ঢালিউডের জনপ্রিয় দু’জন চিত্রনায়িকার সম্প্রতি প্রকাশিত বক্তব্যে শুধু বিনোদন জগতই না পুরো প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলাপাড় বইছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে দেশের একজন জনপ্রতিনিধি ও এর পাশাপাশি প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা কিভাবে রাষ্ট্রের অত্যন্ত স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিজের মতো করে ব্যবহার করেছে। তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছে। আর এর পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে জানাজানির পরও কি করে রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান পর্যন্ত টু-শব্দ করেননি, দেয়নি গুরুত্ব।
ঘটনা এক
পরিমনী যা বললেন
সম্প্রতি ‘আমার সম্মান কি ফিরিয়ে দেবে রাষ্ট্র?’ র্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া প্রসঙ্গে চিত্রনায়িকা পরীমনি কিছু বক্তব্য দিযেছেন। এতে তিনি একজন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারের দাবি করতে গিয়ে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরের যে তথ্য তা ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। চিত্রনায়িকা পরীমনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চার বছর আগে র্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া নিয়ে দীর্ঘ এক বক্তব্য দিয়েছেন। বক্তব্যের এক অংশে তিনি দাবি করেছেন, ২০২১ সালের ৪ আগস্ট তাঁকে ‘সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে’ এবং ‘বিশেষ মহলের স্বার্থে’ গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সেই ঘটনার কারণে তাঁর ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পেশাগত জীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের কাছে জানতে চেয়েছেন, হারিয়ে যাওয়া সম্মান, মানসিক শান্তি ও জীবনের সেই সময়গুলো আদৌ ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব কি না।
তার এই আকুল আবেদনের পাশাপাশি তিনি একটি তথ্য দিয়েছেন, তা হচ্ছে খুবই ভয়াবহ ও স্পর্শকাতর। ফেসবুক স্ট্যাটাসে এতে তিনি জানান যে র্যাবের সাবেক গোয়েন্দা প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল খাইরুল ইসলাম একটি অনলাইন টক শোতে ওই তথ্য দিয়েছেন। তিনি এজন্য র্যাবের সাবেক গোয়েন্দা প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল খাইরুল ইসলাম ধন্যবাদ জানিয়ে সে-ই তথ্য জনগণের কাছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা শেয়ার করে দিয়েছেন। এতথ্য শেয়ার করে পরিমনী জানান এর মাধ্যম তিনি একটি সত্য ঘটনা জানতে পেরেছেন। এজন্য তিনি ধন্যবাদ জানিয়ে লিখেছেন, সম্প্রতি একটি অনলাইন টক শোতে তিনি (লেফটেন্যান্ট কর্নেল খাইরুল ইসলাম) এমন কিছু তথ্য প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, যার মাধ্যমে দেশের মানুষ জানতে পেরেছেন, ‘বনানীতে তাঁর বাসায় দীর্ঘ অভিযানের পর তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের নির্দেশে তাঁকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।’
অথচ ওই সময়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ৪ আগস্ট বনানীর বাসায় অভিযান চালিয়ে পরীমনিকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। পরে র্যাব-১-এর কর্মকর্তা মো. মজিবর রহমান বাদী হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, পরীমনির বাসা থেকে বিদেশি মদ, চার গ্রাম আইস (ক্রিস্টাল মেথ) এবং একটি এলএসডি ব্লট উদ্ধার করা হয়েছে। বর্তমানে এ মামলাটি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-১০-এ সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।
ঘটনা দুই..
