ভারত কতৃক ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে গঙ্গায় পানি প্রবাহ কমে গেছে। ফলে বাংলাদেশে গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পটি ধীরে ধীরে কার্যক্ষমতা কমে গেছে। আর এর খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকেই। ফলে ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে জি কে প্রকল্পের সফলতা ভেস্তে যাবার উপক্রম, আর বেড়ে যাচ্ছে ব্যয়ও।
এসব তথ্য মিলেছে গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প এলাকা সরজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে। আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির উদ্যোগে এই সরজমিনে পরির্দশনে গিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা, স্থানীয় নদী ও পরিবেশবিদদের সাথে কথা বলা হয়। সরজমিনে পরিদর্শণে গণমাধ্যমের কর্মীদের সাথে ছিলেন আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটি (আই এফ সি) নিউইয়র্কের চেয়ারম্যান সৈয়দ টিপু সুলতান এবং বাংলাদেশের সভাপতি মোন্তফা কামাল মজুমদার।
বাংলাদেশের প্রথম এবং অন্যতম বৃহৎ ভূপৃষ্ঠের সেচ ব্যবস্থা হচ্ছে গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প। যা পদ্মা (গঙ্গা) নদী থেকে পাম্পের সাহায্যে পানি তুলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা প্রদান করা হয়। এই প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ৪টি প্রধান জেলা হলো কুষ্টিয়া, চুযাডাঙ্গা, মাগুরা এবং ঝিনাইদহ। খরা মৌসুমে সেচ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে এই অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় অবস্থিত প্রধান পাম্প হাউসের মাধ্যমে গঙ্গা নদী থেকে পানি তুলে খালের (ক্যানেল) মাধ্যমে মাঠপর্যায় সরবরাহ করা হয়।
বাস্তব অবস্থা করুণ
সরজমিনে পরিদর্শণে গিয়ে জানা গেলো শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন ও পরিচালনাগত উভয় দিক থেকেই বিভিন্ন সমস্যার মধ্য দিয়ে চলছে। আগের অনুমানের চেয়ে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পানির চাহিদা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণে প্রকল্পভুক্ত এলাকাকে সেচের আওতায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে এক ধরনের অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। এই প্রকল্পের কমান্ড এলাকা ১,৯৭,৫০০ হেক্টর ও সেচযোগ্য এলাকা প্রায় ৯৫,৫০০ হেক্টর। তবে, আগের পাম্প দিয়ে এখন মাত্র ৫৫,০০০ হেক্টরে সেচ দেওয়া যায়।
কিন্তু নদীতে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা থেকে পাম্পের সাহায্যে প্রয়োজনীয় পানি উত্তোলন প্রায়শ সম্ভব হয় না। কেননা পাম্পগুলি পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে যে স্থানে বসানো হয়েছিল সেখানে এখন আর ন্যূনতম প্রয়োজনীয় পানির স্তর থাকছে না। শুষ্ক মৌসুমে পানির ঊর্ধ্বসীমা লক্ষণীয়ভাবে নিচে নেমে যায়। অন্যদিকে প্রতি বছর গঙ্গা থেকে পাম্প হাউজের সংযোগ খালে ১০ লক্ষ ঘনমিটার জমে থাকা পলিমাটি ড্রেজিং করে অপসারণ করতে হয়। একারণে একসময়ে পানি সরবরাহের পরিমাণ বাড়াতে ব্যাপক সংস্কার কাজ নেওয়া হয় ১৯৮৪ সালে এবং ১৯৯৩ সালে তা সমাপ্ত হয়। কেননা গঙ্গায় পানির প্রবাহ কম থাকলে পাম্পগুলি নির্ধারিত ক্ষমতার (১৮০ কিউমেক) মাত্র ৬৮%, অর্থাৎ ১২২ কিউমেক পানি উত্তোলন করতে পারে। কিন্তু প্রায়াই শুষ্ক মৌসুমের মাসগুলিতে সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং গত কয়েক বছর ধরে প্রকল্প এলাকার কৃষকেরা পানির পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করতে জন্য নলকূপ স্থাপন করতে হয়েছে।
ব্যয় বেড়ে গেলো
এখন জানা গেছে জি কে সেচ প্রকল্পটি পদ্মা নদীর নিন্ম জলস্তরেরও পানি উত্তোলনের সুবিধার্থে এর পাম্পিং ব্যবস্থার একটি বড় ধরনের সংস্কারে হাত দিয়েছে। জিকে প্রকল্প পাম্প হাউসের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান জানান, এই পুনর্গঠনের অধীনে, প্রকল্পটির লক্ষ্য হলো এর পানি গ্রহণ চ্যানেলে প্রয়োজনীয় সর্বনিম্ন পানির স্তর ৩.৯ মিটার থেকে কমিয়ে ২.৫ মিটার করা, যাতে শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানিস্তর উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলেও পাম্পগুলো চালু রাখা যায়। প্রকল্প কর্মকর্তাদের মতে, পদ্মা নদীর পানিস্তর ৪.৫ মিটারের নিচে নেমে গেলেই পাম্পিং স্টেশনটির কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে। জানা গেছে ২০২৪ সালে এর পরিণতি বিশেষভাবে প্রকট হয়ে ওঠে, যখন হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কাছে পদ্মা নদীর পানিস্তর চার মিটারের নিচে নেমে যাওয়ায় পাম্পিং স্টেশনটি জল তুলতে না পারায় প্রকল্পের অধীনে সেচ কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। তবে এখন প্রকল্পের কার্যক্রমতার পাশাপাশি পাম্পের সক্ষমতা বাড়াতে আনুমানিক ১,২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নেয়া প্রকল্পটি ২০২৯ সালে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
এতে করে নদীর নিম্নস্তর থেকে পানি উত্তোলনের সুযোগ করে দিয়ে মৌসুমি পানি সংকট মোকাবেলায় প্রকল্পটির সক্ষমতা বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে গঙ্গার ন্যায্য হিস্যার না পেলে শুধুমাত্র প্রকৌশলগত সমাধানই যথেষ্ট নাও হতে পারে।
এদিকে আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির চেয়ারম্যান সৈয়দ টিপু সুলতান আমেরিকা থেকে প্রকাশিত দেশ পত্রিকার প্রতিনিধিকে বলেন, গঙ্গার পানি ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিতে চুক্তি নবায়নে বাংলাদেশে সরকার সব ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা নিতে হবে। কেননা বাংলাদেশের মানুষ মনে করেন গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়া তাদের অধিকার।