যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট গত ২৫ জুন ৬-৩ ভোটের দুটি যুগান্তকারী রায়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। মুলিন বনাম ডো এবং মুলিন বনাম আল ওত্রো লাদো মামলায় আদালতের রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা একদিকে হাইতি ও সিরিয়ার নাগরিকদের টেম্পোরারি প্রোটেকটেড স্ট্যাটাস (টিপিএস) বাতিলের পথ সুগম করেছেন, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে আশ্রয়প্রার্থীদের প্রবেশের আগেই ফিরিয়ে দেওয়ার বিতর্কিত মিটারিং নীতিকেও বৈধতা দিয়েছেন।
প্রথম মামলায় সুপ্রিম কোর্ট নিম্ন আদালতের সেসব রায় বাতিল করে দেয়, যেগুলো ট্রাম্প প্রশাসনের টিপিএস বাতিলের সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখেছিল। এর ফলে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ হাইতিয়ান এবং ৮ হাজারের বেশি সিরীয় নাগরিক তাদের বৈধ অভিবাসন সুরক্ষা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। এই রায় কার্যকর হলে কয়েকদিনের মধ্যে বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তাদের অনেকেই বৈধ অভিবাসন মর্যাদা হারিয়ে প্রথমবারের মতো অনথিভুক্ত অভিবাসীতে পরিণত হতে পারেন। একই সঙ্গে তারা কর্মসংস্থানের অনুমতি হারাতে পারেন এবং বহিষ্কারের মুখোমুখি হতে পারেন।
টিপিএস কর্মসূচির আওতায় ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার সময় প্রায় ১৩ লাখ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে বসবাস করছিলেন। এর মধ্যে অধিকাংশ হাইতিয়ান নাগরিক ২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট জোভেনেল মোইজ হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী মানবিক সংকটের সময় বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে এ সুরক্ষা লাভ করেছিলেন।
মামলায় অভিবাসীদের আইনজীবীরা যুক্তি দেন, কংগ্রেসের প্রণীত আইন অনুযায়ী কোনো দেশের টিপিএস বাতিলের আগে বিভিন্ন ফেডারেল সংস্থার সমন্বয়ে একটি আন্তঃসংস্থাগত পর্যালোচনার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হয় যে, সংশ্লিষ্ট দেশের পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। কিন্তু আদালতে উপস্থাপিত নথিতে দেখা যায়, ট্রাম্প প্রশাসন সে বাধ্যতামূলক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেনি এবং হাইতির চলমান সহিংসতা ও মানবিক সংকটকে যথাযথভাবে মূল্যায়নও করেনি।
তবে সুপ্রিম কোর্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা বলেন, টিপিএস আইনের একটি ধারা অনুযায়ী, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের সিদ্ধান্তকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। ফলে প্রশাসন আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে কি না, সে প্রশ্নও আদালত পর্যালোচনা করতে পারবে না। অর্থাৎ ভবিষ্যতে কোনো প্রশাসন আইনগত প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ না করলেও আদালতের হস্তক্ষেপের সুযোগ সীমিত থাকবে। রায়ে আদালত আরো উল্লেখ করে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অতীতে হাইতি ও হাইতিয়ানদের সম্পর্কে যেসব অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন, সেগুলো সংবিধানবিরোধী বর্ণবৈষম্যমূলক উদ্দেশ্য প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়। তবে ভিন্নমত পোষণকারী বিচারপতিরা এ সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ রায়ের প্রভাব শুধু হাইতি ও সিরিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর ফলে ভেনেজুয়েলা, সোমালিয়া, ইথিওপিয়াসহ অন্যান্য টিপিএসভুক্ত দেশের সুরক্ষা বাতিলের ক্ষেত্রেও ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান আরো শক্তিশালী হবে। বর্তমানে প্রায় তিন লাখ মানুষ এখনো টিপিএস সুবিধার আওতায় রয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ২ লাখ এল সালভাদরের নাগরিক ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে এ সুরক্ষা ভোগ করছেন এবং প্রায় ৫০ হাজার ইউক্রেনীয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর এ মর্যাদা পেয়েছেন। তাদের ভবিষ্যৎও এখন আরো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্যসেবা খাতের বিভিন্ন সংগঠন সতর্ক করেছে যে, এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে হাজার হাজার হাইতিয়ান নার্স, হোম হেলথ এইড ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী চাকরি হারাতে পারেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
