গ্রিনকার্ড মূল্যায়নে মেডিকেইড, ফুড স্ট্যাম্প ও আবাসন সহায়তা বিবেচনায় নেবে ট্রাম্প প্রশাসন


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 22-07-2026

গ্রিনকার্ড মূল্যায়নে মেডিকেইড, ফুড স্ট্যাম্প ও আবাসন সহায়তা বিবেচনায় নেবে ট্রাম্প প্রশাসন

যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা গ্রিনকার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়ায় আবারও বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন আনছে ট্রাম্প প্রশাসন। ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) ২০২২ সালে বাইডেন প্রশাসনের জারি করা পাবলিক চার্জ-সংক্রান্ত বিধিমালা বাতিল করে নতুন একটি চূড়ান্ত বিধি জারি করেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (ইউএসসিআইএস)-এর কর্মকর্তারা গ্রিনকার্ড, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ কিংবা নির্দিষ্ট কিছু অভিবাসন সুবিধার আবেদন মূল্যায়নের সময় আবেদনকারীর বয়স, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আয়, সম্পদ, কর্মসংস্থান ও আর্থিক সক্ষমতার পাশাপাশি অতীতে মেডিকেইড, এসএনএপি (ফুড স্ট্যাম্প), সরকারি আবাসন সহায়তা বা অন্যান্য আয় ও সম্পদ যাচাইভিত্তিক সরকারি সুবিধা গ্রহণের ইতিহাসও বিবেচনায় নিতে পারবেন।

ফেডারেল রেজিস্টারে নিয়মটি প্রকাশের পর ৬০ দিন পর্যন্ত এটি কার্যকর হবে না। ইউএসসিআইএস জানিয়েছে, এ সময়ের মধ্যে নতুন আবেদনপত্র ফর্ম আই-৪৮৫, সংশ্লিষ্ট নীতিমালা, কর্মকর্তাদের নির্দেশিকা এবং অভ্যন্তরীণ কার্যপ্রণালি হালনাগাদ করা হবে। ফলে নতুন পাবলিক চার্জ মূল্যায়ন কাঠামো সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইউএসসিআইএসের পরিচালক জোসেফ বি এডলো এক বিবৃতিতে বলেন, ফেডারেল সরকার আবারও আত্মনির্ভরশীলতার নীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছে এবং করদাতাদের অর্থের ওপর নির্ভরশীলতাকে উৎসাহিত করে এমন নীতির অবসান ঘটাচ্ছে। তার ভাষায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রে আসা অভিবাসীদের নিজেদের আর্থিকভাবে টিকে থাকার সক্ষমতা থাকা উচিতÑএ মৌলিক নীতিই পুনরুদ্ধার করা হচ্ছে।

বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকলে তাকে পাবলিক চার্জ হিসেবে বিবেচনা করে ভিসা, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ বা গ্রিনকার্ডের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে। ২০২২ সালে বাইডেন প্রশাসন এ মূল্যায়নকে মূলত নগদ কল্যাণ ভাতা এবং সরকার-অর্থায়িত দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক পরিচরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিল। নতুন বিধি সেই সীমাবদ্ধতা তুলে দিয়ে কর্মকর্তাদের আরো বিস্তৃত বিবেচনার ক্ষমতা ফিরিয়ে দিচ্ছে। তবে ডিএইচএস স্পষ্ট করেছে, মেডিকেইড, এসএনএপি বা অন্য কোনো সরকারি সুবিধা গ্রহণের ঘটনা একাই কোনো আবেদন প্রত্যাখ্যানের কারণ হবে না; বরং প্রতিটি আবেদন আবেদনকারীর সামগ্রিক পরিস্থিতির ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে।

