মার্কিন কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালিব আবারও ‘চলমান নাকবা’ এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের অধিকারের স্বীকৃতি দিয়ে একটি প্রস্তাব কংগ্রেসে উত্থাপন করেছেন। ১৫ মে নাকবার ৭৮তম বার্ষিকী উপলক্ষে এ প্রস্তাব পুনরায় কংগ্রেসে আনা হয়। ‘নাকবা’ শব্দের অর্থ আরবিতে ‘বিপর্যয়’। ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৯ সালের মধ্যে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় প্রায় সাড়ে ৭ লাখ ফিলিস্তিনি তাদের বাড়িঘর ও ভূমি থেকে উচ্ছেদ হন। শত শত ফিলিস্তিনি গ্রাম ধ্বংস বা খালি করে দেওয়া হয়। সেই ঘটনাকেই ফিলিস্তিনিরা নাকবা নামে স্মরণ করে।
রাশিদা তালিব বলেন, ‘নাকবা কখনো শেষ হয়নি। আজ গাজায় গণহত্যা, পশ্চিম তীর ও জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ এবং লেবাননের শরণার্থী শিবিরে হামলার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও তার মন্ত্রিসভা গাজা দখল, স্থায়ী সামরিক নিয়ন্ত্রণ এবং ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে আসছে। তালিব বলেন, প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব কেবল ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের অধিকারের স্বীকৃতির মাধ্যমে।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ, ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ধ্বংস, কৃষিজমি দখল এবং বসবাসের অধিকার বাতিলের মাধ্যমে ‘জাতিগত নিধন’ চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে গাজায় চলমান যুদ্ধ ও মানবিক সংকটকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রস্তাবে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘ পরিচালিত সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর জন্য মার্কিন সহায়তা পুনর্বহালের আহ্বান জানানো হয়েছে। সংস্থাটি গাজা, পশ্চিম তীর, জর্ডান, সিরিয়া ও লেবাননে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থীকে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও খাদ্য সহায়তা দিয়ে থাকে।
এ প্রস্তাবে সহ-স্পন্সর হিসেবে যুক্ত হয়েছেন কংগ্রেসের প্রগতিশীল শাখার বেশ কয়েকজন সদস্য। তাদের মধ্যে রয়েছেন আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কোরতেজ, ইলহান ওমর, আয়ানা প্রেসলি, সামার লি, বেটি ম্যাককলাম এবং হেসুস ‘চুই’ গার্সিয়া।
প্রস্তাবটির পক্ষে ইতোমধ্যে ১০০টিরও বেশি মানবাধিকার, শান্তি, শিক্ষাবিষয়ক, ধর্মীয় ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক সংগঠন সমর্থন জানিয়েছে। সমর্থনকারী সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে কেয়ার, কোডপিঙ্ক, জিউইশ ভয়েস ফর পিস অ্যাকশন, অ্যামেরিকান মুসলিমস ফর প্যালেস্টাইন, ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা, ইউএস ক্যাম্পেইন ফর প্যালেস্টিনিয়ান রাইটস অ্যাকশন, ফ্রেন্ডস কমিটি অন ন্যাশনাল লেজিসলেশন এবং জাস্টিস ফর প্যালেস্টাইনসহ আরো বহু সংগঠন।
মার্কিন মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন কেয়ার এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। সংগঠনটির সরকারি বিষয়ক পরিচালক রবার্ট এস ম্যাকক’ বলেন, আমেরিকান জনগণের মধ্যে নাকবা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ছে এবং ফিলিস্তিনিদের ইতিহাস ও অধিকার নিয়ে আলোচনা থামিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনীতিতে ফিলিস্তিন ইস্যুতে বাড়তে থাকা জনসমর্থন ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।
নাকবার ৭৮ বছর : নিউ ইয়র্ক-ওয়াশিংটনসহ যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভ, গাজা যুদ্ধ বন্ধের দাবি
ফিলিস্তিনিদের ‘নাকবা’ বা মহাবিপর্যয়ের ৭৮তম বার্ষিকী উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ ও সংহতি সমাবেশে অংশ নিয়েছেন। শনিবার রাতজুড়ে নিউ ইয়র্ক সিটি, ওয়াশিংটন ডিসি এবং আরো কয়েকটি শহরে অনুষ্ঠিত এসব কর্মসূচি চলতি বছরে নাকবা স্মরণে আয়োজিত সবচেয়ে বড় জনসমাবেশগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিক্ষোভকারীরা ফিলিস্তিনের পতাকা বহন করেন এবং রাইট অব রিটার্ন বা নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার অধিকারের প্রতীক হিসেবে বিশাল চাবির প্রতিরূপ প্রদর্শন করেন। সমাবেশে গাজা উপত্যকার মানুষের প্রতি সংহতি, জেরুজালেম ও আল আকসা মসজিদ রক্ষার আহ্বান এবং ইসরাইলি দখল ও সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দেওয়া হয়।
নিউ ইয়র্কে বিক্ষোভকারীরা প্রথমে ওয়াশিংটন স্কয়ার পার্কে জড়ো হন। পরে সেখান থেকে একটি বিশাল মিছিল নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। বক্তারা তাদের বক্তব্যে ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের ইতিহাস এবং বর্তমানে গাজায় চলমান যুদ্ধ ও মানবিক সংকটের মধ্যে সম্পর্ক তুলে ধরেন। তারা বলেন, নাকবা কেবল অতীতের একটি ঘটনা নয়, বরং ফিলিস্তিনিদের জন্য এখনও চলমান বাস্তবতা।অনেক অংশগ্রহণকারী হাতে বড় আকারের প্রতীকী চাবি বহন করেন, যা ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের হারিয়ে যাওয়া বাড়িতে ফিরে যাওয়ার অধিকারের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর অনেকেই এখনো তাদের পূর্বপুরুষদের বাড়ির চাবি ও জমির দলিল সংরক্ষণ করে রেখেছেন।
ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসের নিকটে অনুষ্ঠিত আরেকটি সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা গাজায় যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তারা জেরুজালেমের মুসলিম ও খ্রিস্টান ধর্মীয় পবিত্র স্থানগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি তোলেন। বক্তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার রক্ষায় আরো কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
আয়োজকরা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের এসব কর্মসূচি বিশ্বব্যাপী নাকবা স্মরণে চলমান আন্তর্জাতিক প্রচারণার অংশ। তাদের দাবি, ফিলিস্তিনি জনগণের মানবাধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও জনমত চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় প্রায় সাড়ে সাত লাখ ফিলিস্তিনি নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বা উৎখাত হতে বাধ্য হন। সেই ঘটনাকে ফিলিস্তিনিরা নাকবা বা মহাবিপর্যয় হিসেবে স্মরণ করে থাকে। ৭৮ বছর পরও বাস্তুচ্যুতি, দখল ও সংঘাতের অবসান না হওয়ায় নাকবার স্মৃতি এখনও ফিলিস্তিনি জাতিসত্তার কেন্দ্রীয় অংশ হয়ে রয়েছে।