ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ আয়োজনের ফলে নিউইয়র্ক স্টেটে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জনসম্পৃক্ততায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন গভর্নর ক্যাথি হোচুল। স্টেটের প্রাথমিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত প্রথম পাঁচটি ম্যাচকে ঘিরে প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি হয়েছে। একই সময়ে স্টেট ও স্থানীয় সরকার প্রায় ২২৮ মিলিয়ন ডলারের কর রাজস্ব অর্জন করেছে।
গভর্নর ক্যাথি হোচুল বলেন, বিশ্বকাপ আয়োজনের মূল লক্ষ্য ছিল এর সুফল শুধু স্টেডিয়াম বা নিউইয়র্ক সিটি এলাকায় সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো নিউইয়র্ক স্টেটে ছড়িয়ে দেওয়া। এ লক্ষ্যে স্টেট সরকার একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে, যার মধ্যে ছিল বড় আকারের ফ্যান অনুষ্ঠান, আঞ্চলিক অনুদান, পর্যটন প্রচারণা, সহজলভ্য পরিবহন ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন কমিউনিটি কার্যক্রম। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা দর্শকদের কারণে নিউইয়র্কের হোটেল, রেস্তোরাঁ, বার ও স্থানীয় ব্যবসাগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হয়েছে।
নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের আটটি ম্যাচই ছিল দর্শকে পরিপূর্ণ। এসব ম্যাচে মোট ৫ লাখ ৬০ হাজারের বেশি দর্শক উপস্থিত হন। পর্যটন বিশ্লেষণ সংস্থা ট্যুরিজম ইকোনমিক্স-এর হিসাব অনুযায়ী, জুন মাসে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত প্রথম পাঁচটি গ্রুপ ম্যাচে দর্শনার্থীদের সরাসরি ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, যা মোট অর্থনৈতিক প্রভাবে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে। বাকি ম্যাচগুলোর হিসাব যুক্ত হলে মোট অর্থনৈতিক সুবিধা আরো বাড়বে বলে আশা করছে স্টেট কর্তৃপক্ষ।
বিশ্বকাপ চলাকালে নিউইয়র্ক ও নিউ জার্সিতে আয়োজিত বিভিন্ন অফিসিয়াল ফ্যান ইভেন্টে এখন পর্যন্ত ১০ লাখেরও বেশি দর্শনার্থী অংশ নিয়েছেন। পাশাপাশি মে মাসে চালু হওয়া ওয়েলকাম ওয়ার্ল্ড রিওয়ার্ডস প্রোগ্রামের মাধ্যমে ১ হাজারের বেশি স্থানীয় ব্যবসা, রেস্তোরাঁ, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটি আয়োজনে মানুষের অংশগ্রহণ বেড়েছে। এই উদ্যোগের ফলে ছোট ব্যবসাগুলোতে প্রায় ১০ হাজার নতুন গ্রাহক উপস্থিতি তৈরি হয়েছে।
দর্শকদের যাতায়াত সহজ করতে নিউইয়র্ক স্টেটের সহায়তায় মেটলাইফ স্টেডিয়ামের অফিসিয়াল শাটল বাসের ভাড়া কমিয়ে দেওয়া হয়। আগে যেখানে রাউন্ড ট্রিপ ভাড়া ছিল ৮০ ডলার, তা কমিয়ে ২০ ডলার করা হয়। এর ফলে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার শাটল বাস টিকিট বিক্রি হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানায়, গড়ে ৯৭ শতাংশ দর্শক ম্যাচ শুরুর আগেই স্টেডিয়ামে প্রবেশ করতে পেরেছেন। বাসগুলো নির্ধারিত রুটে দ্রুত চলায় অনেক ক্ষেত্রে লিংকন টানেল পর্যন্ত পৌঁছাতে ১০ মিনিটেরও কম সময় লেগেছে। বিশ্বকাপের আট ম্যাচের দিনগুলোতে নিউইয়র্কের মিডটাউন এলাকায় যাতায়াতের সময় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ২৩ শতাংশ পর্যন্ত কম ছিল।
বিশ্বকাপের কারণে হোটেল খাতেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ৮ জুন থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত নিউইয়র্ক মহানগর এলাকায় হোটেল আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে। নিউইয়র্ক সিটির হোটেলগুলো প্রায় ১ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার রুম আয় করেছে, যা গত বছরের তুলনায় ২০ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। মিড-হাডসন অঞ্চলের হোটেল আয় হয়েছে প্রায় ৮৬ মিলিয়ন ডলার, যা বেড়েছে ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ। লং আইল্যান্ডের হোটেলগুলো আয় করেছে প্রায় ১১৭ মিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি।