নতুন বিধি অনুযায়ী কর্মকর্তারা আবেদনকারীর বয়স, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য, পারিবারিক অবস্থা, আয়, সম্পদ, আর্থিক সক্ষমতা, শিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা, কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা, অ্যাফিডেভিট অব সাপোর্ট (ফর্ম আই-৮৬৪) এবং অতীতে সরকারি সুবিধা গ্রহণের ইতিহাসসহ সব প্রাসঙ্গিক তথ্য একত্রে বিবেচনা করবেন। ইউএসসিআইএস আরো জানিয়েছে, পরিবারের অন্য সদস্য সরকারি সুবিধা গ্রহণ করলে সেটিকে সরাসরি আবেদনকারীর সুবিধা হিসেবে গণ্য করা হবে না। তবে যদি দেখা যায় আবেদনকারী নিজে পরিবারের ব্যয় বহনে সক্ষম নন অথবা ওই সুবিধা পরোক্ষভাবে আবেদনকারীকেই সহায়তা করছে, তাহলে সেটি আবেদনকারীর সামগ্রিক আর্থিক অবস্থা মূল্যায়নের অংশ হতে পারে।

ডিএইচএসের ২০২৫ সালের নিয়ন্ত্রক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে গ্রিনকার্ডের জন্য আবেদনকারী প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার স্ট্যাটাস অ্যাডজাস্টমেন্ট আবেদনকারী এ মূল্যায়নের আওতায় পড়তে পারেন। এ হিসাবের মধ্যে বিদেশে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে অভিবাসী ভিসার আবেদনকারী কিংবা সীমান্তে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আবেদনকারীরা অন্তর্ভুক্ত নন। ফলে বাস্তবে নতুন নীতির প্রভাব আরো বিস্তৃত হতে পারে।

তবে আইন অনুযায়ী সব অভিবাসী এ পরীক্ষার আওতায় পড়বেন না। শরণার্থী, আশ্রয়প্রার্থী, স্পেশাল ইমিগ্র‍্যান্ট জুভেনাইল, মানবপাচারের শিকার টি ভিসা আবেদনকারী, অপরাধের শিকার ইউ ভিসা আবেদনকারী, ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন অ্যাক্ট (ভাওয়া)-এর আওতায় স্বপিটিশনকারী এবং কংগ্রেসের মাধ্যমে অব্যাহতি পাওয়া অন্যান্য মানবিক শ্রেণির আবেদনকারীরা আগের মতোই পাবলিক চার্জ বিধান থেকে অব্যাহতি পাবেন।

ডিএইচএস স্বীকার করেছে যে নতুন নীতির কারণে একটি বড় ধরনের ভীতিকর প্রভাব সৃষ্টি হতে পারে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ভবিষ্যতে গ্রিনকার্ডের আবেদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার মানুষ মেডিকেইড, এসএনএপি বা আবাসন সহায়তার মতো সরকারি কর্মসূচি থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করতে পারেন অথবা নতুন করে নিবন্ধন নাও করতে পারেন, যদিও তারা আইনগতভাবে এসব সুবিধা পাওয়ার যোগ্য। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবে আবেদন প্রত্যাখ্যানের সংখ্যা কম হলেও মানুষের আচরণে এ পরিবর্তনই নতুন নীতির সবচেয়ে বড় প্রভাব হতে পারে। অনেক পরিবার নিজেদের বা যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া সন্তানদের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য সহায়তা কিংবা আবাসন সহায়তা গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে পারেন, যার প্রভাব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, অঙ্গরাজ্যের সামাজিক সেবা কর্মসূচি এবং নিম্ন আয়ের অভিবাসী পরিবারগুলোর ওপর পড়তে পারে।

