প্রতিবছর ৭৫ হাজার অভিবাসী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 10-06-2026

প্রতিবছর ৭৫ হাজার অভিবাসী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর প্রায় ৭৫ হাজার অনথিভুক্ত বা বৈধ কাগজপত্রবিহীন অভিবাসী শিক্ষার্থী হাইস্কুল থেকে স্নাতক হলেও তাদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের ভবিষ্যৎ ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। অভিবাসন নীতির পরিবর্তন, আর্থিক সহায়তার সীমাবদ্ধতা এবং বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার কারণে এসব শিক্ষার্থীর সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে অভিবাসনবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউট।

প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর প্রায় ৯০ হাজার অনথিভুক্ত শিক্ষার্থী হাইস্কুলের শেষ বর্ষে অধ্যয়ন করে। তাদের মধ্যে প্রায় ৭৫ হাজার শিক্ষার্থী সফলভাবে স্নাতক সম্পন্ন করে। কিন্তু স্নাতকের পর কলেজে ভর্তি, শিক্ষাব্যয় বহন এবং চাকরির সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা নানা ধরনের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়।

গবেষণায় বলা হয়েছে, এই শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য অংশ এমন পরিবারে বেড়ে উঠেছে যারা বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছে। তবুও তাদের আইনি অবস্থান অনির্দিষ্ট থাকায় উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের পথে বড় বাধা তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফেডারেল এবং অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে গৃহীত বিভিন্ন অভিবাসন নীতি এই অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাইস্কুলের শেষ বর্ষে থাকা অনথিভুক্ত শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেক চারটি অঙ্গরাজ্যে বাস করে। এগুলো হলো ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা, নিউইয়র্ক এবং টেক্সাস। জন্মস্থানের দিক থেকে দেখা যায়, তাদের মধ্যে ২১ শতাংশের জন্ম মেক্সিকোতে, ১৫ শতাংশের জন্ম হন্ডুরাসে এবং ১৪ শতাংশের জন্ম গুয়াতেমালায়।

এই শিক্ষার্থীদের জন্য অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা হলো ডাকা বা ডিফার্ড অ্যাকশন ফর চাইল্ডহুড অ্যারাইভালস কর্মসূচির সীমিত সুযোগ। এই কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা কিছু তরুণ অভিবাসীকে অস্থায়ী সুরক্ষা ও কাজের অনুমতি দিয়ে আসছিল। তবে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নতুন আবেদন কার্যত বন্ধ থাকায় বর্তমানে হাইস্কুলে অধ্যয়নরত অধিকাংশ শিক্ষার্থী এই সুবিধার বাইরে রয়েছে।

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী অধিকাংশ শিক্ষার্থী ভবিষ্যতেও এই কর্মসূচির জন্য যোগ্য হবে না। ফলে তাদের জন্য বৈধভাবে কাজ করা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা অর্জন করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

এদিকে কিছু অঙ্গরাজ্য অনথিভুক্ত শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি বাতিল বা সীমিত করেছে। বিশেষ করে টেক্সাসে ২৪ বছর ধরে কার্যকর একটি নীতি বাতিল হওয়ায় অনথিভুক্ত শিক্ষার্থীদের জন্য পাবলিক কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে কম টিউশন ফি সুবিধা হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে উচ্চশিক্ষার ব্যয় অনেক শিক্ষার্থীর নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের সিনিয়র পলিসি অ্যানালিস্ট জিন ব্যাটালোভা বলেন, অনথিভুক্ত অভিবাসী শিক্ষার্থীরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে হাইস্কুল শেষ করার পর তাদের সামনে কী সুযোগ অপেক্ষা করছে তা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা রয়েছে। তার মতে, এই অনিশ্চয়তা শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, তাদের পরিবার এবং স্থানীয় অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

গবেষণাটি মার্কিন আদমশুমারি ব্যুরোর তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি এবং টেম্পল ইউনিভার্সিটির ডেমোগ্রাফাররাও অংশ নেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা বিভাগের নতুন তথ্য দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরেছে। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে দেশজুড়ে পাবলিক স্কুলে শিক্ষার্থী সংখ্যা সামান্য কমে ৪ কোটি ৯৩ লাখে দাঁড়িয়েছে। এটি আগের বছরের তুলনায় শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ কম।

শুধু শিক্ষার্থী সংখ্যাই নয়, পাবলিক স্কুলের সংখ্যাও কমেছে। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে যেখানে ৯৯ হাজার ২৯৭টি পাবলিক স্কুল চালু ছিল, সেখানে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে সেই সংখ্যা কমে ৯৯ হাজার ৭৩টিতে নেমে এসেছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, কম জন্মহার, জনসংখ্যার স্থানান্তর এবং বিকল্প শিক্ষা ব্যবস্থার বিস্তার এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একই সময়ে চার্টার স্কুলের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চার্টার স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তি ২ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বর্তমানে মোট পাবলিক স্কুল শিক্ষার্থীর প্রায় ৮ শতাংশ চার্টার স্কুলে পড়াশোনা করছে।

জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমলেও কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে উল্টো প্রবণতা দেখা গেছে। ওয়াশিংটন ডিসিতে শিক্ষার্থী ভর্তি ২ শতাংশ এবং আরকানসাসে ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে লুইজিয়ানায় এক বছরে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৫ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ হ্রাস।

বড় শহরগুলোর মধ্যেও ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। ফিলাডেলফিয়া সিটি স্কুল ডিস্ট্রিক্টে শিক্ষার্থী সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু নিউইয়র্ক সিটি পাবলিক স্কুলস এবং লস অ্যাঞ্জেলেস ইউনিফায়েড স্কুল ডিস্ট্রিক্টে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমেছে।

শিক্ষা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাতেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। ভারমন্টে প্রতি শিক্ষকের বিপরীতে গড়ে ১০ দশমিক ৩ জন শিক্ষার্থী রয়েছে, যা দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন। অন্যদিকে ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রতি শিক্ষকের বিপরীতে ২১ দশমিক ৭ জন শিক্ষার্থী রয়েছে, যা সর্বোচ্চ।

শিক্ষাবিদদের মতে মতে, প্রতিবছর হাইস্কুল থেকে স্নাতক হওয়া ৭৫ হাজার অনথিভুক্ত অভিবাসী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। কলেজে প্রবেশাধিকার, আর্থিক সহায়তা এবং বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ না হলে এই তরুণদের একটি বড় অংশ তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারবে না। একই সঙ্গে পাবলিক স্কুলে শিক্ষার্থী সংখ্যা হ্রাস এবং চার্টার স্কুলের বিস্তারও যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)