মাহিয়া মাহি যা বললেন
এদিকে ঢালিউডের চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি তার স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে কিছু বক্তব্য দিয়েছে তা-ও ভয়াবহ। এতে তিনি সম্প্রতি আলোচিত ও বিতর্কিত সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানকে নিয়ে দেওয়া এক ভিডিও বার্তা দেন। মাহিয়া মাহি তাঁর ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে মুরাদ হাসানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন। ভিডিওর ক্যাপশনে তিনি লেখেন, ‘অসভ্য মুরাদ ও বিহারিদের গাত্রদাহ। সবাইকে একবার শোনার অনুরোধ জানাচ্ছি। এটা একটা নায়িকা না, একজন মায়ের অনুরোধ।’ মাহি জানায় যে, একটি পুরোনো অডিও ক্লিপকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে তাঁকে নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য করা হচ্ছে। কিন্তু পুরো ঘটনা না বুঝে অনেকেই তাঁকে দোষারোপ করছেন। তাঁর দাবি, অডিওতেই স্পষ্ট শোনা যায় যে ডা. মুরাদ হাসান বলছেন, ‘ও তো আমার ফোন ধরবে না।’ মাহি দেশের মানুষের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা কি এতটুকুও বোঝেন না? অডিওতে তো স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে, উনি (মুরাদ হাসান) বলছেন, ও তো আমার ফোন ধরবে না। তার মানে আমি তার ফোন ধরতাম না। আমাকে তিনি আমার ফোনে রিচ করতে পারতেন না বলেই অন্য একজনের ফোন ব্যবহার করে কথা বলেছেন। আমি তো তাকে ব্লক করে রেখেছিলাম।’
তবে মাহি তাঁর ভিডিওতে এক জায়গায় রাষ্ট্রের অত্যন্ত স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানে ভযাবহ দুর্বলতার চিত্র প্রকাশ পেয়ে যায়। কারণ দেখা যাচ্ছে ওই ‘অডিওতে মুরাদ হাসান স্পষ্টভাবে বলছেন, র্যাব পাঠাব, পুলিশ পাঠাব, এনএসআই পাঠাব, ডিজিএফআই পাঠাব। অন্যদিকে এসব বলতে গিয়ে ভিডিওতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রসঙ্গও টানেন মাহি। তাঁর ভাষ্যমতে, ‘আমি যদি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলতে পারতাম, তাহলে অবশ্যই বিষয়টি জানাতাম। আমি বিশ্বাস করি, তিনি ব্যবস্থা নিতেন। কিন্তু তাঁর কাছে পৌঁছাতে না পারায় আমাকে বিষয়টি ভদ্রভাবে সামলাতে হয়েছে।’
দু’টি ঘটনায় রাষ্ট্রীয় স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে বিস্ময়কর তথ্য..
প্রকাশিত উপরের দুই ঘটনায় প্রশ্ন হচ্ছে তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের নির্দেশে যদি ‘বনানীতে চিত্রনায়িকা পরীমনি বাসায় অভিযান চালানো হয় তাহলে এর পেছনেই বা আরও কারা ছিল? না-কি তা শুধু সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা খায়েশে ওই ধরনের অভিযান করা হয়েছে? এসব নিয়ে তদন্তে চলে আসা উচিত বলে অনেকে মনে করেন। কেননা এই ঘটনা পুরো বিশ্লষণ করলে যে অর্থ দাঁড়ায় তা হলো কিভাবে আওয়ামী লীগ শাসনামলে রাষ্ট্রের এসব স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানগুলি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফেলে কতটা সহজেই টুনকো কাছে জড়িত হয়ে যেতো..। এখানে এসব কর্মকর্তার অন্য কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল কি-না তা তলিয়ে দেখা দরকার বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
অন্যদিকে দেশের একজন সাবেক তথ্যমন্ত্রী কিভাবে দেশের স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানগুলিকে তার নিজস্ব সম্পদ মনে করতা তা বেড়িয়ে পড়েছে মাহির বক্তব্যে। তা না হলে কি করে বলে সহজেই বলে দেন ‘র্যাব পাঠাব, পুলিশ পাঠাব, এনএসআই পাঠাব, ডিজিএফআই পাঠাব’? এধরনের বক্তব্যে কি ধরে নেওয়া যায় না রাষ্ট্রের অত্যন্ত স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানগুলি ছিলো আওয়ামী লীগ আমলে ছেলের হাতের মোওয়ার মতো? র্যাব পাঠাব, তা না হলে পুলিশ পাঠাব, এনএসআই পাঠাব, ডিজিএফআই- নিয়ে ওই ধরনের হুঙ্কারের নেপথ্যে কি? র্যাব, এনএসআই এবং ডিজিএফআই হলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার তিনটি প্রধান স্তম্ভ। রাষ্ট্রের এসব প্রতিষ্ঠান কি আওয়ামী শাসনামলে তাহলে কি সাধারণ একজন মন্ত্রীর কথাতোই কি উঠতো বসতো? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকমহল মনে করেন ঘটনার আড়ালে ঘটনা লুকায়িত থাকে..সেক্ষেত্রে উপরের দু’টি ঘটনা নাড়াচাড়া করলে বোঝা যাবে দীর্ঘ পনের বছরে আসলে এই স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানগুলিকে কারা কাদের স্বার্থে ব্যবহৃত হয়েছে এবং আসলে কতটা নিচে নামিয়েছিলেন.... আর কারা এর পেছনে ছিলো?