বিশ্বকাপের উৎসবকে পুরো নিউইয়র্ক স্টেটে ছড়িয়ে দিতে সরকার ৫ লাখ ডলারের কমিউনিটি বিশ্বকাপ অনুদান কর্মসূচি চালু করে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে আপস্টেট নিউইয়র্কের সাতটি অঞ্চলের ১৩টি প্রকল্প অনুদান পেয়েছে। এর মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে বিশ্বকাপভিত্তিক অনুষ্ঠান আয়োজন, পর্যটন বৃদ্ধি এবং ছোট ব্যবসাকে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্টেট পরিচালিত ফ্যান ফেস্ট অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে স্টনি ব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজন ছিল অন্যতম বড়। ১২ জুনের এ অনুষ্ঠানে প্রায় ৬ হাজার মানুষ অংশ নেন। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও প্যারাগুয়ের ম্যাচ দেখার জন্য প্রায় ৫ হাজার দর্শক উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সরাসরি ম্যাচ সম্প্রচার, সংগীত পরিবেশনা, পরিবারভিত্তিক বিনোদন এলাকা, ফুটবল কার্যক্রম, খাবারের স্টল এবং সরকারি প্রদর্শনী ছিল। পাশাপাশি প্রতিবন্ধীবান্ধব সুবিধা, বিশেষ সহায়তা ব্যবস্থা এবং নিউইয়র্কের বিশেষ অলিম্পিক কর্মসূচির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়।
১৯ জুন ইউবিএস এরিনায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ওয়াচ পার্টিতে দুই ম্যাচ মিলিয়ে ১৩ হাজারের বেশি দর্শক অংশ নেন। যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচে প্রায় ৩ হাজার এবং হাইতি ও ব্রাজিলের ম্যাচে ১০ হাজারের বেশি মানুষ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি খেলাধুলা, বিনোদন এবং স্থানীয় ব্যবসার সমন্বয়ে একটি বড় সামাজিক আয়োজনে পরিণত হয়।ওয়েস্টচেস্টার কাউন্টির কেনসিকো ড্যাম প্লাজার বিনামূল্যের ওয়াচ পার্টিতে সাড়ে ৫ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নেন। সেখানে ২৫টির বেশি অংশীদার প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় ফুটবল দল, সরকারি সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অংশগ্রহণ করে।
বিশ্বকাপ ফাইনাল উপলক্ষে সেন্ট্রাল পার্কে আয়োজিত বিনামূল্যের অনুষ্ঠানে ৩০ হাজারের বেশি ভক্ত উপস্থিত হন। এ আয়োজনে এম্পায়ার স্টেট ডেভেলপমেন্ট থেকে ৯ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার এবং নিউইয়র্ক সিটি থেকে ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে সরাসরি বিনোদন, স্থানীয় খাবারের দোকান এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ছিল।
বিশ্বকাপ শেষ হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ধরে রাখতে নিউইয়র্ক স্টেট এনওয়াই কিকস নামে একটি বিশ্বকাপ উত্তরাধিকার বিনিয়োগ তহবিল চালু করেছে। এর মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় ফুটবল অবকাঠামো উন্নয়নে ৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হবে। পাশাপাশি তরুণ খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম, পোশাক, ফুটবল এবং কোচিং সুবিধার জন্য আরো ১ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে।
স্টেট কর্মকর্তাদের মতে, ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ শুধু একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি নিউইয়র্কের পর্যটন, স্থানীয় ব্যবসা, কমিউনিটি উন্নয়ন এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে কাজ করবে।