গ্রিসের ইতিহাসের পথে হাঁটতে গেলে কিছু জায়গা আছে যা শুধু ঐতিহাসিক নয়, যেন প্রকৃতি ও মানুষের যৌথ বিস্ময়। এমনই এক স্থান হলো মেটিওরা (Meteora)। ভোরবেলা আমরা যাত্রা শুরু করলাম অ্যাথেন্স থেকে। গন্তব্য উত্তর গ্রীসের পাহাড়ি শহর কালামবাকা (Kalambaka)-যার মাথার উপর আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেটিওরার পাথরের স্তম্ভগুলো।
ট্রেনের জানালার বাইরে দ্রুত পাল্টে যাচ্ছিলো দৃশ্য। শহরের কংক্রিট ছেড়ে গ্রাম, পাহাড় আর সবুজ উপত্যকা। আমার সঙ্গে ছিল তরুণী গাইড মারিয়া। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলে, মেটিওরা শব্দের অর্থ আকাশে ঝুলে থাকা। আমি অবাক হয়ে বললাম, শুনেই রহস্যময় লাগছে। মারিয়া হেসে বললো, দেখলে আরো অবাক হবে। কয়েক ঘণ্টা পর ট্রেন পৌঁছলো কালামবাকা শহরে। স্টেশন থেকে বের হতেই দূরে দেখা গেল বিশাল পাথরের স্তম্ভ-যেন পৃথিবী থেকে আকাশের দিকে উঠে গেছে। এ পাথরের মাথায় দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন মঠ। শত শত বছর আগে সন্ন্যাসীরা পাহাড়ের মাথায় এ মঠগুলো তৈরি করেছিলেন।
এ অসাধারণ প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য ইউনেসকো ১৯৮৮ সালে মেটিওরাকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। মারিয়া জানায়, এক সময় এখানে ২৪টি মঠ ছিল। এখন টিকে আছে মাত্র কয়েকটি। আমরা গাড়ি করে উঠে গেলাম পাহাড়ি পথে। সামনে দেখা গেল বিখ্যাত মঠ-Great Meteoron Monastery। উঁচু পাথরের মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা এই মঠ যেন আকাশের সঙ্গে কথা বলছে। মারিয়া জানায়, আগে এখানে উঠতে হতো দড়ির জাল বা ঝুড়ি দিয়ে। এখন অবশ্য পাথর কেটে সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে। উপরে উঠে চারদিকে তাকাতেই মনে হলো, পৃথিবীর সব দৃশ্য যেন নিচে রেখে আমরা আকাশের কাছে চলে এসেছি। আমি বললাম, এতো উঁচুতে মঠ তৈরির সাহস কীভাবে পেলো মানুষ? মারিয়া বললো, সন্ন্যাসীরা বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বরের কাছে থাকতে হলে পৃথিবী থেকে একটু দূরে যেতে হয়।
মঠের বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচে তাকালে দেখা যায়, সবুজ উপত্যকা আর ছোট ছোট গ্রাম। বাতাসে শুধু পাখির ডাক আর পাহাড়ের নীরবতা। আমি বললাম, এমন জায়গায় দাঁড়ালে মনে হয় পৃথিবীর সব কোলাহল অনেক দূরে। মারিয়া হেসে বললো, এ নীরবতার জন্যই সন্ন্যাসীরা এখানে এসেছিলেন।
বিকালের দিকে আমরা পাহাড়ের নিচে একটি ছোট ক্যাফেতে বসলাম। সামনে পাথরের স্তম্ভগুলো সূর্যের শেষ আলোয় লালচে হয়ে উঠেছে। ওয়েটার পরিবেশন করলো গরম গ্রিক কফি আর মধু মেশানো পেস্ট্রি। মারিয়া বললো, মেটিওরায় সূর্যাস্ত অনেকেই জীবনের সেরা দৃশ্য বলে মনে করে।
রাত নামার আগে আমরা আবার ট্রেনে উঠলাম অ্যাথেন্সের পথে। জানালার বাইরে ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে এলো। কিন্তু মনে হচ্ছিলো সে পাথরের স্তম্ভগুলো এখনো আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।