ইতিহাসের দ্বারপ্রান্তে আবদুল এল-সায়েদ


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 22-07-2026

ইতিহাসের দ্বারপ্রান্তে আবদুল এল-সায়েদ

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সম্ভাবনা তৈরি করেছেন চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ডেমোক্র্যাট নেতা ডা. আবদুল এল-সায়েদ। মিশিগান থেকে মার্কিন সিনেট নির্বাচনে জয়ী হলে তিনি হবেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম নির্বাচিত মুসলিম সিনেটর। ফলে তার প্রার্থিতা শুধু একটি নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতাই নয়, বরং দেশটির রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে একটি সম্ভাব্য ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমান সিনেটর গ্যারি পিটার্স পুনর্নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর মিশিগানের সিনেট আসনটি উন্মুক্ত হয়ে যায়। ডেমোক্র্যাট প্রাইমারিতে আবদুল এল-সায়েদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক কংগ্রেসওম্যান হ্যালি স্টিভেন্স। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ডেমোক্র্যাট দলের প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থী রাজনীতির মধ্যে শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

রাজনীতিতে আসার আগে আবদুল এল-সায়েদ জনস্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তিনি একজন চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য গবেষক। ডেট্রয়েট স্বাস্থ্য বিভাগের নির্বাহী পরিচালক এবং পরে ওয়েইন কাউন্টি স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাস্থ্যসেবা বৈষম্য কমানো, নিম্নআয়ের মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে তার কাজ তাকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি এনে দেয়। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোকে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরছেন। তার প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, ওষুধের দাম কমানো, আবাসন সংকট মোকাবিলা, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি বৃদ্ধি এবং করপোরেট অর্থের রাজনৈতিক প্রভাব সীমিত করা। তার ভাষায়, সরকারের নীতি এমন হওয়া উচিত যা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনকে সহজ করে।

এল-সায়েদ নিজেকে তৃণমূলের প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরেছেন। তরুণ ভোটার, প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট, আরব-আমেরিকান এবং অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে তিনি শক্তিশালী সমর্থন গড়ে তুলেছেন। বিশেষ করে ডিয়ারবর্নে বসবাসকারী বৃহৎ আরব-আমেরিকান জনগোষ্ঠী এবং হ্যামট্রাম্যাকসহ আশপাশের এলাকায় বাংলাদেশি-আমেরিকান ভোটারদের একটি অংশ তার প্রচারণায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। গাজা যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে তার স্পষ্ট অবস্থানও তাকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। তিনি ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকটে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এ কারণে তিনি প্রগতিশীল ভোটারদের সমর্থন অর্জন করলেও বিরোধীদের সমালোচনারও মুখে পড়েছেন।

আবদুল এল-সায়েদের প্রার্থিতা জাতীয় পর্যায়ের প্রগতিশীল নেতাদের সমর্থন পেয়েছে। সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন, কংগ্রেসওম্যান আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ এবং কংগ্রেসওম্যান রাশেদা তালিব প্রকাশ্যে তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। অন্যদিকে হ্যালি স্টিভেন্স দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, শক্তিশালী দলীয় সংগঠন এবং উল্লেখযোগ্য নির্বাচনী তহবিল নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ফলে ডেমোক্র্যাট প্রাইমারি এখন অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

জরিপগুলোও সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। মিচেল রিসার্চ অ্যান্ড কমিউনিকেশনসের এক জরিপে আবদুল এল-সায়েদ ২৮ শতাংশ সমর্থন নিয়ে এগিয়ে ছিলেন, যেখানে হ্যালি স্টিভেন্সের সমর্থন ছিল ১৮ শতাংশ এবং ম্যালরি ম্যাকমরোর ১৭ শতাংশ। তবে পরবর্তী সময়ে গ্লেনগ্যারিফ গ্রুপের জরিপে স্টিভেন্স প্রায় ৪৬ শতাংশ এবং এল-সায়েদ প্রায় ৪৩ শতাংশ সমর্থন পান। এতে বোঝা যাচ্ছে, ভোটারদের মনোভাব এখনো পরিবর্তনশীল এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নির্বাচনের ফল অনিশ্চিত থাকতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এল-সায়েদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তার সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসা। তরুণ ও প্রগতিশীল ভোটারদের পাশাপাশি নিয়মিত ভোটারদের আস্থা অর্জনই তার বিজয়ের মূল চাবিকাঠি হতে পারে। অন্যদিকে স্টিভেন্সের পক্ষে রয়েছে প্রতিষ্ঠিত দলীয় কাঠামো এবং অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে মুসলিম সদস্য থাকলেও মার্কিন সিনেটে এখনো কোনো মুসলিম নির্বাচিত হননি। সে বাস্তবতায় আবদুল এল-সায়েদের এ প্রচারণা শুধু একটি সিনেট নির্বাচন নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রতিনিধিত্বের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আগামী নির্বাচনে মিশিগানের ভোটাররা যে সিদ্ধান্তই নিন না কেন, আবদুল এল-সায়েদের প্রার্থিতা ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনীতিতে মুসলিম, আরব-আমেরিকান এবং অভিবাসী সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ ও প্রভাব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরো শক্তিশালী হয়ে উঠছে।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)