যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালত ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির অধীনে নেওয়া একাধিক কঠোর সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে ছিল আশ্রয় আবেদন সম্পূর্ণভাবে স্থগিত করা, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের ৩৯টি দেশের নাগরিকদের অভিবাসন আবেদন, যেমন গ্রিন কার্ড, ওয়ার্ক পারমিট এবং অন্যান্য অভিবাসন সুবিধার সিদ্ধান্তও স্থগিত রাখা, বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অনেক স্থায়ী বাসিন্দার নাগরিকত্ব আবেদনও কার্যত থমকে দেওয়া, পাশাপাশি ‘রি-রিভিউ পলিসি’ নামে একটি নীতির মাধ্যমে ২০২১ সালের পর কিছু অভিবাসী যারা ইতিমধ্যে অনুমোদন পেয়েছিলেন, তাদের কেস আবার নতুন করে যাচাই করার উদ্যোগ নেওয়াকে অবৈধ ঘোষণা করে বড় ধরনের রায় দিয়েছে ইউএস ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট ফর দ্য ডিস্ট্রিক্ট অব রোড আইল্যান্ডের বিচারক জন জে ম্যাককনেল জুনিয়র। গত ৫ জুন তিনি এ রায় দেন। তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া নীতিগুলোকে অভিবাসন আইনের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ এবং বৈষম্যমূলক প্রভাব তৈরি করা বলে উল্লেখ করেন।
এ মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল বিভিন্ন অভিবাসন সহায়তা সংস্থা, শ্রমিক ইউনিয়ন এবং মানবাধিকার সংগঠনের একটি জোটের পক্ষ থেকে। মামলার প্রধান অভিযোগ ছিল ইউএস সিটিজেন অ্যান্ড ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্ট (ইউএসসিআইএস) এমন কিছু নীতি প্রয়োগ করেছে, যার ফলে বৈধভাবে আবেদন করা হাজারো অভিবাসীর কেস বছরের পর বছর ধরে স্থবির হয়ে গেছে। মামলায় উল্লেখ করা হয়, আবেদনকারীরা সব ধরনের আইনি প্রক্রিয়াফরম জমা, ফি প্রদান, বায়োমেট্রিক তথ্য এবং সাক্ষাৎকারসম্পন্ন করলেও তাদের সিদ্ধান্ত আটকে রাখা হয়েছে।
বিচারক ম্যাককনেল তার ১৩৫ পৃষ্ঠার বিস্তারিত রায়ে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির কারণে শুধু আশ্রয় আবেদনই স্থগিত হয়নি, বরং ৩৯টি দেশের নাগরিকদের জন্য সব ধরনের অভিবাসন সুবিধা প্রক্রিয়াকরণও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এসব দেশের বেশিরভাগই আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের। এর ফলে গ্রিনকার্ড, ওয়ার্ক পারমিট এবং নাগরিকত্ব প্রক্রিয়াও কার্যত অচল হয়ে পড়ে। রায়ে আরো উল্লেখ করা হয়, এ নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে বৈধভাবে বসবাসকারী অনেক স্থায়ী বাসিন্দাও নাগরিকত্বের জন্য চূড়ান্ত অনুমোদন পাননি। আদালত বলেছে, এটি প্রশাসনিক বিলম্ব নয় বরং নীতিগতভাবে কার্যকর এক ধরনের স্থগিতাদেশ, যা অভিবাসন আইনকে দুর্বল করে দিয়েছে।
মামলার নথিতে বলা হয়, ২০২১ সালের পর থেকে জমা দেওয়া বহু আবেদন অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে রাখা হয়, যার ফলে লাখো মানুষ কাজের অনুমতি হারান এবং অর্থনৈতিক ও মানসিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন। আদালত এ অবস্থাকে আইনের শাসনের পরিপন্থী বলে মন্তব্য করে। বিচারক ম্যাককনেল তার পর্যবেক্ষণে আরো বলেন, প্রশাসন যে জাতীয় নিরাপত্তা যুক্তি দিয়েছিল, তা এ ধরনের সর্বজনীন স্থগিতাদেশকে ন্যায্যতা দিতে পারে না। তিনি উল্লেখ করেন, নীতিগুলো মূলত জন্মস্থান ও দেশভিত্তিক বৈষম্য তৈরি করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
মামলাটি করেছিল ডরকাস ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব রোড আইল্যান্ড, আমেরিকান গেটওয়েজ, সার্ভিস এমপ্লয়িজ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন এবং ইউনাইটেড অটো ওয়ার্কার্সের মতো সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে। তারা অভিযোগ করে, প্রশাসনের সিদ্ধান্তের কারণে তাদের সহায়তাপ্রাপ্ত হাজারো আবেদনকারী বছরের পর বছর ধরে অচলাবস্থায় রয়েছে।
আদালত বিশেষভাবে রি-রিভিউ পলিসি বাতিল করে দেয়, যার মাধ্যমে ২০২১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা এবং ইতোমধ্যে অনুমোদিত কিছু অভিবাসীর কেস পুনরায় যাচাই করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। বিচারক বলেন, এ ধরনের পুনর্মূল্যায়ন নীতি আইনি ভিত্তিহীন এবং এর মাধ্যমে বৈধ অভিবাসীদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।
রায়ে বিচারক ম্যাককনেল লেখেন, দ্য রুল অব ল’ হ্যাজ টু অ্যাপ্লাই টু এভরিওয়ান ইক্যুয়ালি যা আইনের শাসন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে। তিনি আরো বলেন, এ মামলাটি স্পষ্টভাবে দেখায় যে যারা আইন মেনে অভিবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
রায়ের পর মামলার পক্ষের আইনজীবীরা এটিকে অভিবাসীদের অধিকার রক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিজয় হিসেবে আখ্যা দেন। ডেমোক্রেসি ফরওয়ার্ড নামের একটি আইন সহায়তা সংস্থা জানায়, এই রায় প্রমাণ করে যে সরকার ইচ্ছামতো বৈধ অভিবাসন পথ বন্ধ করতে পারে না। অন্যদিকে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের আইনজীবী এ রায় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত বলে দাবি করেন এবং এর বিরুদ্ধে আপিলের ইঙ্গিত দেন। তবে আপিল প্রক্রিয়া শুরু হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
এ রায়ের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন প্রশাসনকে এখন এক মিলিয়নেরও বেশি স্থগিত আবেদন পুনরায় প্রক্রিয়াকরণ করতে হবে, যা বর্তমান ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের প্রশাসনিক চাপ তৈরি করবে এবং ভবিষ্যতে অভিবাসন নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পথ খুলে দিতে পারে।