যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট গত ২৯ জুন এক ঐতিহাসিক রায়ে জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন থেকে গুগল ব্যবহারকারীদের লোকেশন হিস্ট্রি বা অবস্থান তথ্য সংগ্রহ করতে চাইলে অবশ্যই আদালত থেকে বৈধ বিচারিক ওয়ারেন্ট নিতে হবে। ‘জিওফেন্স সার্চ’ নামে পরিচিত এ প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি পদ্ধতি এখন থেকে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর অধীনে একটি সার্চ বা তল্লাশি হিসেবে গণ্য হবে। ফলে ওয়ারেন্ট ছাড়া এ ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা যাবে না। ৬-৩ ভোটে বিভক্ত এ রায়কে ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, প্রযুক্তির অগ্রগতি সংবিধান প্রদত্ত নাগরিক অধিকারকে খর্ব করতে পারে না।
মামলার সূত্রপাত ভার্জিনিয়ার মিডলোথিয়ানে ২০১৯ সালের একটি ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা থেকে। ওই ঘটনায় এক ব্যক্তি প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার ডলার লুট করে পালিয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডাকাতের হাতে একটি মোবাইল ফোন ছিল। তদন্তের একপর্যায়ে পুলিশ আদালতের অনুমোদন নিয়ে গুগলের কাছ থেকে নির্দিষ্ট সময় ও এলাকার মধ্যে অবস্থান করা মোবাইল ব্যবহারকারীদের লোকেশন ডেটা সংগ্রহ করে। এই তথ্যে ভিত্তি করে ওকেলো চ্যাট্রিকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়। প্রথম ধাপে গুগল ওই এলাকায় থাকা ১৯ জন ব্যবহারকারীর তথ্য দেয়, পরে তদন্তকারীরা সে তালিকা সংকুচিত করে চ্যাট্রির দিকে পৌঁছায়।
এ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে, গুগলের লোকেশন হিস্ট্রি সংগ্রহ করা সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর অধীনে একটি তল্লাশি। ফলে সরকার যদি যেকোনো পরিমাণ লোকেশন ডেটাও সংগ্রহ করতে চায়, তাহলে তা আদালতের অনুমোদিত বৈধ ওয়ারেন্টের মাধ্যমেই করতে হবে। আদালত অবশ্য বর্তমান মামলায় ব্যবহৃত ওয়ারেন্টটি বৈধ ছিল কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না দিয়ে মামলাটি পুনর্বিবেচনার জন্য নিম্ন আদালতে ফেরত পাঠিয়েছে।
সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত লিখেছেন বিচারপতি এলেনা কাগান। তিনি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি সরকারকে এমন নজরদারির সক্ষমতা দিয়েছে, যা নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবনের ওপর অভূতপূর্ব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। তাই আদালতের দায়িত্ব হলো ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ওপর অযথা সরকারি হস্তক্ষেপ থেকে মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া। তিনি সতর্ক করে বলেন, মোবাইল ফোনের লোকেশন হিস্ট্রি সরকারের হাতে গেলে তা নাগরিকদের ওপর একটি ভার্চুয়াল প্যান অপটিকন বা সর্বব্যাপী নজরদারি ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে।
রায়ে বিচারপতি কাগান আরো উল্লেখ করেন, গুগলের লোকেশন হিস্ট্রি সাধারণ মোবাইল টাওয়ারভিত্তিক অবস্থান তথ্যের চেয়েও বেশি সংবেদনশীল। কারণ অনেক ব্যবহারকারী এটি ব্যক্তিগত ডায়েরির মতো ব্যবহার করেন। এতে তাদের প্রতিদিন কোথায় যাওয়া-আসা, কার সঙ্গে দেখা করা, কোথায় সময় কাটানো-এসব তথ্য সংরক্ষিত থাকে। তাই এই তথ্য ই-মেইল, ব্যক্তিগত নথি, ছবি কিংবা ক্যালেন্ডারের মতোই ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে সাংবিধানিক সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য।
রায়ের পর নাগরিক অধিকারবিষয়ক সংগঠন আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (এসিএলইউ) এটিকে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্য একটি বড় বিজয় বলে অভিহিত করেছে। সংগঠনটির সিনিয়র কাউন্সেল ব্রেট ম্যাক্স কাউফম্যান বলেন, আদালতের এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত বিস্তৃত ও অনুপ্রবেশমূলক সরকারি নজরদারির বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে। তিনি বলেন, গুগল ইতোমধ্যে তাদের সিস্টেমে পরিবর্তন এনেছে, যার ফলে আগের মতো লোকেশন হিস্ট্রি সংরক্ষিত হয় না। তবে ভবিষ্যতে অন্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকা সংবেদনশীল তথ্যও একই ধরনের নজরদারির ঝুঁকিতে পড়তে পারে। আদালতের এই রায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই সংবিধানের সীমাবদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।
