আলহামরার এক মায়াবী বিকেল


হাবিব রহমান , আপডেট করা হয়েছে : 10-06-2026

আলহামরার এক মায়াবী বিকেল

বার্সেলোনার ব্যস্ততা ছেড়ে যখন আমি গ্রানাডার সিয়েরা নেভাদা পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছলাম, তখন আকাশটা হালকা গোলাপি রঙ ধারণ করেছে। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আলহামরা-সেই প্রাসাদ, যা কেবল ইট-পাথরের তৈরি নয়, বরং কবির স্বপ্নের মতো। উল্লেখ‍্য, ১৯৮৪ সালে আলহামরা প্রাসাদ ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।

স্পেনের দক্ষিণে এই গ্রানাডা শহরের বুক চিরে উঠে এসেছে এক লালাভ স্বপ্ন-আলহামরা। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, সূর্যাস্তের আলোয় কেউ যেন পাহাড়ের গায়ে অগ্নিরঙা কোনো কবিতা লিখে রেখেছে। আমার সঙ্গী মারিয়া। সে এখানকারই স্থানীয় গাইড। তার চোখের দৃষ্টিতে যেন আন্দালুসিয়ার প্রাচীন ইতিহাস মিশে আছে। গেট দিয়ে ভেতরে ঢ়ুকতেই সে আমার হাতটা আলতো করে ধরলো। সাবধানে- সে নিচু স্বরে বললো। এই পাথরের প্রতিটি ভাঁজে অনেক গোপন কথা লুকিয়ে আছে। পা রাখলে সেগুলো জেগে ওঠে। তার রসিকতায় আমি হেসে উঠলাম।

আলহামরার ’নাজারি প্রাসাদ’-এর ভেতর দিয়ে আমরা যখন হাঁটছিলাম, মনে হচ্ছিলো কোনো এক রূপকথার জগতে ঢ়ুকে পড়েছি। চারিদিকে জটিল জ্যামিতিক নকশা আর দেওয়ালে খোদাই করা আরবি ক্যালিগ্রাফি। মাঝখানে ‘কোর্ট অব দ্য লায়ন্স’-এর ঝর্ণা থেকে জল পড়ার শব্দ একটা অদ্ভুত ছন্দের সৃষ্টি করছিলো। মারিয়া ঝর্ণার পাশে বসে পড়লো। জলের দিকে তাকিয়ে সে বললো, শোনো এই জল যেন কথা বলে। শত বছর আগে রাজকন্যারা যখন এই পথে হাঁটতেন, তাদের নূপুরের শব্দের সঙ্গে এই জল মিশে এক অপূর্ব সুর তৈরি করতো।

আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম-তুমি কি সেই সুর এখনও শুনতে পাও? মারিয়া একটু হাসলো। ওর হাসিতে স্প্যানিশ রোদে পোড়া মিষ্টি একটা আভা। বললো, আমি শুধু সুর নয়, যারা এখানে এসে হারিয়ে গেছে, তাদের দীর্ঘশ্বাসও শুনতে পাই। তবে তুমি যখন সঙ্গে আছো তখন কেবল ভালোবাসার সুরটাই কানে আসছে।

আলহামরার পথে উঠতে উঠতে আমার মনে হচ্ছিল, আমি যেন সময়ের ভেতর দিয়ে হাঁটছি। বাতাসে হালকা কমলালেবুর গন্ধ, চারপাশে সাইপ্রাস গাছের সারি-একটা নীরব অথচ গভীর সুর বাজছে প্রকৃতির ভেতরে। আমরা যখন জেনারেলফি উদ্যানে এলাম, তখন চারদিকে কেবল ফুলের গন্ধ আর সাইপ্রাস গাছের সারি। এটি ছিল সুলতানদের গ্রীষ্মকালীন অবকাশ যাপন কেন্দ্র। মারিয়া একটা গোলাপের ডালের দিকে ইশারা করে বললো, জানা যায়, সুলতানের প্রিয়তমা এই বাগানে এসেই প্রথম আকাশের দিকে চেয়ে নিজের ভালোবাসার কথা স্বীকার করেছিলেন। আজও নাকি এই বাগানে কেউ একা এলে সে তার ভালোবাসার মানুষের অভাব তীব্রভাবে অনুভব করে। আমি ওর কাছে সরে এলাম। আমাদের মধ্যে তখন কয়েক ইঞ্চির দূরত্ব। বাতাসের ঝাপটায় ওর চুলের ঘ্রাণ ভেসে এলো- একদম বুনো ফুলের মতো। বললাম-আমি কিন্তু একা নই মারিয়া। আমার সঙ্গে তো আলহামরার ইতিহাস আছে, আর...

