাংক, এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক অর্থায়ন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিল। একটি কানাডিয়ান পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ কানাডার আদালতেই ভুল বলে প্রমাণিত হয়। বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই ছিল যুগান্তকারী পদক্ষেপ আর সে প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন। এখন আসুন, পদ্মা সেতুর সঙ্গে ভারতের ভূপেন হাজারিকা সেতুর তুলনা প্রসঙ্গে। প্রিয় পাঠক পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন কাজে অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব বুয়েটের সনামধন্য অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী ছিলেন আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক। নানা সময়ে তার কাছ থেকে প্রকল্পের খুঁটিনাটি কারিগরি দিক, নির্মাণ কৌশল, জটিল কারিগরি চ্যালেঞ্জ বিষয়ে জেনেছি। প্রকল্প বাস্তবায়নকালে দায়িত্বপ্রাপ্ত কেবিনেট সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম থেকেও জেনেছি, প্রকল্প বাস্তবায়নকালে কয়েকবার নির্মাণকাজ পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি এবং চাইনিজ নির্মাণকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছি। নিজের অর্জিত অভিজ্ঞতা থেকে লিখছি পদ্মা সেতুর সঙ্গে ভারতের ভূপেন হাজারিকা সেতুর তুলনাই চলে না। এ দুই প্রকল্পের প্রকৌশল বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা। পদ্মা সেতু নির্মিত হয়েছে পৃথিবীর অন্যতম খরস্রোতা নদীর ওপর, যেখানে নদীর তলদেশ, স্রোতের গতি, পাইলিং গভীরতা এবং বহুমুখী রেল-সড়কসংযোগ ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জ। ভূপেন হাজারিকা সেতুর পাইল লোড মাত্র ৬০ টন। সেখানে পদ্মা সেতুর পাইল লোড ৮ হাজার ২০০ টন। ভারতের ওই সেতুর একেকটি পিলার ১২০ টনের আর পদ্মা সেতুর একটি পিলার ৫০ হাজার টনের। সে হিসেবে ভারতের সেতুটির চেয়ে পদ্মা সেতু ১৩৩ গুণ বেশি শক্তিশালী। অন্যদিকে ভূপেন হাজারিকা সেতু ছিল কেবল সড়ক সেতু। পদ্মা সেতুতে ৪২টি পিলারের প্রতিটির নিচে ৩৫০-৪০০ ফুট গভীরে পাইল বসানো হয়েছে, যা বিশ্বে অন্যতম জটিল নদী প্রকৌশল কাজ হিসেবে স্বীকৃত।
সেতু বিভাগের আয়-ব্যয়ের হিসাবে দেখা যায়, মূল সেতুতে খরচ হয়েছে ১২ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা। ভূমি অধিগ্রহণ ও নদীশাসনসহ অন্য সবকিছু নিয়ে পুরো প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা।
প্রাথমিক পরিকল্পনায় সেতুর দৈর্ঘ্য ধরা হয়েছিল ৫ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার, যা পরে বেড়ে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। অর্থাৎ পানির উপরিভাগের সেতুর দৈর্ঘ্য শূন্য দশমিক ৫৭ কিলোমিটার বেড়ে যায়। কিন্তু পানির বাইরেও ভায়াডাক্টসহ সেতুর কিছু অংশ আছে, এটি সংযোগ সড়ক নয়, সেতুরই অংশ। পানির বাইরে ভায়াডাক্টসহ সেতুর দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৬৯ কিলোমিটার। পানির অংশ এবং পানির বাইরের অংশসহ পুরো সেতুর দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ৮৪ কিলোমিটার। পানির ওপরের অংশে মূল সেতুতে শূন্য দশমিক ৫৭ কিলোমিটার বেড়ে যাওয়ায়, পানির বাইরের অংশসহ পুরো সেতুর দৈর্ঘ্য আসলে ১ কিলোমিটারের বেশি বেড়ে যায়।
