মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যু


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 15-07-2026

মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যু

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী রিপাবলিকান সিনেটর ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র লিন্ডসে গ্রাহাম গত ১১ জুলাই মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। গ্রাহামের কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তার পরিবার এ কঠিন সময়ে সবার প্রার্থনা কামনা করছে এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখার অনুরোধ জানিয়েছে। মার্কিন ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়ার মেডিকেল এক্সামিনারের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রাহামের মৃত্যু হয়েছে অ্যার্টিক ডিসেকশনের কারণে, যা ধমনীর শক্ত হয়ে যাওয়া-সংক্রান্ত হৃদরোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে বিষক্রিয়া পরীক্ষা ও মাইক্রোস্কোপিক পরীক্ষার পর মৃত্যুর কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত করা হবে।

গ্রাহাম ২০০২ সালে প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে নির্বাচিত হন। এরপর ২০০৮, ২০১৪ ও ২০২০ সালে পুনর্নির্বাচিত হন। এর আগে তিনি ১৯৯৫ সালে সাউথ ক্যারোলাইনার তৃতীয় কংগ্রেসনাল জেলার প্রতিনিধি হিসেবে মার্কিন হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে দায়িত্ব পালন করেন। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি সিনেট বাজেট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি সিনেট অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস কমিটি, বিচার বিভাগীয় কমিটি এবং পরিবেশ ও গণপূর্ত কমিটির সদস্য ছিলেন। গ্রাহাম প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতিতে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিলেন।

গ্রাহাম ছিলেন ইসরায়েলের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মার্কিন সমর্থক। গ্রাহাম ইসরায়েলের একজন শক্তিশালী সমর্থক ছিলেন এবং ইরান ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর নীতির পক্ষেও অবস্থান নিয়েছিলেন। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বলেছে, তিনি ইসরায়েলের কঠিন সময়ে পাশে থাকা একজন বড় বন্ধু ছিলেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ইসরায়েল তার অন্যতম বড় বন্ধুকে হারিয়েছে।

মার্কিন রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুর পর তার রাজনৈতিক জীবন ও বিভিন্ন বিতর্কিত মন্তব্য আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলের প্রতি তার দৃঢ় সমর্থন এবং যুদ্ধবিষয়ক কঠোর মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে শেয়ার হচ্ছে। তিনি এক বক্তব্যে বলেছিলেন, গাজায় টোকিও ও বার্লিনে আমরা যা করেছিলাম, তাই করুন। পুরো এলাকাটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত করুন। এছাড়া তিনি আরো বলেন, আমরা একটি ধর্মীয় যুদ্ধে আছি। আমি ইসরায়েলের পাশে আছি। নিজেদের রক্ষার জন্য যা যা করা দরকার, তাই করুন।

আরেক বক্তব্যে গ্রাহাম বলেন, এ যুদ্ধ জিততে ইসরায়েলের যা যা প্রয়োজন, তা তাদের দেওয়া উচিত। এটি এমন একটি যুদ্ধ, যা তারা হারার সামর্থ্য রাখে না। গাজা যুদ্ধের সময় দেওয়া এসব মন্তব্য বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্ক, সমালোচনা ও নৈতিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল। মানবাধিকার সংগঠন ও শান্তিকামী মহল এসব বক্তব্যের সমালোচনা করলেও তার সমর্থকরা এগুলোকে ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারের প্রতি সমর্থন হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অনেক পোস্টে গ্রাহামের বক্তব্য সংক্ষিপ্ত বা সম্পাদিত আকারে তুলে ধরা হলেও, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী এগুলোর মূল বক্তব্য তার প্রকাশ্য মন্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তার মৃত্যুতে একজন প্রভাবশালী মার্কিন রাজনীতিকের দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও, মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং গাজা যুদ্ধ নিয়ে তার অবস্থান ও মন্তব্য ভবিষ্যতেও বিতর্কের বিষয় হয়ে থাকবে।

তিনি ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানকে জোরালোভাবে সমর্থন করেছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তার ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের পক্ষে লিন্ডসে গ্রাহাম সবসময় দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন।

২০১৬ সালে গ্রাহাম রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে অংশ নিয়েছিলেন। তবে প্রাথমিক ভোট শুরু হওয়ার আগেই তিনি সেই প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ান। সে সময় তিনি ট্রাম্পের একজন প্রকাশ্য সমালোচক ছিলেন। পরে অবশ্য কংগ্রেসে ট্রাম্পের অন্যতম দৃঢ় সমর্থকে পরিণত হন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ছিলেন আমার পরিচিত অন্যতম সেরা মানুষ ও সিনেটর। তিনি সবসময় কাজ করে যেতেন এবং একজন সত্যিকারের আমেরিকান দেশপ্রেমিক ছিলেন।

গ্রাহাম ইউক্রেনের প্রতি সমর্থনের জন্যও পরিচিত ছিলেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়ার আগ্রাসনের সময় গ্রাহাম ইউক্রেনের পাশে ছিলেন এবং প্রয়োজনের সময়ে দেশটিতে সফর করেছেন। জেলেনস্কি জানান, গ্রাহাম ইউক্রেনের জন্য নিষেধাজ্ঞা জোরদারসহ শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করতেন। রাজনীতিতে আসার আগে গ্রাহাম ছয় বছরের বেশি সময় মার্কিন বিমানবাহিনীর আইনজীবী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯৫ সালে তিনি বিমানবাহিনীর রিজার্ভে যোগ দেন এবং প্রায় ২০ বছর দায়িত্ব পালনের পর কর্নেল পদমর্যাদায় অবসর নেন। মৃত্যুর সময় গ্রাহাম সিনেটে নিজের পঞ্চম মেয়াদের জন্য নির্বাচনী প্রচারে ছিলেন। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে মার্কিন রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা এই রিপাবলিকান নেতা প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)