যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া স্টেটের ফিলাডেলফিয়ায় নর্থইস্ট ফিলাডেলফিয়া ইসলামিক সেন্টার-এ অগ্নিবোমা নিক্ষেপের ঘটনায় ৬০ বছর বয়সী ভিনসেন্ট ল্যাংকে গ্রেফতার করেছে এফবিআই। ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (ডিওজে) জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃত ভিনসেন্ট ল্যাংয়ের বিরুদ্ধে ফেডারেল আদালতে অগ্নিসংযোগের গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার ন্যূনতম পাঁচ বছর এবং সর্বোচ্চ ২০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। ফেডারেল প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, গত ৫ জুলাই ভোরে ফিলাডেলফিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের টাইসন অ্যাভিনিউয়ের ১৪০০ ব্লকে অবস্থিত নর্থইস্ট ফিলাডেলফিয়া ইসলামিক সেন্টারে ল্যাং একটি নিজস্বভাবে তৈরি অগ্নিসংযোগকারী ডিভাইসে আগুন লাগিয়ে সেটি মসজিদের প্রবেশপথে ছুড়ে মারেন। এতে মসজিদের সামনের আবদ্ধ বারান্দা এলাকায় আগুন ধরে যায়।
ফিলাডেলফিয়া পুলিশ ও দমকল বিভাগ রাত প্রায় ২টা ১১ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছে দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুন মূল ভবনে ছড়িয়ে পড়ার আগেই তা নিভিয়ে ফেলা সম্ভব হয়। ঘটনার সময় মসজিদে কেউ উপস্থিত না থাকায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। পরে তদন্ত শেষে ফিলাডেলফিয়া ফায়ার মার্শাল অফিস ঘটনাটিকে ইচ্ছাকৃত অগ্নিসংযোগ হিসেবে চিহ্নিত করে।
তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে উঠে আসে মসজিদের নিরাপত্তা ক্যামেরার ভিডিও। ভিডিওতে দেখা যায়, মুখোশ পরা এক ব্যক্তি একটি ব্যাগের ভেতরে থাকা বস্তুতে আগুন জ্বালিয়ে সেটি মসজিদের প্রবেশপথে ছুড়ে দিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশনস ফিলাডেলফিয়া সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করার উদ্দেশ্যে ওই ভিডিও প্রকাশ করে। অভিযুক্তকে শনাক্ত করতে শুরুতে কেয়ার ফিলাডেলফিয়া ২ হাজার ৫০০ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করে। পরে এক আন্তঃধর্মীয় সংহতি সমাবেশে ফিলাডেলফিয়া সিটি কমিশনার্স বোর্ডের চেয়ারম্যান ওমর সাবির আরো ২ হাজার ৫০০ ডলার যোগ করলে মোট পুরস্কারের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ হাজার ডলার।
গ্রেফতারের পর ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস জানায়, ভিনসেন্ট ল্যাংয়ের বিরুদ্ধে আন্তঃরাজ্য বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ভবনে আগুন লাগিয়ে ক্ষতিসাধনের ফেডারেল অভিযোগ আনা হয়েছে। বিচার বিভাগ স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, অভিযোগ গঠন মানেই দোষী সাব্যস্ত হওয়া নয়; আদালতে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি আইনত নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হবেন।
মামলাটির তদন্তে অ্যালকোহল, টোব্যাকো, ফায়ারআর্মস অ্যান্ড এক্সপ্লোসিভস ব্যুরোর (এটিএফ) অগ্নিসংযোগ ও বিস্ফোরক টাস্কফোর্স, ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই ), পেনসিলভানিয়া অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়, ফিলাডেলফিয়া ফায়ার মার্শাল অফিস এবং ফিলাডেলফিয়া পুলিশ বিভাগ যৌথভাবে কাজ করছে। এছাড়া বিচার বিভাগের সিভিল রাইটস ডিভিশনও মামলাটির প্রসিকিউশনে সহায়তা করছে। তদন্ত এখনো অব্যাহত রয়েছে।
২০০৪ সালে মাত্র এক ডজন মুসল্লিকে নিয়ে যাত্রা শুরু করা নর্থইস্ট ফিলাডেলফিয়া ইসলামিক সেন্টার বর্তমানে এলাকার অন্যতম বৃহৎ মুসলিম উপাসনালয়ে পরিণত হয়েছে। প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজে পাঁচ শতাধিক মুসল্লি অংশ নেন, যা বর্তমান ভবনের ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি হওয়ায় কর্তৃপক্ষকে দুটি জামাতের আয়োজন করতে হয়। সম্প্রতি মসজিদটি ভবন সম্প্রসারণের জন্য তহবিল সংগ্রহও করছিল।
মসজিদের সভাপতি মাসুকুল ইসলাম খান হামলার পর বলেন, এ ইসলামিক সেন্টার শুধু একটি উপাসনালয় নয়; এটি বহু বছর ধরে স্থানীয় বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের জন্য একটি কমিউনিটি কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে আসছে। তার ভাষায়, কোনো উপাসনালয়ের ওপর হামলা কেবল একটি ভবনের ওপর আঘাত নয়; এটি ধর্মীয় স্বাধীনতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সামাজিক সম্প্রীতির ওপর হামলা।
ঘটনার পর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন ধর্মের নেতৃবৃন্দ এবং নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো তীব্র নিন্দা জানায়। হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই মসজিদে একটি আন্তধর্মীয় সংহতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ একত্রিত হয়ে ধর্মীয় বিদ্বেষের বিরুদ্ধে ঐক্যের বার্তা দেন।
এদিকে মসজিদ পুনর্নির্মাণ এবং ভবন সম্প্রসারণ প্রকল্পে সহায়তার জন্য একটি অনলাইন তহবিল সংগ্রহ অভিযানও শুরু হয়েছে। আয়োজকদের আশা, স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের সহায়তায় ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের পাশাপাশি সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়কে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ধর্মীয় বিদ্বেষ ও উগ্রবাদ প্রতিরোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের আরো সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।