বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ পরিবহন ও যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, জনপ্রশাসন, শিক্ষা, কৃষি এবং স্বাস্থ্য খাতের তুলনায় পরিবেশ খাতে সরকার উল্লেখযোগ্যভাবে কম অর্থায়ন করে চলেছে। অথচ প্রকৃতি ও জলবায়ু সহনশীলতায় পর্যায়ে রাখার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া মাথাপিছু প্রবৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন বিপন্নের আশঙ্কা রয়েছে। একারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশগত স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিতে জাতীয় বাজেটকে হাতিয়ারে পরিণত করতে হবে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এক আলোচনা সভায় তারা এমন অভিযোগ ও আশঙ্কা করেছেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে গ্রিনওয়াচ নিউজ ম্যাগাজিন এবং গ্রিনওযাচ অনলাইন নিউজ পোর্টাল কর্তৃক আয়োজিত ‘চাই সামগ্রিক উন্নয়ন ও পরিবেশসম্মত টেকসই বাজেট’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
এতে সভাপতিত্ব করেন গ্রীণওয়াচ ঢাকার সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভুঁইয়া, কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ মেহেদী মাসুদ, ঢাকার শেকড় ট্রাস্টি আলহাজ মোতালেব মাশরাকি, কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি শাহাবুদদিন ফরাজি, শিক্ষক ও গবেষক জোবায়ের সুহান, ও ঢাকা সিটি কলেজের অধ্যাপক এফএম শহীদুল্লাহ। অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন গ্রীণওয়াচ ঢাকার নির্বাহী সম্পাদক রফিকুল ইসলাম আজাদ।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং পরিবেশ, জ্বালানি ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এম. জাকির হোসেন খান বলেন, জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেট প্রণয়নের প্রতিটি পর্যায়ে পরিবেশগত স্থিতিশীলতাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমানে পরিবেশ সুরক্ষায় অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ ভবিষ্যতে আরও বড় অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ক্ষতির কারণ হবে।
এতে বক্তারা বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯.৩৮ ট্রিলিয়ন টাকার জাতীয় বাজেটটি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর একটি গণতান্ত্রিক ও জনমুখী বাজেট প্রণয়নের প্রচেষ্টাকে প্রতিফলিত করে এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী সমিতি এটিকে ব্যবসাবান্ধব হিসেবে স্বাগত জানালেও, এটি মূলত গতানুগতিক প্রবৃদ্ধি মডেলের উপর ভিত্তি করে তৈরি, যা পরিবেশগত স্থিতিশীলতার চেয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপর বেশি জোর দেয়।
তারা জোর দিয়ে বলেন যে, শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সম্পদ সৃষ্টিই অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না। বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বসবাসযোগ্য বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা, পুনরুদ্ধার ও ব্যবস্থাপনাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বক্তারা বলেন, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, জলবায়ু সহনশীলতা শক্তিশালীকরণ এবং প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র ও জীবচক্র সুরক্ষার জন্য উচ্চতর বিনিয়োগ অপরিহার্য। তাঁরা জোর দিয়ে বলেন যে, পরিবেশ সংরক্ষণকে ব্যয় হিসেবে নয়, বরং দেশের ভবিষ্যতের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত।
তাঁরা বলেন, বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ পরিবহন ও যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, জনপ্রশাসন, শিক্ষা, কৃষি এবং স্বাস্থ্য খাতের তুলনায় পরিবেশ খাতে উল্লেখযোগ্যভাবে কম অর্থায়ন করে চলেছে। তাঁরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবেলা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য এই ভারসাম্যহীনতা দূর করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অংশগ্রহণকারীরা জলবায়ু-জনিত দুর্যোগ, নদীভাঙন, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, বায়ু ও পানি দূষণ, জীববৈচিত্র হ্রাস, বন উজাড় এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণসহ ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলোর ওপরও আলোকপাত করেন, যা দেশের অর্থনীতি ও সমাজের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে। তারা আরও বলেন ভারসাম্যপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য পরিবেশ সুরক্ষায় শক্তিশালী সরকারি বিনিয়োগ এখন আর ঐচ্ছিক নয়, বরং একটি জরুরি জাতীয় প্রয়োজন।