মুসলিম বাড়ি ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা : রিয়েল এস্টেট ব্রোকার দোষী সাব্যস্ত


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 01-07-2026

মুসলিম বাড়ি ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা : রিয়েল এস্টেট ব্রোকার দোষী সাব্যস্ত

মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যে মুসলিম বাড়ি ক্রেতাদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে পুঁজি করে পরিচালিত বহুল আলোচিত একটি আবাসন প্রতারণা মামলায় রিয়েল এস্টেট ব্রোকার চ্যাডউইক (চ্যাড) ব্যাংকেনকে দোষী সাব্যস্ত করেছে জুরি। গত ২৯ জুন দুই সপ্তাহব্যাপী বিচার, শত শত নথিপত্র পর্যালোচনা এবং প্রায় আট ঘণ্টার পরামর্শ শেষে জুরি রায় দেয় যে ব্যাংকেন ধর্মীয় বৈষম্য, ভোক্তা প্রতারণা এবং একাধিক অঙ্গরাজ্য ও ফেডারেল আইন লঙ্ঘন করেছেন। মামলাটি দায়ের করেছিল মিনেসোটার অ্যাটর্নি জেনারেল কিথ এলিসনের কার্যালয়। ২০২২ সালে প্রোপাবলিকা ও সাহান জার্নালের যৌথ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রথম এ প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে আসে। তদন্তে উঠে আসে, ব্যাংকেন বিশেষ করে সোমালি বংশোদ্ভূত মুসলিম অভিবাসী পরিবারগুলোকে ‘শরিয়াহ-সম্মত’ বা সুদমুক্ত বাড়ি কেনার প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণামূলক কন্ট্রাক্ট ফর ডিড চুক্তিতে আবদ্ধ করতেন, যেখানে তাদের কাছ থেকে অস্বাভাবিকভাবে বেশি মূল্য, বড় অঙ্কের ডাউন পেমেন্ট এবং কঠোর অর্থ পরিশোধের শর্তারোপ করা হতো।

আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণে দেখা যায়, ব্যাংকেন ১৬০টিরও বেশি বাড়ি এ পদ্ধতিতে বিক্রি করেন। মুসলিম ক্রেতাদের কাছে একই ধরনের বাড়ি অমুসলিমদের তুলনায় বেশি দামে বিক্রি করা হতো, তাদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের ডাউন পেমেন্ট নেওয়া হতো এবং মাসিক কিস্তিও বেশি নির্ধারণ করা হতো। অনেক চুক্তিতে কয়েক লাখ ডলারের বেলুন পেমেন্ট রাখা হতো, যা অধিকাংশ ক্রেতার পক্ষে পরিশোধ করা সম্ভব ছিল না। ফলে তারা চুক্তি ভঙ্গ করলে বছরের পর বছর পরিশোধ করা অর্থ, ডাউন পেমেন্ট এবং বাড়ির অধিকার সবই হারিয়ে ফেলতেন। এরপর ব্যাংকেন একই বাড়ি আবার অন্য ক্রেতার কাছে বিক্রি করে নতুন করে লাভ করতেন। রাষ্ট্রপক্ষ আরো অভিযোগ করে, অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত সুদের বিষয়টি গোপন রাখা হতো অথবা বাড়ির অস্বাভাবিকভাবে বেশি মূল্যের মধ্যেই সুদের অর্থ অন্তর্ভুক্ত করা হতো, যদিও পুরো প্রকল্পটি শরিয়াহ-সম্মত ও সুদমুক্ত হিসেবে প্রচার করা হতো।

সাত সদস্যের জুরি সর্বসম্মতিক্রমে রায় দেয় যে ব্যাংকেন কনজিউমার ফাইন্যান্সিয়াল প্রোটেকশন অ্যাক্ট, প্রতারণামূলক, বিভ্রান্তিকর ও অন্যায্য ব্যবসায়িক কার্যক্রম-সংক্রান্ত ফেডারেল বিধান, মিনেসোটার প্রিভেনশন অ্যাগেইনস্ট কনজিউমার ফ্রড অ্যাক্ট, ইউনিফর্ম ডিসেপটিভ ট্রেড প্র্যাকটিসেস অ্যাক্ট এবং মিনেসোটা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্ট লঙ্ঘন করেছেন। জুরি আরো সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে মুসলিম হওয়ার কারণেই অনেক ক্রেতাকে অমুসলিমদের তুলনায় কঠোর ও ব্যয়বহুল শর্তে বাড়ি কিনতে বাধ্য করা হয়েছে। এ কারণে এটি শুধু ভোক্তা প্রতারণাই নয়, ধর্মীয় বৈষম্যেরও সুস্পষ্ট ঘটনা।

