কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঠেকিয়ে দিতে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) প্রস্তাব দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। ইসির জ্যেষ্ঠ সচিবকে দেওয়া এক চিঠিতে দলটি এই ধরনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। জামায়াতের এইধরনের উদ্যোগকে ভিন্ন চোখে দেখছে বিএনপির নীধিনির্ধারকরা। বিএনপির নেতারা মনে করেন, ফ্যাসীবাদ বিরোধী কার্যক্রমের অংশ হিসাবে এটাকে প্রতিষ্ঠা করে রাজনৈতিক অঙ্গনে অন্য কিছু হাসিলের এধরনের গুপ্ত পরিকল্পনা রয়েছে জামায়াতের। এছাড়া ফাঁকা মাঠ থেকে অন্যরকম ষড়যন্ত্রের ফাঁদ পাতার-ও চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তাদের আশঙ্কা।
জামায়াতের উদ্যোগ
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ‘সুযোগ বন্ধ’ করতে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) প্রস্তাব দিয়েছিল জামায়াত। খবরে দেখা যায় যে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের পদধারী বা সক্রিয় নেতাকর্মীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করার বিধান স্থানীয় সরকারের প্রস্তাবিত নির্বাচনী আচরণ বিধিমালায় যুক্ত করতে হবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের জন্য আলাদা আলাদা আচরণবিধির খসড়া প্রণয়ন প্রসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলো ছাড়াও অংশীজনের মতামত চাওয়া হয়েছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাদের স্থানীয় সরকারের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া অযোগ্য ঘোষণা করার বিধান স্থানীয় সরকারের প্রস্তাবিত নির্বাচনী আচরণ বিধিমালায় যুক্ত করতে প্রস্তাব রাখে।
পরিকল্পনার নেপথ্যে কি কি হতে পারে?
এদিকে জামায়াতের পক্ষ থেকে এই ধরনের পরিকল্পনার পেছনে নানান ধরনের ষড়যন্ত্র কষা হচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। এব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির নেতারা মনে করেন জামায়াত স্থানীয় সরকারেও প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা ও শক্ত অবস্থান প্রমাণ করতে চায়।
কি করে এতো আশা জামায়াতের?
এব্যাপারে কারো কারো মতে, জামায়াতের এই ধরনের খায়েশের পেছনে রহস্য আছে। বিএনপির অনেকে মনে করেন দলটি নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে জুলাই বিপ্লবীদের ইমেজকে পুঁজি করে প্রশাসনিক রাজনৈতিক অনেক সুবিধা বাগিয়ে নিয়েছে। সেই সময়ে প্রশাসনের উচ্চ স্তরের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন স্তরে নিজেদের আদর্শের লোকজনকে সুকৌশলে শক্ত অবস্থানে বসিয়ে নিয়েছে। এক্ষেত্রে বিএনপি এখনো কোনো ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ফ্যাসিবাদি শাসনামলে অনেকের মতে জামায়াতের আদর্শে বিশ্বাসীরা নিজেদের পরিচয় গুপ্ত রেখে ঠিকই চাকরি-বাকরি ব্যবসা-বাণিজ্য কব্জা করে নিয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে ঠিকই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দলটি প্রশাসন-ব্যবসা-বাণিজ্য গণমাধ্যমের প্রতিটি স্তরে নিজেদের অবস্থানকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে ফেলেছে। সেই শক্ত অবস্থানের সুবিধা স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে বাগিয়ে নিতে পারে বলে কারো কারো অভিমত। ইতোমধ্যে গত ২০ জুলাই সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও একটি মতবিনিময়েও জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় গুপ্ত রাজনৈতিক দলের প্রভাবের কথা। তিনি বলেছেন যে তার কাছে বলা হয়েছে যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাস ৬০ শতাংশের ওপরে সেই গুপ্ত বাহিনীর প্রভাব ছিল।’ এখন প্রশ্ন হচ্ছে প্রশাসন গণমাধ্যমে সেই প্রভাব তো এখনো বিদ্যমান। তাই সেই প্রভাব খাটানোর ভরসাতেই কি ইসিতে ওই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
অন্য গুপ্ত পরিকল্পনাও থাকতে পারে
