ঘৃণার রাজনীতির বিরুদ্ধে টেক্সাসের মুসলিমদের ভোটের শক্তি


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 10-06-2026

ঘৃণার রাজনীতির বিরুদ্ধে টেক্সাসের মুসলিমদের ভোটের শক্তি

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে মুসলিমবিরোধী রাজনৈতিক বক্তব্য ও প্রচারণা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে মুসলিম ভোটারদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছেন কমিউনিটি নেতারা ও ভোটাররা। তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য ও ইসলামবিদ্বেষের মুখোমুখি হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু রাজনীতিকের মুসলিমবিরোধী অবস্থান তাদের আরো বেশি সংগঠিত ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হতে উদ্বুদ্ধ করেছে। টেক্সাসের বিসনেস উদ্যোক্তা মোহাম্মদ আয়াচি বলেন, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর থেকেই মুসলিম আমেরিকানদের প্রতি সন্দেহ ও বৈষম্য বৃদ্ধি পায়। তিনি স্মরণ করেন, ছোটবেলায় স্কুলে এক শিক্ষক তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন তার কতজন মা আছে। বর্তমানে ব্যবসা পরিচালনার সময়ও নিজের নাম বললে অনেকের কাছ থেকে অস্বস্তিকর প্রতিক্রিয়া পান বলে জানান তিনি। মুসলিম নারী ফাতিমা খান, যিনি হিজাব পরেন, জানান যে একবার পরিবারের সঙ্গে একটি পিজা রেস্টুরেন্টে খাবার খাওয়ার সময় এক ব্যক্তি তাদের কাছে এসে চিৎকার-চেঁচামেচি ও গালাগাল করেন। একইভাবে ৩০ বছর ধরে টেক্সাসে বসবাসকারী আফতাব সিদ্দিকী বলেন, তাকে একাধিকবার সন্ত্রাস বলে সম্বোধন করা হয়েছে এবং দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়েছে।

মুসলিম কমিউনিটির সদস্যরা বলছেন, সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রচারণাগুলোতে মুসলিমদের রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। টেক্সাসের অ্যাটর্নি জেনারেল পদপ্রার্থী মেইস মিডলটন সম্প্রতি নো শারিয়া ইন টেক্সাস শিরোনামে একটি প্রচার বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি শারিয়া আইন নিষিদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেন। শারিয়া মূলত মুসলমানদের ধর্মীয় ও নৈতিক জীবন পরিচালনার জন্য অনুসৃত নীতিমালার সমষ্টি। স্থানীয় রিপাবলিকান পার্টির এক সভায় অংশ নেওয়া আলী আনোয়ার বলেন, তিনি মিডলটনকে পরিবার, গর্ভপাত ও সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। তার দাবি, মিডলটন যেসব নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, সেগুলোর অনেকগুলোর সঙ্গেই ইসলামী শিক্ষার মিল রয়েছে। এরপরও মুসলিমদের লক্ষ্য করে শারিয়াবিরোধী প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

একইভাবে টেক্সাসের অ্যাটর্নি জেনারেল ও সিনেট প্রার্থী কেন প্যাক্সটন মুসলিম অভিবাসন এবং মুসলিম সংগঠনগুলোকে কেন্দ্র করে একাধিক রাজনৈতিক প্রচারণা চালিয়েছেন। তিনি কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (কেয়ার)-এর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন এবং প্রতিদ্বন্দ্বী সিনেটর জন কর্নিনকে মুসলিম গণঅভিবাসন সমর্থনের অভিযোগে সমালোচনা করেন।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিমদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ডেমোক্র‍্যাটিক পার্টির সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত মনে করেন। তবে কমিউনিটি নেতাদের মতে, মুসলিম ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ এখন কোনো নির্দিষ্ট দল নয়; বরং যারা মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তু বানায়, তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়া।ডেমোক্র‍্যাটিক পার্টির হয়ে টেক্সাস হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা জিশান হাফিজ বলেন, অনেক মুসলিম ভোটার এখন এমন প্রার্থীদের সমর্থন করতে অনাগ্রহী, যারা মুসলিমদের ভয় ও ঘৃণার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, মুসলিমরা অন্য আমেরিকানদের মতোই ন্যায়বিচার, সুযোগ এবং আমেরিকান ড্রিম বাস্তবায়নের সুযোগ চান।

স্থানীয় পর্যায়েও মুসলিমবিরোধী বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। ফ্রিসকো শহরের মেয়র পদপ্রার্থী রড ভিলহাওয়ার ইসলামকে একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে আখ্যা দেওয়ার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। ফ্রিসকোর বাসিন্দা আনিলা চারানিয়া এই ধরনের প্রচারণাকে হতাশাজনক ও ঘৃণ্য বলে বর্ণনা করেন। তার মতে, নাইন-ইলেভেনের পর দীর্ঘ সময় ধরে ইসলাম সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ইতিবাচক বোঝাপড়া তৈরি হলেও কিছু রাজনীতিক রাজনৈতিক সুবিধার জন্য আবারও বিভাজন সৃষ্টি করছেন।

ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ-এর তথ্য অনুযায়ী, টেক্সাসে বর্তমানে তিন লাখের বেশি মুসলিম বাস করেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পঞ্চম বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যা। কমিউনিটি নেতারা বলছেন, এই জনগোষ্ঠী এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ভোটার হিসেবে সংগঠিত হচ্ছে।

সম্প্রতি মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিভিন্ন নাগরিক অধিকার ও আন্তঃধর্মীয় সংগঠনও এগিয়ে এসেছে। নেক্সট জেনারেশন অ্যাকশন নেটওয়ার্ক, ফেইথ পাওয়ার অ্যালায়েন্স এবং ফার্স্ট ইউনিটেরিয়ান চার্চ ডালাসের প্রতিনিধিরা ২ জুন গ্র‍্যান্ড প্রেইরিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন।গত মাসে টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট ঈদুল আজহা উপলক্ষে গ্র‍্যান্ড প্রেইরির এপিক ওয়াটার্স ওয়াটার পার্কে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠান বাতিলের আহ্বান জানান। পরবর্তীতে রাজ্য তহবিল প্রত্যাহারের হুমকির পর শহর কর্তৃপক্ষ অনুষ্ঠানটি বাতিল করে। ঘটনাটি মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

মুসলিম নেতারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি তাদেরকে আরো বেশি রাজনৈতিকভাবে সচেতন করেছে। তাদের মতে, ভয়ভীতি ও বিভাজনের রাজনীতির জবাব গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের মাধ্যমেই দেওয়া সম্ভব। ফলে আসন্ন নির্বাচনগুলোতে মুসলিম ভোটারদের উপস্থিতি ও সক্রিয়তা আরো বাড়বে বলে তারা আশা করছেন।

আফতাব সিদ্দিকী বলেন, এখন অধিকাংশ মুসলিম ভোটার সেইসব প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোট দিচ্ছেন, যারা আমাদের সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছেন। আর আনিলা চারানিয়ার ভাষায়, আমরা কোনো বিশেষ সুবিধা চাই না। আমরা শুধু সেই একই সুযোগ, ন্যায়বিচার ও আমেরিকান স্বপ্ন চাই, যা অন্য সব আমেরিকান নাগরিক চায়।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)