পাবলিক চার্জ নীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক চলছে। ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত অভিবাসন কর্মকর্তারা মূলত নগদ কল্যাণ ভাতা এবং সরকার-অর্থায়িত দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক পরিচরাকেই পাবলিক চার্জ মূল্যায়নের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতেন। ২০১৯ সালে প্রথম ট্রাম্প প্রশাসন নিয়ম পরিবর্তন করে মেডিকেইড, এসএনএপি এবং কিছু আবাসন সহায়তাকেও বিবেচনার আওতায় আনে। সে নিয়মের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বিচার চলাকালেই নিয়মটি কার্যকর রাখার অনুমতি দেয় এবং ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে তা বাস্তবায়ন শুরু হয়। পরে বাইডেন প্রশাসন আদালতে ওই নিয়মের পক্ষে অবস্থান না নিয়ে ২০২২ সালে নতুন বিধিমালা জারি করে, যা মূলত ১৯৯৯ সালের নীতিতে ফিরে যায়।

তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এতো বিতর্কের পরও বাস্তবে পাবলিক চার্জের ভিত্তিতে গ্রিনকার্ড প্রত্যাখ্যানের সংখ্যা অত্যন্ত কম। ডিএইচএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ অর্থবছরের মধ্যে প্রতিবছর মাত্র ৪১ থেকে ৯৫টি স্ট্যাটাস অ্যাডজাস্টমেন্ট আবেদন পাবলিক চার্জের কারণে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এমনকি ২০১৯ সালের ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর নিয়ম কার্যকর থাকাকালেও পূর্ণাঙ্গ পাবলিক চার্জ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে মাত্র পাঁচটি আবেদন প্রত্যাখ্যান বা প্রত্যাখ্যানের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল; পরে সেগুলোও পুনরায় খোলা বা বাতিল করা হয়।

ডিএইচএসের নিয়ন্ত্রক প্রভাব বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নতুন নীতির ফলে ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্য সরকার মিলিয়ে বছরে প্রায় ১৩ দশমিক শূন্য ৫ বিলিয়ন ডলার সরকারি ব্যয় কমতে পারে। ১০ বছরে এই সাশ্রয়ের বর্তমান মূল্য প্রায় ৯১ দশমিক ৬২ বিলিয়ন থেকে ১১১ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে হতে পারে। তবে সংস্থাটি একই সঙ্গে স্বীকার করেছে, এর ফলে মেডিকেইডনির্ভর হাসপাতাল, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, অলাভজনক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, এসএনএপি সংশ্লিষ্ট মুদি ব্যবসা, কৃষি খাত এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য পরিচালিত বিভিন্ন কর্মসূচি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ডিএইচএস আরো স্পষ্ট করেছে, এ চূড়ান্ত বিধিমালা কোনো ব্যক্তির মেডিকেইড, এসএনএপি, এসএসআই বা অন্য কোনো সরকারি সহায়তা কর্মসূচির জন্য যোগ্যতার নিয়ম পরিবর্তন করছে না। অর্থাৎ কে এসব সুবিধা পাওয়ার যোগ্য, সে আইন অপরিবর্তিত থাকছে। পরিবর্তন এসেছে শুধু ইউএসসিআইএস কর্মকর্তারা গ্রিনকার্ড বা অন্যান্য অভিবাসন আবেদন মূল্যায়নের সময় আবেদনকারীর আর্থিক স্বনির্ভরতা এবং ভবিষ্যতে পাবলিক চার্জ হওয়ার সম্ভাবনা কীভাবে বিবেচনা করবেন, সে প্রক্রিয়ায়।

অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন বিধি কার্যকর হলে গ্রিনকার্ড আবেদনকারীদের আয়ের উৎস, কর রিটার্ন, ব্যাংক হিসাব, সম্পদের তথ্য, কর্মসংস্থানের ইতিহাস, পারিবারিক আর্থিক সহায়তা এবং অন্যান্য আর্থিক নথিপত্র আগের তুলনায় আরো গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হবে। তাই আবেদন জমা দেওয়ার আগে সব নথিপত্র যথাযথভাবে প্রস্তুত রাখা, সঠিক তথ্য প্রদান এবং প্রয়োজনে অভিজ্ঞ অভিবাসন আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া আগের চেয়ে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)