মুসলিমবিরোধী আইন প্রত্যাখ্যানে ১১৯ ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেসম্যান


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 10-06-2026

মুসলিমবিরোধী আইন প্রত্যাখ্যানে ১১৯ ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেসম্যান

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আইন এবং “শারিয়া-ফ্রি আমেরিকা ককাস” গঠনের উদ্যোগকে তীব্রভাবে নিন্দা জানিয়েছেন ১১৯ জন ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য। ৮ জুন সোমবার যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাটিক লিডার হাকিম জেফ্রিস, যুক্তরাষ্ট্র সিনেটের রিপাবলিকান লিডার জন থুন, যুক্তরাষ্ট্র সিনেটের ডেমোক্র‍্যাটিক লিডার চার্লস ই. শুমার-এর নিকট প্রেরিত এক যৌথ চিঠিতে তারা এই ককাস এবং সংশ্লিষ্ট আইনকে মুসলিম আমেরিকানদের ধর্মীয় স্বাধীনতার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন এবং কংগ্রেস নেতৃত্বকে এসব উদ্যোগ থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান। এই যৌথ উদ্যোগের নেতৃত্ব দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য জেমস ই. ক্লাইবার্ন (দক্ষিণ ক্যারোলাইনা), সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন (মেরিল্যান্ড), এবং কংগ্রেস সদস্য আন্দ্রে কারসন, রোসা ডেলাউরো, জেরি ন্যাডলার, হ্যাঙ্ক জনসন ও রে খান্না। তাদের সঙ্গে আরো ১১৩ জন ডেমোক্র‍্যাট কংগ্রেস সদস্য এই চিঠিতে স্বাক্ষর করেন।

চিঠিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী অনুযায়ী ধর্মীয় স্বাধীনতা সবার জন্য সমানভাবে সুরক্ষিত। কোনো ধর্মকে লক্ষ্য করে বৈষম্যমূলক আইন প্রণয়ন করা সাংবিধানিকভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং এটি সমাজে বিভাজন ও ঘৃণা ছড়ায়। ডেমোক্র‍্যাট সদস্যরা অভিযোগ করেন যে শারিয়া-ফ্রি আমেরিকা ককাস নামে একটি দ্বিকক্ষীয় গ্রুপ গঠন করে এমন কিছু আইন প্রস্তাব করা হচ্ছে, যা সরাসরি মুসলিম ধর্মীয় ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে বৈষম্য তৈরি করে। তারা বলেন, এই ধরনের উদ্যোগ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ইসলামবিদ্বেষী ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে এবং এর কোনো বাস্তব নীতিগত প্রয়োজন নেই।

চিঠিতে আরো বলা হয়, মুসলিম আমেরিকানরা যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন এবং তারা আইন মেনে চলেন ও দেশের সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ। আমেরিকান মুসলিমরা এই দেশের প্রতিটি খাতে সেবা দিচ্ছেন এবং তারা সংবিধানের অধীনে অন্য সব নাগরিকের মতোই সমান অধিকার পাওয়ার যোগ্য বলে চিঠিতে এমন মন্তব্য করা হয়। বিতর্কিত তিনটি প্রস্তাবিত আইন হল ‘প্রিজারভিং আ শারিয়া-ফ্রি আমেরিকা অ্যাক্ট(এইচ.আর. ৫৭২২ / এস. ৩০০৯), নো শারিয়া অ্যাক্ট (এইচ.আর. ৫৫১২ / এস. ৩০০৮) এবং প্রোটেকটিং পাপিস ফ্রম শারিয়া অ্যাক্ট (এইচ.আর. ৭৬১১)। চিঠিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করে বলা হয় যে এসব প্রস্তাবিত আইন যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান আইনি কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এগুলো কোনো বাস্তব আইনি শূন্যতা পূরণ করে না।

ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্যরা ব্যাখ্যা দেন যে মার্কিন সংবিধান ইতোমধ্যেই নাগরিক ও ফৌজদারি বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে এবং আদালত বহুবার এমন আইন বাতিল করেছে যা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে আলাদা করে লক্ষ্য করে। তারা শারিয়া সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, এটি কোনো রাষ্ট্রীয় আইন নয় বরং ধর্মীয় নির্দেশনার একটি ব্যবস্থা, যেমন ক্যাথলিক ক্যানন আইন বা ইহুদি হালাখা। তাদের ভাষায়, শারিয়া মূলত মুসলিমদের ব্যক্তিগত ধর্মীয় আচরণ ও নৈতিকতার নির্দেশনা, যেমন প্রার্থনা, দান, পারিবারিক দায়িত্ব ও সামাজিক আচরণ, এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের আইনকে প্রতিস্থাপন করে না। ইসলাম ধর্মে বসবাসরত দেশের আইন মানার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয় বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে মুসলিম অধিকার সংস্থা কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (কেয়ার) এই অবস্থানকে স্বাগত জানিয়েছে। সংস্থাটি জানায়, ১১৯ জন কংগ্রেস সদস্যের এই পদক্ষেপ ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। কেয়ার -এর সরকারি বিষয়ক পরিচালক রবার্ট এস. ম্যাককাউ বলেন, মুসলিম আমেরিকানরা দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আইন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি আরো বলেন, তথাকথিত শিয়া-ফ্রি আমেরিকা ককাস আসলে কোনো নীতিগত উদ্যোগ নয়, বরং ইসলামবিদ্বেষী রাজনৈতিক প্রচেষ্টার একটি রূপ।

প্রিজারভিং আ শারিয়া-ফ্রি আমেরিকা অ্যাক্ট (এইচ.আর. ৫৭২২/এস. ৩০০৯): এই প্রস্তাবিত আইনের লক্ষ্য হিসেবে দাবি করা হয় যুক্তরাষ্ট্রে ‘শারিয়া আইন’ বা ইসলামিক আইনি নীতির কোনো প্রভাবকে রাষ্ট্রীয় বা আদালত-ভিত্তিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে না দেওয়া। আইনটির সমর্থকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি যুক্তরাষ্ট্রের আইন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে ধর্মনিরপেক্ষ রাখার উদ্দেশ্যে তৈরি। তবে সমালোচকদের মতে, এই বিলটি মূলত মুসলিমদের ধর্মীয় পরিচয়কে টার্গেট করে তৈরি করা হয়েছে এবং এটি ধর্মীয় স্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

নো শারিয়া অ্যাক্ট (এইচ.আর. ৫৫১২/এস. ৩০০৮): এই বিলটি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আদালত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় “বিদেশি বা ধর্মীয় আইন”, বিশেষ করে শারিয়ার প্রয়োগ নিষিদ্ধ বা সীমিত করার লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তাব করা হয়েছে। বিলটির সমর্থকেরা দাবি করেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের আইনি ব্যবস্থাকে এককভাবে সংবিধান ও ফেডারেল আইনের অধীনে রাখবে এবং কোনো ধর্মীয় আইনকে বিচারিক সিদ্ধান্তে ব্যবহারের সুযোগ দেবে না। কিন্তু সমালোচকদের মতে, বিদ্যমান মার্কিন আইন ইতোমধ্যেই এই বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে, ফলে এই বিলটি অপ্রয়োজনীয় এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নেতিবাচক বার্তা দেয়।

প্রোটেকটিং পাপিস ফ্রম শারিয়া অ্যাক্ট (এইচ.আর. ৭৬১১): এই প্রস্তাবিত আইনটি তুলনামূলকভাবে ব্যঙ্গাত্মক ও বিতর্কিত নামে পরিচিত, যেখানে দাবি করা হয় কিছু ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক প্রথা প্রাণী কল্যাণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে এবং তাই যুক্তরাষ্ট্রে তা প্রতিরোধ করা প্রয়োজন। সমর্থকদের মতে, এটি প্রাণী সুরক্ষা ও নির্দিষ্ট ধর্মীয় ব্যাখ্যা থেকে উদ্ভূত সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য তৈরি। তবে সমালোচকেরা বলেন, এই বিলটি মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তৈরি এবং এটি ধর্মীয় গোষ্ঠী বিশেষ করে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও ভুল ধারণা ছড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করে।

চিঠিতে কংগ্রেস নেতৃত্বকে আহ্বান জানানো হয় যেন তারা ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার প্রতি পুনরায় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন, ইসলামবিদ্বেষী নীতিকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং বিতর্কিত এসব বিলকে কংগ্রেসের আলোচ্যসূচিতে না আনেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ধর্মীয় স্বাধীনতা, অভিবাসন এবং সংখ্যালঘু অধিকার ইস্যুকে আরো একবার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ককে আরো তীব্র করতে পারে।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)