এটা অনেকটাই চির সত্য তুল্য যে, বাংলাদেশে জনগণ কর্তৃক ম্যান্ডেট নিয়ে আসা সরকারের কোন উন্নয়ন দর্শন বিদ্যমান আমলাতান্ত্রিক পরিবেশে জনকল্যাণমূলক সাফল্যে পরিণত হবে না। শেখ হাসিনা নেতৃত্বের আওয়ামী লীগ সরকার বা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের বিএনপি জোট সরকার নিজেদের নীতি আদর্শ অনুযায়ী দেশের উন্নয়নে অনেক কাজ করলেও এগুলো জনকল্যাণে খুব একটা বড় ভূমিকা রাখছে, বলা যায় না। কারণ হিসাবে অবশ্যই আমলাদের একছত্র নিয়ন্ত্রণ আর উদ্দেশ্যমূলক ভ্রান্ত পরামর্শ আর অবাধ দুর্নীতিকে দায় নিতে হবে।
দুর্নীতির কারণে সরকার পতন হয়েছে, রাজনীতিবিদরা জেলে গেছেন। ব্যাবসায়ীরা দণ্ডিত হয়েছেন। কিন্তু আমলাদের খুব একটা কিছু হয়েছে বলা যাবে না। এই আমলাতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার ছাড়া কোন সরকার টেকসই উন্নয়ন করতে পারবে না, এটা আমার সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতায় বলছি। আশা করি আমার সঙ্গে কেউ দ্বিমত প্রকাশও করবেন না। বর্তমান সরকারের দর্শন -প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়ার “আমার একটা পরিকল্পনা আছে” বাস্তবায়িত হবে না। বা বাস্তবয়ন করতে দেবে না। তিনি সদ্য জোট সঙ্গীদের সঙ্গে আলোচনায় অকপটে বলেছেন, তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ধীর গতির কথা। অবশ্য উনি বলেছেন সরকারে লুকিয়ে থাকা গুপ্ত ফ্যাসিস্ট দোসরদের অন্তর্ঘাতমূলক কাজের কথা।
বাংলাদেশের মূল সমস্যা কৃষি, খাদ্য, শিল্প, বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থ, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, পরিবেশ কোন খাতেই যোগ্য দক্ষ পেশাদারদের স্বাধীন মুক্ত পরিবেশে কাজ করার সুযোগ নেই। সর্বত্র অযোগ্য অথর্ব আমলারা সিন্দাবাদের বুড়োর মত ঘাড়ে চেপে বসে আছে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত আমলারা পেশাদারদের নিয়ন্ত্রণ করায় সেক্টরসমূহ মেধাহীন হয়ে পড়ছে। সেই শুণ্য স্থানে দুর্নীতিপরায়ণ আমলাদের সঙ্গে দুর্বৃত্তায়িত ব্যাবসায়ীরা সিন্ডিকেট তৈরি করে সমাজকে দুর্নীতির অভয় অরণ্যে পরিণত করেছে। ফলে উন্নয়নকার্যক্রম সময় অনুযায়ী নির্ধারিত ব্যায়ে সম্পাদিত হচ্ছে না। জনবান্ধব প্রকল্পগুলো একসময় গলার কাটায় পরিণত হচ্ছে। দেশকে দুর্নীতির করালগ্রাস থেকে মুক্ত করতে হলে শুরুতেই আমলাতান্ত্রিক প্রশাসন ব্যাবস্থায় ব্যাপক সংস্কার করতে হবে। আর সেটির সূচনা করতে হবে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকেই। সর্বত্র মেধাকে প্রাধান্য দিয়ে সঠিক পেশাদারদের সঠিক স্থানে পদায়ন করতে হবে। চিহ্নিত করে দুর্নীতিপরায়ণ আমলাদের চিহ্নিত করে বিদায় অথবা অকার্যকর করতে হবে- ‘দুষ্ট গরুর চেয়ে শুন্য গোয়াল ভালো’ নীতি অবলম্বনে।
বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত দক্ষ জনবলকে সঠিক প্রধান্য দিয়ে স্বাধীন ভাবে কাজ করার সুযোগ না দিলে কোন সরকার জনকল্যাণমূলক কাজ করতে পারবে না এটা চীর সত্য বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। এটা বাস্তব যে গত কয়েক দশক ধরে দেশে কাজের পরিবেশ না থাকায়, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারনে দেশ থেকে মেধার ব্যাপক পাচার হয়ে গেছে। দেশ থেকে প্রচুর সংখ্যায় প্রকৌশীলী, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, কৃষিবিদ, শিক্ষাবিদ প্রবাসে চলে গেছে। এবং স্থায়ী ভাবেই চলে গেছেন তারা।
ফলে তাদের আহ্বান জানাতে হবে দেশে ফেরার। বাংলাদেশের মায়া, মা ও মাটির মায়া প্রবাসে থাকা ওইসকল দক্ষ জনবলের অবশ্যই রয়েছে। বহু সুশিক্ষায় শিক্তিত প্রবাসীরা বলেও থাকেন, দেশের উন্নয়নে তাদের মেধা, শ্রম দিতে পারলে তারা স্বার্থক হবেন। কারণ তারা দেশকে ভালবাসেন। দেশের মাটিকে ভালবাসেন। ফলে এ সেক্টরে উন্নত পরিবেশ সৃষ্টি করে রিভার্স মাইগ্রেশন করতে হবে। এতে অনেকেই আগ্রহী হয়ে দেশে ফিরবেন। নিঃস্বার্থ কাজগুলো করে দেবেন দেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণে। নির্মোহভাবে মেধার মূল্যায়ন করতে হবে। রাজনৈাতিভাবে বিভাজন করা হলে বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতি, রোগাক্রান্ত জ্বালানি বিদ্যুৎ সঙ্কট, দুর্দশা গ্রস্ত সামাজিক অবস্থা থেকে পরিত্রাণ মিলবে না।
প্রশাসনিক সংস্কার বিষয়ে সরকারকে আপোষহীন হতে হবে, দেশের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সর্বত্র জবাবদিহির পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে দিয়ে মুক্তি মিলবে না। তাহলে কোটি কোটি বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্নের দেশ বাংলাদেশের গরীব দুঃখী, সুবিধা বঞ্চিত, অনাহারি, অর্ধানহারি, অসচ্ছল মানুষেরা সেই সুফল পাবেন। এবং যে স্বপ্ন নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিল বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ, রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে, সম্ভ্রম হারিয়ে, স্বজন হারিয়ে, তাদের স্বপ্নের দেশ প্রতিষ্ঠিত হবে।