মারিয়া আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকালো। তার নীল মণি দুটোয় যেন হাজার বছরের রহস্য। বললো, ‘আর?’ আর আমার গাইডের সেই রহস্যময় হাসিটা-আমি ফিসফিস করে বললাম। মারিয়া একটু লজ্জা পেয়ে মাটির দিকে তাকালো। সে আমার হাতটা একটু চেপে ধরলো। সে সময় চারপাশের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূর থেকে ভেসে আসা গিটারের সুর যেন আমাদের সেই মুহূর্তটাকে চিরস্থায়ী করে দিলো।

আলহামরার দেওয়ালে একটি বাক্য বারবার চোখে পড়ে- ‘La ilaha illallah’ (আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই)। ইতিহাস, ধর্ম আর শিল্প-সব এক হয়ে গেছে এই স্থাপত্যে। পাহাড়ের নিচে গ্রানাডা শহর তখনো ঘুমায়নি। আলহামব্রার উঁচু বুরুজ থেকে যখন নিচের দিকে তাকালাম, মনে হলো আমরা পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিখরে দাঁড়িয়ে আছি। মারিয়া বললো-কাল হয়তো তুমি নিউ ইয়র্কে ফিরে যাবে। কিন্তু আলহামরার এই পাথর আর এই ঝর্ণার সুর আমার মনে অমর হয়ে থাকবে।

আমি আমার হাতে থাকা নোটবুকটা বন্ধ করে বললাম- আমার ডায়েরিতে আলহামরার অনেক স্মৃতি লিখে রেখেছি। কিন্তু তার চেয়েও বেশি থাকবে তোমার এই হাত ধরে হাঁটার স্মৃতিটুকু। আলহামরা হয়তো একদিন ধ্বংস হবে, কিন্তু আমাদের এই মুহূর্তটা এই পাথরের মতোই অবিনশ্বর হয়ে থাকবে। আমি শেষবারের মতো ফিরে তাকালাম আলহামরার দিকে। ভাবলাম- রাজারা চলে গেছেন, সাম্রাজ্য মুছে গেছে, কিন্তু এই সৌন্দর্য্য রয়ে গেছে অমর হয়ে। আলহামরা শুধু একটি প্রাসাদ নয়- এটি স্মৃতি, এটি ইতিহাস, এটি এক হারিয়ে যাওয়া জগতের নিঃশব্দ কবিতা। আর সেই কবিতার প্রতিটি লাইনে লুকিয়ে আছে মানুষের চিরন্তন আকাক্সক্ষা-সৌন্দর্য্যকে ধরে রাখার, সময়কে থামিয়ে দেওয়ার।

বিদায় বেলায় মারিয়া আমার কপালে একটা হালকা চুমু খেলো। সেই স্পর্শে যেন স্পেনের উত্তাপ আর গ্রানাডার প্রাচীন হৃদস্পন্দন মিশে ছিলো। আমি সামনে হাঁটা শুরু করলাম। পেছনে ফিরে তাকাইনি। কারণ, আমি জানি, এই ঐতিহাসিক প্রাসাদের প্রতিটি কোণে আমার এক টুকরো হৃদয় চিরদিনের জন্য জমা রেখে গেলাম।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)