প্রাথমিক পরিকল্পনায় সেতুর ৪১টি স্প্যানের মধ্যে তিনটি স্প্যান একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় রাখার ব্যবস্থা ছিল, জাহাজ চলাচলের জন্য। পরবর্তী সময়ে সংশোধিত বাজেটে ৪১টি স্প্যানেরই উচ্চতা বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
ভূপেন হাজারিকা এবং পদ্মা সেতুর খরচের সঙ্গে তুলনা
ভূপেন হাজারিকা সেতু একতলা, অন্যদিকে পদ্মা সেতু দোতলা। ভূপেন হাজারিকা সেতুর প্রস্থ ১৩ মিটার, অন্যদিকে পদ্মা সেতুর প্রস্থ ১৮ দশমিক ১০ মিটার। ভূপেন হাজারিকা সেতুর পাইল লোড ক্ষমতা ৬০ টনের কিছু বেশি, অন্যদিকে পদ্মা সেতুর পাইল লোড ক্ষমতা ৮ হাজার ২০০ টন। ভূপেন হাজারিকা সেতুর ওজন নেওয়ার ক্ষমতা ৬০ টন, অন্যদিকে পদ্মা সেতুর ওজন নেওয়ার ক্ষমতা ১০ হাজার টন। ভূপেন হাজারিকা সেতুর পিলারের ওজন ১২০ টন, অন্যদিকে পদ্মা সেতুর পিলারের ওজন ৫০ হাজার টন।
দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, পাইল লোড ক্ষমতা, পিলারের ওজন, সেতু ওজন নেওয়ার ক্ষমতা-এগুলো সবকিছু হিসাব করলে পদ্মা সেতু ভূপেন হাজারিকা সেতুর থেকে ১৩৩ গুণ ভারী এবং শক্তিশালী একটি সেতু। সেই হিসাবে পদ্মা সেতু নির্মাণের ব্যয় হওয়া উচিত ছিল ভূপেন হাজারিকা সেতু নির্মাণ ব্যয়ের থেকে ১৩৩ গুণ বেশি। কিন্তু তা হয়নি, কারণ এ হিসাবগুলো সাধারণ ঐকিক নিয়মে হয় না।
পদ্মা বহুমুখী সেতুর সফল বাস্তবায়নে এখন বৃহত্তর ফরিদপুর, বরিশাল বিভাগ, খুলনা বিভাগের বিপুল জনগোষ্ঠী স্বল্প সময়ে সহজেই ঢাকাসহ সারা দেশে যাতায়াত করতে পারছে। দক্ষিণ বাংলায় উৎপাদিত কৃষিপণ্য, মাছ, ফলমূল সহজে বিপণন কেন্দ্রে পৌঁছতে পারছে। উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিমে সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়নের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সেতুতে সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি রেলসংযোগ থাকায় রেল যোগাযোগেও ব্যাপক উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সেতু বরাবর গ্যাস পাইপলাইন নির্মিত হওয়ায় অদূর ভবিষ্যতে দক্ষিণ বাংলা পাইপলাইন গ্যাস গ্রিডের আওতায় আসবে। আর এ প্রকল্পের সুবাদে পটুয়াখালীর পায়েরা আর বাগেরহাটের রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে।
হতে পারে প্রান্তিক পর্যায়ে ইট, বালু, পাথর, সিমেন্ট সরবরাহে অথবা মূল ঠিকাদারের উপ ঠিকাদার নির্বাচনে অনিয়ম দুর্নীতি হয়েছে। কিন্তু সেটি বিশাল কর্মযজ্ঞের ক্ষেত্রে বিশেষত প্রকল্প খরচে প্রভাব ফেলেনি। আমি পদ্মা সেতুর সঙ্গে ভারতের ভূপেন হাজারিকা সেতুর তুলনা নিতান্তই বালখিল্যতা মনে করি। বিএনপি জোট সরকার এখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে। দুর্নীতি দমন সংস্থাসহ সকল গোয়েন্দা সংস্থা সরকারের অধীনে। আমি অনুরোধ জানাবো শীর্ষ পর্যায় থেকে দুর্বল যুক্তির ভিত্তিতে সমালোচনা না করে প্রয়োজনে অনুসন্ধান করে জাতির কাছে সঠিক তথ্য তুলে ধরার। জনগণের মত সরকার কিন্তু পদ্মা সেতুসহ সব মেগা প্রকল্পের সুবিধা ভোগ করছে।