বিদ্যুৎ মূল্য সমন্বয়ে অনন্যোপায় সরকার


সালেক সুফী , আপডেট করা হয়েছে : 27-05-2026

বিদ্যুৎ মূল্য সমন্বয়ে অনন্যোপায় সরকার

জ্বালানি মহাসংকট আর আমলানিয়ন্ত্রিত জ্বালানি বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার কারণে বিদ্যুৎ খাত আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ায় বিপুল দেনার দায়ে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহ সংস্থা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। সরকারের পক্ষে বিশাল সাবসিডি দিয়ে বিপিডিকে সমর্থন দেওয়া একপ্রকার সাধ্যের বাইরে চলে গেছে। এমনিতেই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে ভয়াবহ জ্বালানি সংকট থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটে বাংলাদেশের ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতি। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রিণহীনতার পথে নতুন সরকার ইতিমধ্যে কয়েক বিভিন্ন জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি করেছে। সরকার জানে এ মুহূর্তে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি হলে চক্রাকারে সবকিছুর মূল্য বেড়ে যাবে, সৃষ্টি হবে নতুন করে মুদ্রাস্ফীতি। বিদ্যুৎ জ্বালানি সরবরাহ চেনে ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানাগুলো পরিচালনা, সার উৎপাদন সব ক্ষেত্রে সংকট। এমনি অবস্থায় বিদ্যুতে বাড়তি মূল্য হবে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। সরকার নিজস্ব জ্বালানির জোগাড় বাড়াতেও সময় লাগবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিও সময়সাদ্ধ বিষয়। এ মুহূর্তে বিদ্যুতের মূল্য যৌক্তিক পরিমাণ বৃদ্ধি ছাড়া গত্যান্তর নেই সরকারের। 

জ্বালানি তেলের পর এবার বিদ্যুতের দাম বাড়াতে চায় সরকার। দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এর পরিপ্রেক্ষিতে পাইকারি পর্যায়ে ১৭ থেকে সর্বোচ্চ ২১ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। প্রস্তাব আমলে নিয়ে কারিগরি কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব আমলে নিয়েছে বিইআরসি। পাইকারির সঙ্গে সমন্বয় করে আনুপাতিক হারে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোরও প্রস্তাব করেছে পিডিবি। 

সবশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয় নির্বাহী আদেশে। পাইকারি পর্যায়ে ৫ শতাংশ ও গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ৮ শতাংশ বাড়ে দাম। প্রতি ইউনিট খুচরা বিদ্যুতের দাম গড়ে এখন ৮ টাকা ৯৫ পয়সা। আর পাইকারি বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ৪ পয়সা। 

জানা আছে বিদ্যুৎ জ্বালানির মূল্য পরিস্থিতি বিবেচনা করে মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ম্যান্ডেট আছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের ২০০৯-২০২৪ শাসন আমলের শেষদিকে সরকার বার্ক অ্যাক্ট সংশোধন করে সরকারি আদেশে মূল্যবৃদ্ধির সংস্থান করেছিল। বিষয়টি নিয়ে জন মনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়ায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বের অন্তর্বর্তী সরকার বার্ক অ্যাক্টের সংশোধন বাতিল করে বার্কের এখতিয়ার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছে। বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি উৎপাদন এবং সরবরাহ সংস্থাগুলোর প্রস্তাব পরীক্ষার পর গণশুনানি করে বার্ক দরপ্রস্তাব সমন্বয় নির্ধারণ করে সরকারের কাছে সুপারিশ করবে। 

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সিস্টেমে বিবিডিবি একক ক্রেতা। সরকারি-বেসরকারি সব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চুক্তি অনুসারে নির্ধারিত দামে বিদ্যুৎ কিনে নেয় পিডিবি। এরপর তারা উৎপাদন খরচের চেয়ে কিছুটা কমে সরকার নির্ধারিত পাইকারি দামে ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার কাছে বিক্রি করে। ঘাটতি মেটাতে পিডিবি সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি নেয়। তবে বিতরণ সংস্থাগুলো কোনো ভর্তুকি পায় না। তারা খুচরা দামে ভোক্তার কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করে মুনাফা করছে। 

