প্লানো মসজিদে ‘শরিয়া আইন’ প্রয়োগের কোনো প্রমাণ নেই


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 01-07-2026

প্লানো মসজিদে ‘শরিয়া আইন’ প্রয়োগের কোনো প্রমাণ নেই

টেক্সাস স্টেটের প্লানোর ইস্ট প্লানো ইসলামিক সেন্টার (এপিক)-এর জানাজা ও দাফন-সংক্রান্ত কার্যক্রমে ‘শরিয়া আইন’ প্রয়োগের কোনো প্রমাণ নেই বলে মন্তব্য করেছেন ইউএস ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট ফর দ্য ওয়েস্টার্ন ডিস্ট্রিক্ট অব টেক্সাস, অস্টিন ডিভিশনের অস্টিন ডিভিশনের সিনিয়র ফেডারেল জেলা বিচারক ডেভিড অ্যালান এজরা। গত ২৬ জুন দেওয়া এক আদেশে বিচারক এজরা টেক্সাস ফিউনারেল সার্ভিস কমিশনের সাবেক প্রেসাইডিং অফিসার ক্রিস্টিন টিপসের মামলা খারিজের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, মামলার নথিপত্রে এমন কোনো প্রমাণ বা অভিযোগ নেই যা থেকে বোঝা যায় এপিকের ইসলামি দাফন-প্রথা এমন ধরনের শরিয়া আইন, যার মাধ্যমে টেক্সাসের আইন বা শাসনব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

রায়ের এক ফুটনোটে বিচারক লিখেছেন, এ আদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে এবং ইসলামি শিক্ষার বিশেষজ্ঞ হওয়ার দাবি না করেই আদালত শুধু এটুকু লক্ষ করছে, মামলায় এমন কোনো প্রমাণ বা অভিযোগ নেই, যা দেখায় যে ইসলামি দাফন-সংক্রান্ত ধর্মীয় রীতিনীতি সে ধরনের শরিয়া আইন, যা টেক্সাসের আইনের জন্য হুমকি সৃষ্টি করে। তিনি আরো উল্লেখ করেন, টেক্সাস ফিউনারেল সার্ভিস কমিশন ইস্ট প্লানো ইসলামিক সেন্টারকে যে সিজ অ্যান্ড ডিজস্ট নোটিশ পাঠিয়েছিল, সেখানে তাদের কার্যক্রমের কোনো নির্দিষ্ট অংশ টেক্সাসের আইন লঙ্ঘন করেছে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।

বিচারক এজরা তার আদেশে বলেন, কমিশনের তদন্তে ক্রিস্টিন টিপসের সম্পৃক্ততা এবং আচরণ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে নিশ্চিত ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার এবং চতুর্দশ সংশোধনীর সমান আইনি সুরক্ষার অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠা করে। রায়ে বলা হয়, যখন অন্য ধর্মীয় গোষ্ঠীর অনুরূপ দাফন-প্রথা অনুমোদিত হচ্ছে, তখন শুধু একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দাফন-সংক্রান্ত ধর্মীয় আচারকে নিষিদ্ধ করার চেষ্টা এবং কমিশনের দীর্ঘদিনের চর্চা থেকে সরে আসা ইস্ট প্লানো ইসলামিক সেন্টারের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমান সুরক্ষার সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করে।

২০২৫ সালের মার্চ মাসে টেক্সাস ফিউনারেল সার্ভিস কমিশনইস্ট প্লানো ইসলামিক সেন্টারকে একটি সিজ অ্যান্ড ডিজস্ট নোটিস পাঠিয়ে অভিযোগ করে, তারা প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ছাড়াই অবৈধভাবে একটি ফিউনারেল হোম পরিচালনা করছে। এর চার মাস পর, জুলাইয়ে ইস্ট প্লানো ইসলামিক সেন্টার ফেডারেল আদালতে মামলা দায়ের করে। মসজিদ কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করে, কমিশন তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেছে এবং আইনগত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে তদন্ত পরিচালনা করেছে।