কারো কারো মতে, আওয়ামী লীগ নেতাদের স্থানীয় সরকারের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া ঠেকাতে এই প্রস্তাবের পেছনে আরও গুপ্ত কারণ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের পদধারী বা সক্রিয় নেতাকর্মীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণার বিধানটি স্থানীয় সরকারের প্রস্তাবিত নির্বাচনী আচরণ বিধিমালায় যুক্ত করতে পারলে জামায়াতের গুপ্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়ে যাবে। এতে মাঠে কার্যত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা স্থানীয় সরকারের নির্বাচনেও অংশ নিতে পারবে না। যদিও এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া সম্পূর্ণ নির্দলীয় ও প্রভাবমুক্ত পরিবেশে হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এতে করে তারা আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন প্রার্থী যারা নির্বাচিত হয়ে যেতে পারে এমনদের তাদের মতার্দশের লোক বানিয়ে বট বাহিনী দিয়ে ব্যাপকভাবে প্রচার চালিয়ে নেবে। এভাবেই আ.লীগারদের জামায়াতের টিকিটে প্রার্থী করে সে-ই ছক বাস্তবায়ান করে ফেলবে। এই ধরনের একটি গুপ্ত পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পদধারী বা সক্রিয় নেতাকর্মীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করা গেলে। এতে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের মাঠটি একবারে ফাকা পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে তাদেরকে নিজ দলের সমর্থনে বিজয়ী করে মাঠে স্থানীয় নির্বাচনে জামায়াতের শক্ত অবস্থানের জানান সহজ হয়ে যাবে।
এটা কি অসম্ভব?
কারো কারো মতে, জুলাই বিপ্লবের পরে জামায়াত আওয়ামী লীগ কি নিয়ে আবার কেনো গুপ্ত পরিকল্পনা করতে যাবে? তা কি করে সম্ভব? কেউ কেউ মনে করেন একেবারের অসম্ভব না। কেননা জামায়াতে ইসলামী ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ঐক্যের ইতিহাস এবং নমুনাগুলো বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সমীকরণ ও কৌশল পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল। অতীতে নানা সময় এই দুই দলের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে তাদের ভাষায় সমঝোতা বা কৌশলগত ঐক্য দেখা গেছে। যদিও রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক থেকে জামায়াত ও আওয়ামী লীগ সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর। তারপরেও দেখা গেছে, ১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী একত্রে যুগপৎ আন্দোলন করেছিল। কিন্তু ১৯৮৬ সালের ৭ মে অনুষ্ঠিত তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী পাশাপাশি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগও এরশাদের অধীনে সেই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। এরশাদের সামরিক শাসন ও তাঁর অধীনে নির্বাচনের বিরোধিতা করে বিএনপি এবং তাদের নেতৃত্বাধীন সাতদলীয় জোট ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বর্জন করেছিল। সামরিক সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কারণে সে সময় জামায়াত ও আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক সমালোচনার মুখোমুখি হতে হলেও সে সময়ে তারা উভয়েই রাজনীতিতে একে ‘সহী’ বলে চালিয়ে দিয়েছিল। সে-ই সুদুর অতীত এখনো ভবিষ্যতের অনেক ষড়যন্ত্রের আগাম বার্তা দেয় বলে অনেকে মনে করেন।
সর্বশেষ অবস্থান
তবে জামায়াতের সেই গুপ্ত পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। কেননা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাবে সায় নেই নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। নির্দলীয় নির্বাচন হওয়ায় তাদের পক্ষে এমন আইন করা সম্ভব নয় বলে মনে করছে সংস্থাটি। এব্যাপারে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ গণমাধ্যমে বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে হচ্ছে। ফলে কোনো দলের নেতাদের অংশগ্রহণ করতে না দেওয়ার এখতিয়ার ইসির নেই। স্থানীয় সরকারের যেসব পদে নির্বাচন হবে, সেগুলোতে প্রার্থী হতে যোগ্যতার শর্ত পূরণ করলেই যে কেউ দাঁড়াতে পারবেন। এখানে কে কোন দলের সেটা বিবেচনায় আনবে না ইসি।