একই দিনে দেওয়া দ্বিতীয় রায়ে সুপ্রিম কোর্ট সীমান্তে আশ্রয়প্রার্থীদের ফিরিয়ে দেওয়ার মিটারিং নীতিকেও বৈধতা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইনে বলা হয়েছে, যে কেউ যুক্তরাষ্ট্রে শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকলে অথবা যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছলে আশ্রয়ের আবেদন করতে পারবেন। পাশাপাশি সীমান্তে পৌঁছানো প্রত্যেক ব্যক্তিকে অভিবাসন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরীক্ষা বা ইনস্পেকশন করার বাধ্যবাধকতাও আইনে রয়েছে।
কিন্তু ২০১৬ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তের বিভিন্ন প্রবেশপথে সীমান্ত কর্মকর্তারা বহু আশ্রয়প্রার্থীকে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পা রাখতে না দিয়ে সীমান্তেই আটকে দেন। এভাবেই মিটারিং নীতির মাধ্যমে প্রতিদিন সীমিতসংখ্যক আবেদন গ্রহণ করা হতো এবং বাকিদের মেক্সিকোতে অপেক্ষা করতে বাধ্য করা হতো।
ট্রাম্প প্রশাসন তখন দাবি করেছিল, সীমিত ধারণক্ষমতার কারণে এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২০ সালে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের মহাপরিদর্শকের দফতরের তদন্তে দেখা যায়, অনেক সময় পর্যাপ্ত জায়গা খালি থাকা সত্ত্বেও আশ্রয়প্রার্থীদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তদন্তে আরো বলা হয়, দীর্ঘদিন মেক্সিকোতে অপেক্ষা করতে বাধ্য হওয়ায় অনেক মানুষ বৈধ প্রবেশপথ ব্যবহার না করে অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের ঝুঁকি নিয়েছিলেন।
নিম্ন আদালত রায় দিয়েছিল, সীমান্তে পৌঁছানো ব্যক্তিদের আবেদন গ্রহণ করা সীমান্ত কর্তৃপক্ষের আইনগত দায়িত্ব। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সে সিদ্ধান্ত বাতিল করে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে পৌঁছানো এক বিষয় নয়। আদালতের মতে, কেবল যারা শারীরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে প্রবেশ করেছেন, তারাই আইন অনুযায়ী আশ্রয়ের আবেদন ও প্রাথমিক পরিদর্শনের অধিকার দাবি করতে পারবেন।
সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত লিখতে গিয়ে বিচারপতি স্যামুয়েল আলিটো বলেন, কেউ বাড়ির দরজায় কড়া নাড়লেই সে বাড়িতে প্রবেশ করেছে-এমনটি বলা যায় না। অন্যদিকে বিচারপতি সোনিয়া সোটোমেয়র ভিন্নমতে বলেন, এ রায় যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক আশ্রয়ব্যবস্থার ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে নিপীড়নের শিকার অসংখ্য মানুষকে সীমান্তের বাইরে অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে রাখবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ রায়ের ফলে ভবিষ্যতের যেকোনো প্রশাসন আবারও সীমান্তে মিটারিং নীতি চালু বা আরো বিস্তৃত করতে পারবে। অতীতে এ নীতির কারণে হাজার হাজার আশ্রয়প্রার্থী উত্তর মেক্সিকোর অস্বাস্থ্যকর ও অনিরাপদ শরণার্থী শিবিরে সপ্তাহের পর সপ্তাহ, এমনকি মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। অনেকেই মাদকচক্র, অপহরণকারী ও সংঘবদ্ধ অপরাধী গোষ্ঠীর শিকার হয়েছিলেন। ভবিষ্যতে মধ্য বা দক্ষিণ আমেরিকায় নতুন কোনো মানবিক সংকট সৃষ্টি হলে এবং অভিবাসনের ঢল নামলে, সেই ধরনের সীমান্ত শিবির আবারও ফিরে আসতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।