চারদিকে নীরব এক বার্তা! কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ পূনর্গঠনে স্বচেষ্ট হয়ে উঠছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ইদানিং মিছিলে নামছেন তারা হরহামেশাই। এখানে ব্যানার ট্যানার ফ্যাক্টর না, একটি মিছিলের প্রদর্শনী হবে- যাতে থাকছেন সবাই। যে এলাকায় মিছিল করছেন, তারা সবাই ওই এলাকার তাও না। বিভিন্ন এলাকা থেকে জড়িত হয়ে ওই ঝটিকা মিছিল করে পগাড়পাড়। এভাবে দলটির মধ্যে একটা বার্তা ছড়িয়ে দেয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা তৃণমূলে। এতে জেগে ওঠার একধরনের মানসিকতা তৈরির চেষ্টা। কিছু স্থানে আইনশৃংখলাবাহিনী কাউকে কাউকে আটকে সক্ষম হন। কোথাও আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা টের পাওয়ার আগেই মিলিয়ে যাচ্ছেন তারা।
গত ২০২৪ এর ৫ আগষ্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব। এগিয়ে আসছেন না শেখ হাসিনার পরের যেসব বড় বড় পদপদবীতে থাকা নেতা, তাদের কেউই। কখনও কেউ কেউ ভার্চুয়াল বক্তব্য দেন ঠিকই, সেখানে স্পষ্ট বার্তা শুণ্য। কিছু নির্দেশনা দিয়েই ক্ষ্যান্ত। কিন্তু এগুলো ভালো চোখে দেখছেন না তৃণমূলে। কারণ বিপদে কর্মীদের ফেলে রেখে ফ্যামিলি, ভাইব্রাদার নিয়ে চলে গেছেন নিরাপদ স্থানে। সে ক্ষোভ এখনও বিরাজ করছে।
তবে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব শেখ হাসিনাই সম্ভবত শেষ ভরসা! শোনা যাচ্ছে সংগঠিত হওয়ার নির্দেশনা তারই। এ ব্যাপারে ভারতের এক পত্রিকায় দীর্ঘ এক ইন্টারভিউও তিনি দিয়েছেন। সেখানে তিনি স্পষ্ট করে যা বলেছেন, তার সারমর্ম রাজনীতি ছেড়ে দেয়ার ইচ্ছা এক্ষুনি তার নেই। এমনকি বাংলাদেশের মানুষ শেখ হাসিনা সরকারের প্রয়োজনীয়তাও ভীষণভাবে অনুধাবন করছেন!
বাংলাদেশেও এর একটি প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে গভীর রাত হলেই আত্মগোপনে থাকা বিভিন্ন অ্যাপ নির্ভর চ্যাটিং গ্রুপ, যেমন ওয়াটসঅ্যপ, ইনস্টাগ্রাম, টেলিগ্রাম, জুম, সিগনাল, ইমো প্রভৃতি অ্যাপ ব্যাবহার করে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে শুরু করে থানা, উপজেলা, তথা তৃণমূলের আত্মগোপনে থাকা নেতৃবৃন্দ, কর্মীরা শুরু করেন নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ। রাত যত গভীর, আলোচনাও তত বেশি। চলে ভোররাত অব্দি। এখানে নিজেদের সুবিধা অসুবিধা থেকে শুরু করে দলীয় কার্যক্রম, সংগঠিত হওয়া সব কিছুই আলোচিত হতে থাকে ব্যপকভাবে। এভাবেই সংগঠিত হচেছ দলটি।
রাজনীতির মাঠে যখন ক্ষমতায় টিকে থাকা ও ক্ষমতায় যাওয়ার ও সরকারের ভুলত্রুটি ও বিভিন্নভাবে বিষোদগারের চেষ্টা করছে সরকার ও বিরোধী পক্ষ, তখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড নিয়ে কারো কোনো মাথা ব্যাথা নেই। এ সুযোগটা তারা কাজে লাগাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে।
সদ্য বাংলাদেশের একটি সংবাদ মাধ্যমে রিপোর্ট হয়েছে, তাতে সেখানে বলা হয়েছে, স্বয়ং শেখ হাসিনা তৃণমূলে সংগঠন সক্রিয় করণের কাজ করে যাচ্ছেন। এমনকি বিপদের সময় যে নেতা যতটা কার্যকরি ও সক্রিয় হবেন তিনিই হবেন ওই এলাকার নেতা। এভাবে প্রতিটা স্থানে প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে দিয়েছেন তিনি কৌশলে।
২৪ জুলাই আন্দোলনে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন আ.লীগ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতৃত্ব পুরোপুরি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে দলটির রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলেও, রাজনৈতিক মহলের চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘ দের বছরের বেশি সময় পর ভেতরে ভেতরে আবারও সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে দলটি। মাঠপর্যায়ে প্রকাশ্য বড় কোনো কর্মসূচি না থাকলেও, গভীর রাতের ভার্চুয়াল যোগাযোগ এবং আকস্মিক ‘ঝটিকা মিছিলের’ মাধ্যমে দলটিকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি সুক্ষ্ম মানসিকতা তৈরি করা হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে আওয়ামী লীগকে নিষ্ক্রিয় মনে হলেও তাদের এই নতুন কৌশলটি গভীর উদ্বেগের এবং সুদূরপ্রসারী।
