যুক্তরাষ্ট্রে মুদি পণ্যের দাম গত কয়েক বছরের মধ্যে ২০২৬ সালে সবচেয়ে দ্রুত গতিতে বাড়ছে। সরকারি মূল্যস্ফীতির সর্বশেষ তথ্য বলছে, খাদ্যপণ্যের বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে এবং অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন যে পরিস্থিতি সামনে আরো খারাপ হতে পারে। মে মাসে প্রকাশিত ফেডারেল মূল্যস্ফীতির তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে এক বছর আগের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে মুদি পণ্যের দাম বেড়েছে ২ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২৩ সালের আগস্টের পর এটিই খাদ্যপণ্যে সর্বোচ্চ বার্ষিক মূল্যবৃদ্ধি। বিশেষ করে ফল ও সবজির দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে। টমেটোর দাম গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। খারাপ আবহাওয়া, আমদানি শুল্ক এবং জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়াকে এর পেছনের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো।
একইভাবে আমদানিনির্ভর পণ্য কফির দামও এক বছরে প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়েছে। মাংসের বাজারেও চাপ স্পষ্ট। সামগ্রিকভাবে মাংসের দাম বেড়েছে ৯ শতাংশ, তবে গরুর মাংসের ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধি আরো বেশি। গ্রাউন্ড বিফের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ, বিফ রোস্ট ১৮ শতাংশ এবং স্টেকের দাম ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের কারণে জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। বিশ্ব তেলের একটি বড় অংশ এ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে ডিজেল ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেছে, যার প্রভাব পড়ছে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৮৩ শতাংশ কৃষিপণ্য ট্রাকের মাধ্যমে পরিবহন করা হয়। ডিজেলচালিত ট্রাক, ট্রাক্টর ও মাছ ধরার নৌকার খরচ বাড়ায় খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। অনেক সরবরাহকারী অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় সামাল দিতে নতুন সারচার্জ যোগ করছে। পাশাপাশি আবহাওয়াজনিত সমস্যাও খাদ্যদ্রব্যের দামে চাপ বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলে দীর্ঘ খরার কারণে গবাদিপশু পালনে সমস্যা তৈরি হয়েছে, ফলে গরুর মাংসের দাম বাড়ছে। বৈশ্বিক খরার প্রভাব পড়েছে কফি উৎপাদনেও। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এখনো জ্বালানি ব্যয়ের পুরো প্রভাব বাজারে প্রতিফলিত হয়নি। পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতির অধ্যাপক কেন ফস্টার ও বার্নহার্ড ডালহাইমার বলছেন, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং পরিবহন খরচ বাড়ার প্রভাব সুপারমার্কেটের দামে পুরোপুরি আসতে সাধারণত তিন থেকে ছয় মাস সময় লাগে। বর্তমানে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় যে মূল্যবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে তার বেশিরভাগই ইরান সংঘাতের আগের পরিস্থিতির ফল। তবে জুন ও পরবর্তী মাসগুলোর তথ্য প্রকাশের পর বোঝা যাবে, হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা ও জ্বালানি ধাক্কা খাদ্যদ্রব্যের বাজারে কত বড় প্রভাব ফেলছে।
অর্থনীতিবিদ জাস্টিন উলফার্সও সতর্ক করে বলেছেন, এখন মূল গল্প হচ্ছে তেলের দাম, আর পরবর্তী বড় গল্প হতে যাচ্ছে খাদ্যের দাম। তার ভাষায়, ‘জ্বালানির দাম বাড়লে তার ঢেউ পরিবহন, বিমান জ্বালানি এবং মুদি পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থার সবখানে গিয়ে আঘাত করে। তিনি আরো বলছেন, জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় উঁচুতে থাকলে সার উৎপাদন ও সরবরাহেও সংকট দেখা দিতে পারে। বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ সার হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত সেই চাপ গিয়ে পড়বে ভোক্তাদের ওপর। তবে সব পণ্যের দাম বাড়েনি। ডিমের বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। গত বছরের বার্ড ফ্লু সংকটের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় ডিমের দাম এখন এক বছর আগের তুলনায় প্রায় ৩৯ শতাংশ কমেছে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণায় খাদ্যপণ্যের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে মিশ্র চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন বাজার গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরু থেকে ডিমের দাম কমলেও গরুর মাংস, কমলার জুস, রুটি এবং মুরগির মাংসের দাম বেড়েছে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, গত ছয় বছরে যুদ্ধ, সরবরাহ শৃঙ্খলের সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতা এবং করপোরেট মুনাফা বৃদ্ধির প্রবণতা মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের খাদ্য ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলেছে। এখন মধ্যপ্রাচ্যের নতুন অস্থিরতা সেই সংকটকে আরো গভীর করার আশঙ্কা তৈরি করেছে।