জুরি সদস্য ক্রিস্টোফার ক্লার্ক রায় ঘোষণার পর বলেন, তারা আবেগঘন সাক্ষ্যের পরিবর্তে আইনের ভাষা এবং শত শত নথিপত্র বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার ভাষায়, শুরুতে তার মনে হয়নি এটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের মামলা হতে পারে। কিন্তু আইনের বিধান ও উপস্থাপিত প্রমাণ পর্যালোচনা করে তারা স্পষ্টভাবে দেখতে পান যে ধর্মীয় বৈষম্য সংঘটিত হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে তার মনে হয়নি ব্যাংকেন ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষকে ক্ষতি করতে চেয়েছিলেন, তবে তার ব্যবসা পরিচালনায় গুরুতর আইন লঙ্ঘন ও অবহেলার যথেষ্ট প্রমাণ ছিল।

বিচার চলাকালে একাধিক মুসলিম পরিবার আদালতে তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। কেউ জীবনের সঞ্চয় হারিয়েছেন, কেউ বাড়ি হারিয়ে গৃহহীন হয়েছেন, এমনকি একজন ভুক্তভোগী আদালতে জানান যে তিনি শেষ পর্যন্ত নিজের ট্রাকেই বসবাস করতে বাধ্য হন। আরেকজন সোমালি ট্রাকচালক সাক্ষ্যে বলেন, শুরুতে তাকে যে মূল্যের কথা বলা হয়েছিল, চুক্তির শেষ পর্যায়ে সে মূল্য প্রায় ৯০ হাজার ডলার বেড়ে যায় এবং চুক্তি বাতিল করতে চাইলে তার ডাউন পেমেন্ট বাজেয়াপ্ত করার হুমকি দেওয়া হয়।

ব্যাংকেনের আইনজীবী আদালতে দাবি করেন, তার মক্কেল কেবল প্রচলিত ব্যাংকঋণের বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ দিয়েছিলেন এবং যারা ধর্মীয় কারণে সুদভিত্তিক মর্টগেজ নিতে চাননি বা ব্যাংক থেকে ঋণ পাননি, তাদের জন্যই এ ব্যবস্থা ছিল। তিনি বলেন, কিছু লেনদেন সফল না হওয়া ব্যবসায়িক ঝুঁকির অংশ, এটি প্রতারণা নয়। তবে রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি দেয়, অনেক ক্রেতা ইংরেজিতে দক্ষ ছিলেন না এবং প্রকৃত আর্থিক শর্ত সম্পর্কে তাদের যথাযথভাবে অবহিত করা হয়নি; বরং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন রেখে তাদের দিয়ে চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো হয়েছে।

এটি একটি দেওয়ানি মামলা হওয়ায় ব্যাংকেনের কারাদণ্ডের সম্ভাবনা নেই। তবে হেনেপিন কাউন্টি জেলা আদালতের বিচারক জুরির রায় বহাল রাখলে তাকে ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দিতে, প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ ফেরত দিতে, প্রতিটি আইন লঙ্ঘনের জন্য সর্বোচ্চ ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত দেওয়ানি জরিমানা দিতে এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের আবাসন অর্থায়ন ব্যবসা পরিচালনার ওপর নিষেধাজ্ঞাসহ অন্যান্য ভোক্তা সুরক্ষা আদেশের মুখোমুখি হতে পারেন। ক্ষতিপূরণ ও জরিমানার চূড়ান্ত পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। পরবর্তী শুনানিতে বিচারক ভুক্তভোগীদের আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন করে চূড়ান্ত আদেশ দেবেন।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)