এসিএলইউ অব ভার্জিনিয়ার লিগ্যাল ডিরেক্টর ইডেন হেইলম্যান বলেন, এ সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেছে যে, মানুষের চলাচলের ওপর ওয়ারেন্ট ছাড়া নজরদারি চালানোর জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে কোনো খোলা চেক নেই। তিনি বলেন, মানুষ শুধু মোবাইল ফোন ব্যবহার করে বলেই তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার হারিয়ে যায় না।
অন্যদিকে কেয়ারের ন্যাশনাল লিটিগেশন ডিরেক্টর লিনা মাসরি বলেন, এ রায় গোপনীয়তা অধিকার ও সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর জন্য একটি বড় বিজয়। তিনি বলেন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কখনোই মৌলিক সাংবিধানিক স্বাধীনতাকে দুর্বল করার অজুহাত হতে পারে না। সরকারি নজরদারির ক্ষমতা যত বাড়বে, আদালতের তত বেশি দায়িত্ব থাকবে নাগরিকদের গোপনীয়তা রক্ষা করার।
তিনি আরো বলেন, কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সময় শুধু ঘটনাস্থলের আশপাশে অবস্থান করার কারণে অসংখ্য নিরীহ মানুষের লোকেশন হিস্ট্রি সরকার গোপনে খুঁজে দেখতে পারবে,এমন আশঙ্কায় নাগরিকদের বসবাস করা উচিত নয়। ডিজিটাল যুগেও সাংবিধানিক অধিকার বিলুপ্ত হয়ে যায় না।
জিওফেন্স ওয়ারেন্টের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুগল বা অন্য প্রযুক্তি কোম্পানিকে নির্দিষ্ট সময় ও নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার মধ্যে থাকা সব মোবাইল ডিভাইসের অবস্থান তথ্য দিতে বাধ্য করতে পারে। এতে তদন্তকারীদের কাছে এমন বহু মানুষের তথ্য চলে আসে, যাদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধে জড়িত থাকার নির্দিষ্ট অভিযোগ বা সম্ভাব্য কারণ থাকে না।
নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষাকারী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের অনুসন্ধানকে ‘ডিজিটাল ড্র্যাগনেট’ বা ‘ডিজিটাল ফিশিং এক্সপেডিশন’ বলে সমালোচনা করে আসছে। তাদের মতে, এটি সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে লক্ষ্য না করে বরং একই এলাকায় উপস্থিত অসংখ্য নিরীহ মানুষের তথ্য সংগ্রহ করে, যা সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মূল চেতনার পরিপন্থী।
রক্ষণশীল বিচারপতিদের তিনজন এ রায়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। তাদের মতে, আদালতের এ সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে অপরাধ তদন্তকে আরো জটিল করে তুলতে পারে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা মনে করেন, প্রযুক্তিগত সুবিধা কখনোই ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সাংবিধানিক অধিকারকে উপেক্ষা করার বৈধতা দিতে পারে না।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ রায় ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ তদন্তের ধরন বদলে দিতে পারে। এখন থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জিওফেন্স বা এ ধরনের লোকেশনভিত্তিক তথ্য সংগ্রহের আগে আদালতের কাছে যথাযথ কারণ দেখিয়ে ওয়ারেন্ট নিতে হবে। একই সঙ্গে নিম্ন আদালতগুলোকে আরো কঠোরভাবে পরীক্ষা করতে হবে, সংশ্লিষ্ট ওয়ারেন্ট সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর সব শর্ত পূরণ করেছে কি না।বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু গুগলের লোকেশন ডেটা নয়, ভবিষ্যতে অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কাছে সংরক্ষিত ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের যুগে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে একটি যুগান্তকারী সাংবিধানিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।