‘হিট অ্যান্ড রান’ বা ঝটিকা মিছিলের নতুন কৌশল
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে হঠাৎ করেই নিষিদ্ধ এই দলটির ব্যানারে কিছু ঝটিকা মিছিল দেখা যাচ্ছে। এই মিছিলগুলোর ধরন বিশ্লেষণ করলে একটি বিশেষ প্যাটার্ন লক্ষ্য করা যায়:
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, যে এলাকায় মিছিল হচ্ছে, তার সিংহভাগ কর্মীই ওই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা নন। বিভিন্ন এলাকা থেকে গোপন বার্তার মাধ্যমে নির্দিষ্ট একটি পয়েন্টে কর্মীদের জড়ো করা হয়। ৫ থেকে ৭ মিনিটের মধ্যে ঝটিকা মিছিল শেষ করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আসার আগেই কর্মীরা দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। এর মূল উদ্দেশ্য জনমনে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়া, ভিডিও ধারণ, ছবি সংগৃহ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া তথা অণ্যান্য কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করণ।
গভীর রাতের ‘ভার্চুয়াল কন্ট্রোল রুম’
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া এখন আর কোনো স্থায়ী কার্যালয় বা সশরীরে বৈঠকের ওপর নির্ভরশীল নয়। প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে তৃণমূলের আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখা হচ্ছে। ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, সিগন্যাল, ইনস্টাগ্রাম এবং জুম প্রভৃতি অ্যাপে এসব মিটিংগুলো চলে বলে জানা গেছে।
এসব আলোচনার নির্দিষ্ট কোনো বিষয়বস্তু নেই। নিজেদের মধ্যে ঐক্য বাড়ানো। এক জনের সুবিধা অসুবিধায় অন্যকে সহায়তা দান। ইউনিয়ন, থানা এবং উপজেলা পর্যায়ের আত্মগোপনে থাকা নেতাদের খোঁজখবর নেওয়া, কার কী আইনি বা আর্থিক সুবিধা প্রয়োজন তা নির্ধারণ এবং ভবিষ্যৎ দলীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া। জানা গেছে, এসব দলের শীর্ষ পদ থেকেই এভাবে ঐক্য বাড়ানোর, সক্রিয় হওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক শূন্যতা ও কৌশলগত অবস্থান
বর্তমানে দেশের মূল ধারার রাজনীতিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, বিএনপি এবং অন্যান্য দলগুলো যখন রাষ্ট্র সংস্কার, স্থানীয় সরকার নির্বাচন, কিংবা পারস্পরিক রাজনৈতিক বাদানুবাদে ব্যস্ত, ঠিক তখন নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এই ভার্চুয়াল কার্যক্রমের দিকে কারোরই তেমন গভীর মনোযোগ নেই। এই রাজনৈতিক মনোযোগহীনতার সুযোগটিই পুরোদমে কাজে লাগাচ্ছে দলটি।
সবশেষ
একটি ঐতিহাসিক এবং দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক দলকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে পুরোপুরি বিলুপ্ত বা নিষ্ক্রিয়করণ করা কঠিন। আওয়ামী লীগ এখন টিকে থাকার জন্য তাদের ঐতিহ্যবাহী ‘গণ-আন্দোলনের’ পথ পরিহার করে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাডারভিত্তিক’ দলের মতো আচরণ করছে। এটাই তাদের সময়ের কৌশল। তবে, এই ধরনের ঝটিকা মিছিল বা রাতের আধারে চ্যাটিং গ্রুপের মাধ্যমে হয়তো কর্মীদের মনবল ধরে রাখা সম্ভব, কিন্তু জনগণের ম্যান্ডেট বা নৈতিক সমর্থন ফিরে পাওয়া অসম্ভব। তবে এমন প্রক্রিয়া ক্রমশ বৃদ্ধি পেলে, এবং রাজনৈতিক দলের থেকে বিভিন্ন উপায়ে যদি ফায়দা বের করে সেটা কাজে লাগায় দলটি। যা ভবিষ্যতে আইন-শৃঙ্খলার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বৈ কি!