বিদ্যুৎ সংস্থার প্রস্তাব বিবেচনায় নিয়ে নিজেদের পর্যালোচনার পর পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পক্ষে সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গঠিত কারিগরি কমিটি। পাইকারি দাম বাড়লে ভোক্তা পর্যায়েও দাম বাড়াতে হবে। এটি মূল্যস্ফীতি আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই দাম বাড়ানোর বিরোধিতা করে ভোক্তা প্রতিনিধিরা বলেছেন, বিদ্যুৎ খাতের অযৌক্তিক খরচ ভোক্তার ওপর চাপানো যাবে না। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে ভোক্তাদের পক্ষ থেকে জোরালো দাবি তোলা হয়েছে অপচয় সীমিত করে বিকল্প উপায়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার। ভোক্তারা দাবি করেছে বিদ্যুতের প্রকৃত চাহিদা এবং প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না করেই পূর্ববর্তী সরকার অস্বচ্ছ উপায়ে একের পর এক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্লান্ট স্থাপন করেছে। দেশের জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধি অবহেলা করে বিশেষ মহলের স্বার্থে আমদানিকৃত জ্বালানিকে প্রাধান্য দিয়ে জেনে শুনে আগুনে ঝাঁপ দিয়েছে। বিশ্ব বাজারে জ্বালানি মূল্য আকাশ ছুঁয়েছে। যুদ্ধের করাণে সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়েছে। ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি গ্রিড সংযুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা নিয়েও ধারাবাহিকভাবে ১৬ হাজার মেগাওয়াট সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে ভদ্রে যেমন ২০ মে ২০২৬ রাত ৯টায় পিক চাহিদা সময়ে সর্বোচ্চ ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদিত হয়েছে। প্রায় ৫০ শতাংশ উৎপাদন ক্ষমতা অলস থাকায় চুক্তি অনুযায়ী বিপিডিকে বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ দণ্ড দিতে হচ্ছে। সরকারের ভুলে বিপুল দেনার দায়ে ভুগছে বিপিডিবি। সরকারকে সাবসিডি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হচ্ছে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা। তবে এ দায় ভোক্তাদের নয়। তাই দায় ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সমর্থনযোগ্য সমাধান হতে পারে না। 

পরিস্থিতি বিবেচনায় বিকল্পগুলো হচ্ছে দেশের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদ গ্যাস, কয়লা উত্তোলন এবং ব্যবহারের কার্যকরি পদক্ষেপ দ্রুত নেওয়া আর নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান দ্রুত বাড়ানো। কিন্তু কাজগুলো সহজ নয় আর সময়সাপেক্ষ। কিন্তু সরকার সর্বোচ্চ উদ্যোগ গ্রহণ করে জ্বালানি বিদ্যুৎ খাতে অপচয় সীমিত করতে বাড়ে। জ্বালানি বিদ্যুৎ ব্যবহারে দক্ষতা বাড়াতে পারে। দেশে ব্যাটারি চালিত যান বাহনের বিশাল অংশ অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে। রাতের আঁধারে যান বাহনগুলো বিদ্যুৎ গ্রহণ করে রাত ১২টার পরও সিস্টেম পিক চাহিদা দেখা যাচ্ছে। যদিও এ সময়ে লাইটিং লোড না থাকায় চাহিদা কম হবার কথা। 

জানি অপচয় কমালে এবং দক্ষতা বাড়ালেই বিপুল ঘাটতি পূরণ করা যাবে না। তবুও যতটুকু সম্ভব বিদ্যুৎ সরবরাহ বাবদ সরকারের আয় বাড়ানো গেলে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সহনীয় পর্যায়ে রাখা যাবে। প্রান্তিক গ্রাহকদের মূল্যবৃদ্ধি না করে বড় গ্রাহক এবং শিল্পগ্রাহকদের ক্ষেত্রে সীমিত পরিমাণে মূল্যবৃদ্ধি ছাড়া কোনো উপায় নেই এখন। তবে দেখতে হবে এ মূল্যবৃদ্ধি যেন অন্যান্য সংযুক্ত খাতে মূল্যবৃদ্ধি করে মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টি না করে একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষত সৌরবিদ্যুতের উপকরণসমূহের ওপর আমদানি শুল্ক ৫ বছরের জন্য অব্যাহতি দিয়ে এবং অন্যান্য প্রণোদনা দেওয়া হলে ২০২৭ নাগাদ সৌরবিদ্যুৎ থেকেই ২ হাজার মেগাওয়াট অবদান সম্ভব। 

অনেকেই আমার সঙ্গে দ্বিমত করবেন কিন্তু বিদ্যমান অবস্থায় বাংলাদেশের আবিষ্কৃত কয়লাসম্পদ উত্তোলন আর ব্যবহার করা ছাড়া বিকল্প নেই। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অনুসদ্ধান করতে হবে জলে স্থলে তেল গ্যাস। বাংলাদেশের জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ মূল্য, কিন্তু কোন মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত নয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশ এমনকি প্রতিবেশী কিছু দেশের চেয়েও আমাদের মূল্য কম। তাই ধীরে ধীরে অল্প অল্প করে আমাদের জ্বালানি মূল্য বাজারভিত্তিক করতে হবে। আবেগের বসে নয়, বাস্তবতার ভিত্তিতে বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকেই বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। 


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)