নিউ ইয়র্কে অভিবাসন নীতি ও ‘স্যাংচুয়ারি সিটি’ ইস্যুতে ট্রাম্প ও হোচুল প্রশাসনে উত্তেজনা চরমে


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 17-06-2026

নিউ ইয়র্কে অভিবাসন নীতি ও ‘স্যাংচুয়ারি সিটি’ ইস্যুতে ট্রাম্প ও হোচুল প্রশাসনে উত্তেজনা চরমে

অভিবাসন নীতি নিয়ে আবারও তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে নিউ ইয়র্ক স্টেটের গভর্নর ক্যাথি হোচুল, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সীমান্ত বিষয়ক প্রধান উপদেষ্টা টম হোমানের মধ্যে। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নিউ ইয়র্কের নতুন অভিবাসন সুরক্ষা আইন এবং ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস )-এর ভবিষ্যৎ কার্যক্রম। আইনটি ইতিমধ্যেই স্বাক্ষরিত হলেও পুরোপুরি কার্যকর হতে এখনো প্রায় ৯০ দিন বাকি। এই সময়ের আগেই পরিস্থিতি ঘিরে রাজনৈতিক চাপ ও হুঁশিয়ারি বাড়ছে।

নতুন আইনটি কার্যকর হতে এখনও কয়েক সপ্তাহ বাকি থাকলেও এর প্রভাব ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। আইনটির মাধ্যমে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ফেডারেল অভিবাসন সংস্থার মধ্যে সহযোগিতার ধরন পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, বিশেষ করে ২৮৭(জি) ধরনের চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই চুক্তির মাধ্যমে স্থানীয় পুলিশ বা জেল কর্তৃপক্ষ ফেডারেল অভিবাসন প্রয়োগে সহায়তা করে থাকে। টম হোমান দাবি করেছেন, এ সহযোগিতা সীমিত হলে ফেডারেল সরকারকে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত এজেন্ট মোতায়েন করতে হবে এবং এতে প্রশাসনিক চাপ ও ব্যয় দুটোই বাড়বে। তিনি আরো ইঙ্গিত দিয়েছেন, নিউ ইয়র্কে বড় পরিসরের ফেডারেল অভিযান শিগগিরই শুরু হতে পারে, যদিও নির্দিষ্ট সময় বা পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়নি।

গভর্নর ক্যাথি হোচুল এই অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি দাবি করেন, পূর্বে ফেডারেল প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে রাজ্যের অনুরোধ ছাড়া নিউ ইয়র্কে অতিরিক্ত আইস অভিযান পরিচালনা করা হবে না। হোচুল বলেন, তিনি এই প্রতিশ্রুতি হোয়াইট হাউসকে স্মরণ করিয়ে দেবেন এবং রাজ্যের স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি রক্ষা করবেন। তাঁর মতে, নতুন আইন অপরাধ দমন ব্যবস্থাকে দুর্বল করছে না, বরং স্থানীয় ও ফেডারেল সংস্থার মধ্যে আরো স্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিত সহযোগিতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, নিউ ইয়র্কে বড় ধরনের ফেডারেল অভিযান চালানো হলে তার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব শুধু রাজ্য নয়, জাতীয় পর্যায়েও পড়তে পারে।

অন্যদিকে, ডিপার্মেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি- এর সেক্রেটারি হিসেবে পরিচিত মার্কওয়েন মুলিন স্যাংচুয়ারি সিটি নীতির বিরুদ্ধে আরো কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন, যে শহর বা রাজ্য ফেডারেল অভিবাসন নীতির সঙ্গে সহযোগিতা করবে না, তাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কাস্টমস ও বর্ডার প্রোটেকশন সিবিপি কার্যক্রম সীমিত করা হতে পারে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক যাত্রী প্রক্রিয়াকরণ স্থগিত করার বিষয়টিও প্রশাসনের বিবেচনায় রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে যে ফেডারেল সরকার সহযোগিতা না করা রাজ্যগুলোর ওপর অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ বাড়াতে চাইছে।

তবে এই প্রস্তাব প্রশাসনের ভেতরেই বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। হোয়াইট হাউসের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এখনো পর্যন্ত এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়নি এবং এটি মূলত নীতিগত আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। প্রশাসনের ভেতরে কিছু কর্মকর্তা মনে করছেন, এমন পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে তা শুধু রাজনৈতিক বিতর্কই নয়, বরং বাস্তবিকভাবে বিমান পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।

ট্রান্সপোর্টেশন সেক্রেটারি শন ডাফি প্রকাশ্যে এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছেন। তিনি কংগ্রেসে এক শুনানিতে বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে কোনো রাজ্যের বিমান চলাচল বা আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহন ব্যাহত করা উচিত নয়। তার মতে, এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে জাতীয় বিমান পরিবহন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বিমান শিল্প ও পর্যটন খাতের সংগঠনগুলোও এই প্রস্তাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিমান সংস্থাগুলোর সংগঠন এয়ারলাইনস ফর আমেরিকা সতর্ক করে বলেছে, বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কাস্টমস ও বর্ডার প্রোটেকশন সিবিপিকর্মী সংখ্যা কমানো বা কার্যক্রম সীমিত করা হলে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা, কার্গো পরিবহন এবং যাত্রী সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। একইভাবে ইউএস ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, এমন পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক পর্যটন শিল্পের জন্য ধ্বংসাত্মক হতে পারে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে এর প্রভাব শুধু নিউ ইয়র্ক বা লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো বড় শহরে সীমাবদ্ধ থাকবে না। নিউ ইয়র্কের জেএফকে বা সান ফ্রান্সিসকো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো হাব ব্যবহার করে যাত্রীরা সাধারণত দেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করেন। ফলে এসব বিমানবন্দরে কাস্টমস কার্যক্রম সীমিত হলে পুরো যুক্তরাষ্ট্রের বিমান পরিবহন নেটওয়ার্কে শৃঙ্খলাগত প্রভাব পড়তে পারে। এছাড়া আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের রুট পরিবর্তন বা পুনর্বিন্যাস করা তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব নয়, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলবে।

‘স্যাংচুয়ারি সিটি’ নীতি নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজনও ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। নিউ ইয়র্ক সিটি, লস অ্যাঞ্জেলেস, সিয়াটল ও ফিলাডেলফিয়ার মতো বড় শহরগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ফেডারেল অভিবাসন প্রয়োগে সীমিত সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করে আসছে। এ প্রেক্ষাপটে ভার্জিনিয়ার গভর্নর অ্যাবিগেইল স্প্যানবার্গার এবং পেনসিলভানিয়ার গভর্নর জশ শাপিরো ফেডারেল সরকারের সম্ভাব্য কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে সতর্ক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ রাজ্য ও ফেডারেল সরকারের মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে। সব মিলিয়ে নিউ ইয়র্কে অভিবাসন আইন, ফেডারেল অভিযান এবং স্যাংচুয়ারি সিটি নীতি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে একটি জটিল রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। প্রশাসনিক মতভেদ, স্টেট ফেডারেল দ্বন্দ্ব এবং অর্থনৈতিক খাতের উদ্বেগ মিলিয়ে পরিস্থিতি আগামী কয়েক মাসে আরো উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)