পরে কমিশন আদালতে জানায়, যদি ইস্ট প্লানো ইসলামিক সেন্টার শুধু মুসলিম সম্প্রদায়কে জানাজা ও দাফনের তথ্য প্রদান করে, অথবা স্বজনদের লাইসেন্সপ্রাপ্ত ফিউনারেল হোম বা ফিউনারেল ডিরেক্টরের সঙ্গে যোগাযোগে সহায়তা করে, তাহলে তা কমিশনের নির্দেশনা লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে না। এ তদন্তটি ছিল ইস্ট প্লানো ইসলামিক সেন্টারকে ঘিরে অন্তত পাঁচটি পৃথক রাজ্য পর্যায়ের তদন্তের একটি। এসব তদন্ত শুরু হয়েছিল ইস্ট প্লানো ইসলামিক সেন্টারের প্রস্তাবিত আবাসন প্রকল্প এপিক সিটি, যা পরে দ্য মেডো নামে পরিচিত হয়, তা নিয়ে রিপাবলিকান রাজনীতিকদের তীব্র বিরোধিতার পর।

প্রকল্পটির বিরোধীরা অভিযোগ করেন, ইস্ট প্লানো ইসলামিক সেন্টার টেক্সাসে শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। তবে বিচারক এজরার আদেশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, মামলায় এমন কোনো প্রমাণ নেই, যা এ অভিযোগকে সমর্থন করে। আদালত আরো উল্লেখ করে, ইসলামী ধর্মীয় দাফন প্রথাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শরিয়া আইন হিসেবে চিহ্নিত করার কোনো আইনি ভিত্তি মামলায় উপস্থাপন করা হয়নি। মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ক্রিস্টিন টিপস এবং কমিশনের সাবেক নির্বাহী পরিচালক স্কট বিংগাম্যানের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া টেক্সট বার্তা।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব বার্তায় দেখা যায়, টিপস ইসলামবিরোধী ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট এবং মুসলিম আইনপ্রণেতাদের ছবি শেয়ার করেছিলেন। একটি ভিডিওতে দাবি করা হয়েছিল, ইস্ট প্লানো ইসলামিক সেন্টারের আবাসন প্রকল্প সন্ত্রাসী তৈরি করবে। অন্য একটি গ্রাফিকে ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম ও ইহুদি ধর্মের তুলনা করে প্রসঙ্গহীনভাবে দাবি করা হয়, কোরআনে অমুসলিমদের অধম বলা হয়েছে এবং অমুসলিম কেউ কোরআন স্পর্শ করলে তার মৃত্যুদণ্ড হতে পারে।

ইস্ট প্লানো ইসলামিক সেন্টার আদালতে তাদের সংশোধিত অভিযোগে দাবি করে, এসব বার্তা তদন্ত চলাকালে কমিশনের শীর্ষ কর্মকর্তার ধর্মীয় পক্ষপাতের স্পষ্ট প্রমাণ। মামলায় আরো উঠে আসে যে, টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট-এর কার্যালয়ও তদন্তে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ফাঁস হওয়া একটি অডিও রেকর্ডিংয়ে গভর্নরের এক উপদেষ্টাকে কমিশনের সাবেক নির্বাহী পরিচালককে বলতে শোনা যায়, গভর্নরের জেনারেল কাউন্সেল টেক্সাসের ফিউনারেল আইন খতিয়ে দেখবেন, যাতে ইস্ট প্লানো ইসলামিক সেন্টারকে ফিউনারেল লাইসেন্স দেওয়া ঠেকানোর উপায় বের করা যায়। এমনকি ইস্ট প্লানো ইসলামিক সেন্টারের নৈতিকতা ও আচরণবিধিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করারও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

তবে গভর্নর অ্যাবটের প্রেস সেক্রেটারি অ্যান্ড্রু মাহালেরিস এক বিবৃতিতে বলেন, গভর্নরের কার্যালয় নিয়মিতভাবেই বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য সংস্থার সঙ্গে কাজ করে এবং যেসব প্রতিষ্ঠান আমাদের সম্প্রদায়ে শরিয়া আইন চাপিয়ে দিতে চায়, তাদের টেক্সাসে স্বাগত নয়। বিচারক এজরা বলেন, কমিশনের তদন্তকে ঘিরে সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং টিপসের কর্মকাণ্ড থেকে তার বিরুদ্ধে পক্ষপাতের যুক্তিসংগত ইঙ্গিত বা বিশ্বাসযোগ্য পক্ষপাতের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

