নিউ ইয়র্কের স্কুলগুলোতে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার এক বছর পূর্তিতে প্রকাশিত নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য এ নীতি ইতিবাচক ফল বয়ে এনেছে। গভর্নর ক্যাথি হোচুল গত সোমবার ব্রুকলিনের ব্রুকলিনের জুনিয়র হাই স্কুল ৩৮৩ ফিলিপা স্কাইলার স্কুল-এ অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে জানান, শ্রেণিকক্ষে মোবাইল ফোনের ব্যবহার বন্ধ হওয়ার ফলে শিক্ষার্থীরা এখন বেশি মনোযোগী, পরস্পরের সঙ্গে বেশি যোগাযোগ করছে এবং স্কুলে বুলিংয়ের ঘটনাও কমেছে।
গভর্নরের কার্যালয়ের পরিচালিত জরিপে নিউ ইয়র্ক স্টেটের ৫৮৫ জন শিক্ষক ও স্কুল প্রশাসক অংশ নেন। তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ বলেছেন, মোবাইল ফোন নিষেধাজ্ঞা তাদের স্কুলে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। প্রায় ৭৬ শতাংশ উত্তরদাতা জানান, শিক্ষার্থীদের আচরণ ও শ্রেণিকক্ষে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা এখন নির্দেশনা অনুসরণে বেশি মনোযোগী এবং আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে। গভর্নর হোচুল বলেন, আমি প্রায় পাঁচ বছর ধরে গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। এই সময়ে যেসব উদ্যোগ নিয়েছি, তার মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত এবং দৃশ্যমান ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে স্কুলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা আবারও শিশুদের মতো আচরণ করছে, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছে এবং শ্রেণিকক্ষে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে।
জরিপে আরো দেখা গেছে, ৮০ শতাংশ শিক্ষক ও প্রশাসক মনে করেন মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ হওয়ার ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিক সম্পর্ক উন্নত হয়েছে। এছাড়া ৬০ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, স্কুলে সরাসরি এবং অনলাইনে বুলিংয়ের ঘটনা কমেছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় অর্ধেকই নিউ ইয়র্ক সিটির স্কুলগুলোর প্রতিনিধিত্ব করেছেন। নিউ ইয়র্কে বেল-টু-বেল মোবাইল ফোন নিষেধাজ্ঞা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়। এই নীতির আওতায় শিক্ষার্থীরা স্কুলে প্রবেশের সময় থেকে ছুটি হওয়া পর্যন্ত ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারে না। যদিও কিছু শিক্ষার্থী নিয়ম এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, তবুও শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মতে স্কুলে একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন দেখা গেছে। অনেক শিক্ষার্থী এখন বিরতির সময় মোবাইলের পরিবর্তে বোর্ড গেম খেলছে, ডিজিটাল ক্যামেরা ব্যবহার করছে অথবা বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটাচ্ছে।
নিউ ইয়র্ক সিটি ডিপার্টমেন্ট অব এডুকেশনের স্কুল সেফটি প্রধান মার্ক রামপার্সেন্ট বলেন, আবারও শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ ফিরেছে এবং মানবিক যোগাযোগ ফিরে এসেছে। আমরা দেখছি শিক্ষার্থীরা করিডোরে হাঁটার সময় একে অপরের সঙ্গে কথা বলছে এবং ক্যাফেটেরিয়ায় মেলামেশা করছে, যা বহু বছর ধরে দেখা যায়নি। যদিও এ ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো পরীক্ষার ফলাফলে প্রতিফলিত হবে কিনা তা এখনো স্পষ্ট নয়, গভর্নর হোচুল আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা এখন বেশি মনোযোগ দিচ্ছে, ফলে তারা বেশি শিখছে এবং ভবিষ্যতে পরীক্ষায় আরো ভালো ফল করবে। নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের পরীক্ষার ফলাফল সাধারণত গ্রীষ্মকালে প্রকাশ করা হয়।
অনুষ্ঠানে গভর্নর হোচুল জানান, এ উদ্যোগের পেছনে ছিল শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে তার গভীর উদ্বেগ। কোভিড-১৯ মহামারির পর তিনি লক্ষ্য করেন, অনেক শিক্ষার্থী উদ্বেগ, হতাশা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সমস্যায় ভুগছে। তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও স্কুল প্রশাসকদের সঙ্গে বৈঠক করে জানতে পারেন যে মোবাইল ফোন শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের আসক্তি তৈরি করেছে।
হোচুল স্মরণ করেন, এক মধ্যবিদ্যালয়ের ছাত্রী তাকে বলেছিল যে সারাদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নোটিফিকেশন, বন্ধুদের পরিকল্পনা কিংবা সহপাঠীদের মন্তব্য নিয়ে চিন্তিত থাকতে হয়। সেই ছাত্রী তাকে বলেছিল, আমাদের নিজেদের কাছ থেকে আমাদের বাঁচাতে হবে, আমরা একা পারব না। গভর্নর বলেন, সেই কথাই তাকে ব্যবস্থা নিতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
তিনি আরো বলেন, স্টেটব্যাপি পরিচালিত বিভিন্ন জরিপে ৭২ শতাংশ শিক্ষক জানিয়েছেন যে শ্রেণিকক্ষে মোবাইল ফোনের কারণে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং কার্যকরভাবে পড়ানো কঠিন হয়ে গিয়েছিল। শিক্ষকরা অভিযোগ করেছিলেন যে তারা টিকটক ভিডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আকর্ষণের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারছেন না। প্রাথমিকভাবে অভিভাবক, স্কুল বোর্ড এবং কিছু শিক্ষক এই উদ্যোগের বিরোধিতা করেছিলেন। অনেক অভিভাবক সন্তানদের সঙ্গে সারাদিন যোগাযোগ রাখতে চেয়েছিলেন, আবার কিছু স্কুল প্রশাসক অভিভাবকদের বিরোধিতার আশঙ্কা করেছিলেন। তবে হোচুল বলেন, শিশুদের স্বার্থে তিনি বিরোধিতা উপেক্ষা করে এই নীতি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেন।
মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি নিউ ইয়র্ক শিশু-কিশোরদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আসক্তিকর অ্যালগরিদম নিয়ন্ত্রণে দেশের প্রথম আইনও পাস করেছে। গভর্নর বলেন, শিশুদের অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন ও অনলাইন চাপ থেকে রক্ষা করতে এই আইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।