অভিনেতা জাহিদ হাসান। দশকের পর দশক ধরে তার অভিনয় আর সহজাত হাসিতে মুগ্ধ হয়ে আছে দেশের দর্শক। কিন্তু সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় তার একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে চরম বিভ্রান্তি। একটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটের ভিডিওর সঙ্গে তার বক্তব্য জুড়ে দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে আপত্তিকর ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট। এ পুরো ঘটনায় চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন এ গুণী শিল্পী। এবার আর চুপ থাকা নয়, বরং এ অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। এ বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত পাঠকপ্রিয় দেশ পত্রিকার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলমগীর কবির
প্রশ্ন: সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনাকে নিয়ে কিছু বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট নজরে এসেছে। পুরো বিষয়টি আসলে কী এবং কেন আপনি এত ক্ষুব্ধ?
জাহিদ হাসান: দেখুন, ক্ষুব্ধ হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। সম্প্রতি গণমাধ্যমে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে আমি আমার ব্যক্তিগত জীবন এবং ফেলে আসা সংগ্রামের দিনগুলোর কথা বলছিলাম। সেই প্রসঙ্গে আমি বলেছিলাম, ‘আমি কষ্টে মরে যাচ্ছি, তবু মুখে হাসি রাখার চেষ্টা করি।’ এটি ছিল আমার জীবনের একটা আবেগের জায়গা, একটা লড়াইয়ের গল্প। কিন্তু কিছু ভুঁইফোড় ফেসবুক পেজ সেই বক্তব্যের প্রকৃত প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ উপেক্ষা করল। তারা কী করল? প্রয়াত অভিনেতা শামস সুমনের জানাজার একটি ভিডিওর সঙ্গে আমার ওই অডিও বা বক্তব্য জুড়ে দিলো! এরপর অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর ও আপত্তিকর শিরোনাম দিয়ে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিলো। যা দেখছি, সভ্যতা-ভব্যতার সব সীমা অতিক্রম করছে এসব ভুঁইফোড় ফেসবুক পেজ। দিনদিন এদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। এভাবে তো একটা সমাজ বা রাষ্ট্র চলতে পারে না।
প্রশ্ন: এই যে অসাধু চক্রগুলো আপনার একটি আবেগঘন বক্তব্যকে অন্য একটি মৃত্যুর ভিডিওর সঙ্গে জুড়ে দিলো, এতে আপনার ব্যক্তিগত বা পারিবারিক জীবনে কী ধরনের প্রভাব পড়েছে?
জাহিদ হাসান: এর প্রভাব কতটা ভয়াবহ, তা শুধু ভুক্তভোগীই বোঝে। একজন শিল্পীরও তো একটা পরিবার আছে, আত্মীয়স্বজন ও অগণিত ভক্ত আছেন। যখন এমন একটি আপত্তিকর শিরোনামে কনটেন্ট ছড়ানো হয়, তখন চারপাশ থেকে চেনা-অচেনা শত শত মানুষ উদ্বেগ প্রকাশ করে ফোন দেওয়া শুরু করেন। পরিবারের মানুষ মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। একজন মানুষের ব্যক্তিগত লড়াইয়ের কথাকে এভাবে বিকৃত করে ভিউ পাওয়ার সস্তা চেষ্টা করা কেবল অনৈতিকই নয়, এটি এক ধরনের মানসিক নির্যাতন। এ নোংরামির কারণে আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক শান্তি মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
প্রশ্ন: এ ধরনের ভুঁইফোড় পেজগুলোর দৌরাত্ম্য রুখতে আপনি কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
জাহিদ হাসান: এবার আমি বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। এভাবে ছেড়ে দেওয়ার কোনো মানে হয় না। আমি ইতিমধ্যে আমার আইনজীবী ও ডিজিটাল টিমকে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতির নির্দেশ দিয়েছি। আমার টিম বসে নেই, তারা ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট ফেসবুক পেজগুলোর সমস্ত তথ্য-উপাত্ত ও প্রমাণ সংগ্রহ করেছে। কারা, কোন উদ্দেশ্য থেকে পরিকল্পিতভাবে এসব বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরি করছে এবং ছড়িয়ে দিচ্ছে, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় তথ্য জোগাড় করা হয়েছে। শিগগির আমরা এদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছি।
প্রশ্ন: এ আইনি প্রক্রিয়ায় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কোনো সাহায্য নিয়েছেন কি?
জাহিদ হাসান: হ্যাঁ, অবশ্যই। বিষয়টি নিয়ে আমি নিজে পুলিশের সাইবার অপরাধ বিভাগের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছি। পুরো ঘটনাটি জানার পর তিনি আমাকে দ্রুত একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরামর্শ দিয়েছেন। সে অনুযায়ী জিডি করার প্রক্রিয়া চলছে। এরপর সাইবার আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাইবার অপরাধ বিভাগ আমাকে আশ্বস্ত করেছে যে তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখবে।
প্রশ্ন: আপনি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে এ ধরনের সাইবার বুলিং ঠেকাতে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
জাহিদ হাসান: শুধু নিজের জায়গা থেকে ব্যক্তিগতভাবে আইনি পদক্ষেপ নিলেই তো এ সামাজিক ব্যাধি দূর হবে না। আজ আমি এর শিকার হচ্ছি, কাল অন্য কোনো সাধারণ নাগরিক বা গুণী ব্যক্তি এর শিকার হবেন। একজন নাগরিক এবং সাংস্কৃতিককর্মী হিসেবেই আমি সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। আমি মনে করি, রাষ্ট্রীয় নজরদারি ও কঠোর আইন প্রয়োগ ছাড়া এ ভুঁইফোড় পেজগুলোর সাইবার বুলিং বা অপপ্রচার বন্ধ করা অসম্ভব। এ ধরনের ভুয়া পেজ ও চ্যানেলগুলোকে চিহ্নিত করে দ্রুত জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং এদের লাইসেন্স বা কার্যক্রম চিরতরে বন্ধ করার মতো কঠোর সংস্কৃতির অবসান হওয়া এখন সময়ের দাবি।
প্রশ্ন: যারা স্রেফ ‘ভিউ’ এবং ফেসবুক থেকে আয়ের উদ্দেশ্যে এ ধরনের নোংরা কনটেন্ট তৈরি করছেন, তাদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?
জাহিদ হাসান: তাদের উদ্দেশে একটাই কথা অন্যের জীবনকে বিপন্ন করে, মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা করে উপার্জিত টাকা কখনোই কল্যাণ বয়ে আনে না। সৃজনশীলতা দিয়ে মানুষের মন জয় করুন, অপপ্রচার দিয়ে নয়। আর যারা মনে করছেন ইন্টারনেটের আড়ালে লুকিয়ে যা ইচ্ছা তাই করে পার পেয়ে যাবেন, তাদের সাবধান করে দিতে চাই। ডিজিটাল আইন এখন অনেক শক্তিশালী। আইনের হাত থেকে আপনারা বাঁচতে পারবেন না। ভুল তথ্য ছড়ানোর আগে অন্তত এটুকু ভাবুন, আইনগত ব্যবস্থা শুরু হলে আপনাদের পুরো ক্যারিয়ার ও ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে চলে যাবে।