তিনি আরো উল্লেখ করেন, কমিশন অতীতে একই ধরনের পরিস্থিতিতে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিল। রায়ে বলা হয়, ১৯৮৭ এবং ২০১৪ সালে টেক্সাস ফিউনারেল সার্ভিস কমিশন দুটি পৃথক মসজিদকে লাইসেন্স ছাড়াই ইসলামি দাফন-সংক্রান্ত ধর্মীয় আচার পালনের অধিকার স্বীকৃতি দিয়েছিল, যতক্ষণ তারা অঙ্গরাজ্যের আইন মেনে চলেছে। সে দীর্ঘদিনের নীতি থেকে সরে এসে শুধু ইস্ট প্লানো ইসলামিক সেন্টারকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, এমন অভিযোগকে আদালত গুরুত্ব দিয়েছে।

ক্রিস্টিন টিপস আদালতে যুক্তি দিয়েছিলেন, সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তিনি কোয়ালিফায়েড ইমিউনিটি বা বিশেষ আইনি সুরক্ষার আওতায় পড়েন, ফলে তার বিরুদ্ধে মামলা চলতে পারে না। কিন্তু বিচারক এজরা সে দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে ইস্ট প্লানো ইসলামিক সেন্টারের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে টিপসের বিরুদ্ধে মামলা এখন পরবর্তী ধাপে এগোতে পারবে।

বিচারক ডেভিড অ্যালান এজরা ১৯৮৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের মনোনয়নে ফেডারেল বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। পরে সিনিয়র বিচারক হিসেবে তিনি ২০১২ সালে টেক্সাসের ওয়েস্টার্ন ডিস্ট্রিক্টে দায়িত্ব পালন শুরু করেন, যাতে আদালতের মামলার চাপ কমানো যায়। এ রায়ে আদালত মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করেনি। তবে বিচারকের আদেশে স্পষ্ট করা হয়েছে, বর্তমান পর্যায়ে ইস্ট প্লানো ইসলামিক সেন্টারের অভিযোগগুলো পর্যাপ্ত আইনি ভিত্তিসম্পন্ন এবং মামলাটি পূর্ণাঙ্গ বিচারিক প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যাওয়ার মতো যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য।

টেক্সাসের সরকারি স্কুলে ধর্মীয় পাঠ্য অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বিতর্ক

টেক্সাসের সরকারি স্কুলগুলোতে বাধ্যতামূলক পাঠ্যতালিকায় বাইবেলের গল্প ও ধর্মীয় পাঠ অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। সমর্থকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বোঝার জন্য জুডিও-খ্রিস্টান ঐতিহ্য জানা গুরুত্বপূর্ণ। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, এতে ধর্মীয় বৈচিত্র‍্য উপেক্ষিত হচ্ছে এবং অখ্রিস্টান শিক্ষার্থীদের জন্য অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।

ডালাস এলাকার এক উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক অ্যালিস ডেন্ট বলেন, তিনি বাইবেলের গল্প শেখালেও মুসলিম বা নাস্তিক শিক্ষার্থীরা এটিকে ধর্মীয় শিক্ষা হিসেবে নিতে পারে, যা শ্রেণিকক্ষে সমস্যা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে টেক্সাস পাবলিক পলিসি ফাউন্ডেশনের ম্যানডি ড্রগিন বলেন, বাইবেলসহ এসব সাহিত্য আমেরিকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং তা পাঠ্যক্রমে থাকা উচিত। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১০ জন সরকারি স্কুলশিক্ষার্থীর একজন টেক্সাসে পড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজ্যটি স্কুলে ধর্মীয় বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে, যেখানে চ্যাপলিন নিয়োগ ও বাইবেলভিত্তিক ঐচ্ছিক পাঠ্যক্রমও চালু করা হয়েছে।

২০২৩ সালের আইনে প্রতি শ্রেণিতে অন্তত একটি সাহিত্যকর্ম বাধ্যতামূলক করা হলেও নতুন তালিকায় প্রায় ২০০টি পাঠ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে বাইবেলের অংশও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্মীয় গ্রন্থকে বাধ্যতামূলক করা যুক্তরাষ্ট্রে বিরল। নতুন তালিকায় প্রাথমিক থেকে উচ্চ বিদ্যালয় পর্যন্ত বাইবেলের গল্প, শেক্সপিয়ারের নাটক, জেন অস্টেনের প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস এবং অন্যান্য ক্লাসিক সাহিত্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তালিকাটি বৈচিত্র‍্যহীন এবং শ্বেতাঙ্গকেন্দ্রিক। তবে সমর্থকদের মতে, এটি আমেরিকার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে প্রতিফলিত করে। এ সিদ্ধান্তকে ঘিরে টেক্সাসে শিক্ষা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সরকারি স্কুলের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক আরো তীব্র হচ্ছে।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)