কৃত্রিম বন্যার কবলে পড়েছে মহেশখালীর সাড়ে চার লক্ষ মানুষ। নদী পানি পরিবেশের তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন মেগা প্রকল্প নেওয়ায় এই দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে এলকার মানুষের।
ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) উদ্যোগে এক সংবাদ সম্মেলনে কক্সবাজার জেলা শাখার যুগ্ম আহবায়ক এবং জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এইচ এম ফরিদুল আলম শাহীন এসব কথা বলেন। পরে এইচ এম ফরিদুল আলম শাহীন আমেরিকা থেকে প্রকাশিত দেশ পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধির সাথে কথা হয়। এতে তিনি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
মহেশখালী হলো বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত একমাত্র পাহাড়ী দ্বীপ ও একটি উপজেল। কক্সবাজার সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এই দ্বীপটি তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, শুঁটকি, লবণ উৎপাদন এবং মিষ্টি পানের জন্য দেশজুড়ে বিখ্যাত। মহেশখালী উপজেলাটি মূলত মহেশখালী, সোনাদিয়া এবং মাতারবাড়ী-এই তিনটি প্রধান দ্বীপ নিয়ে গঠিত।
চলমান ভয়াবহ বন্যায় মহেশখালীসহ পুরো কক্সবাজার জেলা বিপর্যস্থ হয়ে পড়েছে। টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে প্রায় সাত লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মহেশখালীর মাতারবাড়ী, কালারমারছড়া, ঘোনাপাড়া ও ধলঘাটা এলাকায় বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
সংক্ষেপে কক্সবাজারের বন্যা পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে এইচ এম ফরিদুল আলম শাহীন দেশ পত্রিকাকে বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মাতারবাড়ি - ধলঘাটা কোহেলিয়া নদীর মাঝ বরাবর ভরাট করে উঁচু করে তৈরি করা হয়েছে বিশাল সড়ক। আর কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প, গভীর সমুদ্র বন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল, এলএনজি টার্মিনাল ও নতুন করে তৈরি হচ্ছে শীপ ডকইয়ার্ড শিল্প কারখানা। এর বাইরে বেসরকারি উদ্দ্যক্তারা শত শত একর জমি ক্রয় করে নির্মাণ করছেন বাণিজ্যিক টাওয়ার ও স্থাপনা। এসব স্থাপনা বা মেগা প্রকল্পসমূহ জনবসতির স্তর থেকে ২০ থেকে ৩০ ফুট উঁচু করা হয়েছে বা করা হচ্ছে। তা হলে জনবসতি স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ থেকে শুরু করে সবই গর্তের ভেতরে ঢুকে আছে। যেকারণে একটু বৃষ্টি বা সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে ওই এলাকার লোকজন এমনিতেই পানিতে ঢুবে থাকবে বছরের অধিকাংশ সময়। আর মূল মহেশখালীর অংশে কোন দিন বন্যা বা সাইক্লোনে ঢুবেনি। কারণ পশ্চিমে ছিল গভীর কোহেলিয়া নদী, বঙ্গোপসাগর দক্ষিণে সাগর উত্তরে ও পূর্বে মহেশখালী চ্যানেল দ্বীপের মাঝখানে উত্তর দক্ষিণ ২৭ কিঃ মিঃ লম্বা মহেশখালী পাহাড়। তাই বৃষ্টিশেষে এক দু' ঘন্টার মধ্যে পানি নেমে যেত নদীতে অথবা বঙ্গোপসাগরে। পাহাড়ের দু’দিকে ছিল অসংখ্য খাল বা ছড়া যে কারণে সেইসব খালের বেশিরভাগ অংশ দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে। দ্বীপের চারদিকে যে সব ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট ছিল সবই আজ বিরান ভূমিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে সোনাদিয়া, ঘটিভাঙ্গা, তাজিয়াকাটা বড়দিয়া আমাবশ্যাখালী বগাচতর, ধলঘাটা, মাতারবাড়ি, কালারমারছড়া, ঝাপুয়া, হরিয়ার দিয়া, পার্শ্ববর্তী বদরখালী, চরণদ্বীপ ও শাপলাপুর অঞ্চলের বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী ১৮ হাজার একর জমির প্যারাবন কেটে চিংড়ি ঘের করে বাঁধ দেয়ায় এ ধরনের কৃত্রিম বন্যার কবলে পড়েছে মহেশখালীর সাড়ে চার লক্ষ মানুষ।
এইচ এম ফরিদুল আলম শাহীন আরও বলেন, কক্সবাজারে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার পেছনে অতিভারী বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি ঢল, অব্যাহত পাহাড়কাটা, বালি উত্তোলন এবং মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে উপচে পড়াকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর সঙ্গে সমুদ্রে অস্বাভাবিক জোয়ার, অপরিকল্পিত নগরায়ন, নির্বিচারে পাহাড় ও গাছ কাটা, নদী-খাল দখল ও ভরাটের কারণে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যেতে না পেরে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এ ছাড়া প্যারাবন কেটে ব্যাপক হারে চিংড়ি ঘের নির্মাণ, অপরিকল্পিত নগরায়ন, রেললাইন নির্মাণ করা হয়েছে অথচ পর্যাপ্ত ব্রিজ, কালভার্ট নির্মিত হয়নি ফলে পানি চলাচলে বাঁধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। অন্যদিকে সুইসগেট বন্ধ রেখে ঘেরভিত্তিক মাছ চাষ করায় পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে বন্যার পানি দীর্ঘসময় আটকে থেকে জনভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।
এদিকে সাম্প্রতিক বন্যা কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের পাশাপাশি অপরিকল্পিত উন্নয়ন, নদী-খাল-জলাশয় দখল, পাহাড় কাটা এবং প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্মিলিত ফল। তাই কেবল ত্রাণ নয়, বন্যার মূল কারণ নিরসনে বিজ্ঞানভিত্তিক, পরিবেশসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)। শনিবার (১৮ জুলাই) জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে অনুষ্ঠিত ”সাম্প্রতিক বন্যার তথ্যভিত্তিক পর্যালোচনা” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ আহ্বান জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন ধরার সহ-আহ্বায়ক এম. এস. সিদ্দিকী। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ধরা’র সদস্য সচিব শরীফ জামিল এবং সঞ্চালনা করেন রিভার বাংলা এর সম্পাদক ও ধরা’র সদস্য ফয়সাল আহমেদ।