পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার উপায়গুলো এখন সুপরিচিত। তাই পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি। শিল্পায়ন ও নগরায়নের অজুহাতে পরিবেশ দূষণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে ‘জলবায়ু-সহনশীল এবং পরিবেশ-বান্ধব পরিকল্পনা’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব বক্তব্য উঠে আসে। ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর উদ্যোগে রাজধানীর প্ল্যানার্স টাওয়ার-এ অবস্থিত বিআইপি কনফারেন্স হলে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
বিআইপি’র সহ-সভাপতি পরিকল্পনাবিদ সহ-সভাপতি-১ পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসানের সঞ্চালনায় এবং বিআইপির সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন অনুবিভাগ) ড. নুরুন নাহার এবং বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের যুগ্মপ্রধান (ডেল্টা অনুবিভাগ) ড. এস এম যোবায়দুল কবির। এছাড়াও সেমিনারে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর বোর্ড সদস্যবৃন্দ, পরিকল্পনাবিদ, এবং বিভিন্ন পেশাজীবী অংশগ্রহণ করেন।
ড. নুরুন নাহার বলেন, সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রাথমিক বিনিয়োগের মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করে, যাতে তারা কম খরচে উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। তবে অনেক প্রকল্পে যথাযথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (Feasibility Study) না হওয়ায় বাস্তবায়নে সমস্যার সৃষ্টি হয়। এ কারণে একটি মানসম্মত নির্দেশিকা (Standard Document) প্রণয়ন করা হয়েছে, যাতে সবাই একই কাঠামোর মধ্যে কাজ করতে পারে। তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা যাচাই করে প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া উচিত। গবেষণা খাতে পর্যাপ্ত বাজেটের অভাবে পরিকল্পনা কমিশনকে অনেক ক্ষেত্রে রক্ষণশীল অবস্থান গ্রহণ করতে দেখা যায়, ফলে নতুন প্রকল্প গ্রহণে অনীহা তৈরি হয়। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, ভবিষ্যতে উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রতিটি পর্যায়ে পরিকল্পনাবিদদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর সহ-সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. ফারহানা আহমেদ তাঁর স্বাগত বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও তাপপ্রবাহের মতো বহুমাত্রিক ঝুঁকি মোকাবেলায় পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক উন্নয়ন অপরিহার্য। তিনি উল্লেখ করেন, জলবায়ু-সহনশীল ও পরিবেশ-বান্ধব পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশকে গড়ে তুলতে পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও টেকসই বাংলাদেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পরিকল্পনাবিদদের জ্ঞান, দক্ষতা ও পেশাগত অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর আরও বেশি সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং জাতীয় পর্যায়ে নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়নে তাদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা হবে।
পরিকল্পনাবিদ নাঈমা ইসলাম মিম মূল প্রবন্ধে বলেন, বাংলাদেশের শিল্পাঞ্চল, বিশেষ করে সাভার অঞ্চলে বায়ুদূষণ জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। শিল্পকারখানা থেকে নির্গত বিভিন্ন ভারী ধাতু বায়ুর গুণগত মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করছে। প্রচলিত দূষণ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিগুলো ব্যয়বহুল ও পরিচালনাগতভাবে জটিল হওয়ায় পরিবেশবান্ধব, টেকসই এবং স্বল্পব্যয়ী বিকল্প সমাধানের প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আরেকটি মূল প্রবন্ধে মোঃ শিবলী সাদিক বলেন, জলবায়ু কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব, স্থানীয় পর্যায়ে অর্থায়ন ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, গবেষণালব্ধ উদ্ভাবনের বৃহৎ পরিসরে প্রয়োগের দুর্বলতা এবং সামাজিক আস্থা ও অংশগ্রহণের ঘাটতি। এছাড়া রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের অভাব এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতাকেও তিনি জলবায়ু কার্যক্রম বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
ড. হাসীব মুহাম্মদ ইরফানুল্লাহ্ বলেন, ২০১৬ সাল থেকে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য তহবিল গঠনের কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। তিনি পরিকল্পনা প্রণয়নে স্থান (ঝঢ়ধপব) ও জীববৈচিত্র্যের আন্তঃসম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
ড. এস এম যোবায়দুল কবির বলেন, টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রতিটি পরিকল্পনায় সামাজিক, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক এই তিনটি স্তরের সমন্বয় থাকতে হবে। পরিকল্পনা প্রণয়নে অংশীজনদের (Stakeholders) সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে তাদের মতামত গ্রহণের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। বিশেষ অতিথি অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন অনুবিভাগ), পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, ড. নুরুন নাহার বলেন, সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রাথমিক বিনিয়োগের মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করে, যাতে তারা কম খরচে উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। তবে অনেক প্রকল্পে যথাযথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (Feasibility Study) না হওয়ায় বাস্তবায়নে সমস্যার সৃষ্টি হয়। এ কারণে একটি মানসম্মত নির্দেশিকা (Standard Document) প্রণয়ন করা হয়েছে, যাতে সবাই একই কাঠামোর মধ্যে কাজ করতে পারে। তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা যাচাই করে প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া উচিত। গবেষণা খাতে পর্যাপ্ত বাজেটের অভাবে পরিকল্পনা কমিশনকে অনেক ক্ষেত্রে রক্ষণশীল অবস্থান গ্রহণ করতে দেখা যায়, ফলে নতুন প্রকল্প গ্রহণে অনীহা তৈরি হয়। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, ভবিষ্যতে উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রতিটি পর্যায়ে পরিকল্পনাবিদদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হবে।
পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, ২০২৬ সালে এসে শিল্পায়ন ও নগরায়নের অজুহাতে পরিবেশ দূষণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অস্ট্রিয়ার রাইন নদী এ ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার উপায়গুলো এখন সুপরিচিত। তাই পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
বিআইপি’র সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম তাঁর সমাপনী বক্তব্যে বলেন, বিআইপি পরিকল্পনাবিদদের পেশাজীবী সংগঠন হিসেবে একটি পরিকল্পিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বলেন, পরিকল্পিত উন্নয়নের মূলভিত্তি হলো পরিবেশ সংরক্ষণ। বাসযোগ্য, মানবিক ও পরিবেশবান্ধব শহর গড়ে তুলতে বিআইপি সরকার, নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বিতভাবে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
বিআইপি’র সহ-সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. ফারহানা আহমেদ তাঁর স্বাগত বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পরিকল্পনাবিদদের জ্ঞান, দক্ষতা ও পেশাগত অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর আরও বেশি সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং জাতীয় পর্যায়ে নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়নে তাদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা হবে।
সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন বিআইপি’র যুগ্ম সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ কাজী সালমান হোসেন, কোষাধ্যক্ষ পরিকল্পনাবিদ আবু ছালেহ মোঃ শহীদুল্লাহ, বোর্ড সদস্য পরিকল্পনাবিদ শুভ কান্তি পোদ্দার, পরিকল্পনাবিদ হোসনেআরা আলো, পরিকল্পনাবিদ তালহা তাসনিমসহ ইনস্টিটিউটের অন্যান্য সিনিয়র সদস্যবৃন্দ।