গ্যাস সরবরাহে তীব্র সংকট


সালেক সুফী , আপডেট করা হয়েছে : 29-07-2026

গ্যাস সরবরাহে তীব্র সংকট

কক্সসবাজার মহেশখালী উপকূলে ভাসমান দুটি এলএনজি টার্মিনালের একটিতে কারিগরি ত্রুটির কারণে এলএনজি সরবরাহ ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে যাওয়ায় দেশে গ্যাস সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। এমনিতেই দেশে নিজেদের গ্যাস ক্ষেত্রসমূহের প্রমাণিত মজুদ দ্রুত নিঃশেষ হতে থাকায় নিজেদের গ্যাস আর আমদানিকৃত এলএনজিসহ ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করেও ঘাটতি ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এমতাবস্থায় এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় তীব্র সংকটে পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প খাত, সিএনজি ব্যবহারকারীরা। আর এমন যে হতে পারে সে বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সব সরকারকেই সতর্ক করে আসছে বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু কেউ কথা শোনেনি। দেশের নিজস্ব জ্বালানিসম্পদ গ্যাস কয়লা আহরণ আর ব্যবহার অবজ্ঞা করে সিন্ডিকেটদের স্বার্থে জ্বালানি আমদানির দিকে ঝুকে পড়াই বর্তমান সংকটের মূল কারণ বলাইবাহুল্য। বর্তমানে বাংলাদেশে গ্যাসের চাহিদার ৩০ শতাংশ, তেলের ৯৫ শতাংশ এবং কয়লার ৯০ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়। বৈশ্বিক বাজারে দামের ওঠানামা এবং সরবরাহ চেইনের বিঘ্নতা সরাসরি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। তবে এটি কেবল আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন চুক্তির পুরোনো ও ব্যয়বহুল দায়বদ্ধতার সঙ্গেও সম্পর্কিত, যা বড় ধরনের রাজস্ব চাপ এবং বছর শেষে আর্থিক দুর্বলতা তৈরি করছে।

অথচ দেশে জলে স্থলে এখনো বিপুল পরিমাণ গ্যাসপ্রাপ্তির সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে, প্রায় ৭০ টিসিএফ সমপরিমাণ উন্নত মানের কয়লা সম্পদ মাটির অগভীরে দীর্ঘদিন ধরে সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অভাবে পড়ে আছে। ২০০০-২০২৫ সরকারের ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত আর সরকারি প্রতিষ্ঠাগুলোর দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে নিজেদের জ্বালানি অনুসদ্ধান মুখ থুবড়ে পরে আছে। পেট্রোবাংলা এবং কোম্পানিগুলোকে আমলানির্ভর করে পঙ্গু বানানো হয়েছে। বর্তমান সরকার এ উপসর্গগুলো উত্তরাধিকার সূত্রে পেলেও তাদের কিন্তু ১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-০৬ অম্ল মধুর অভিজ্ঞতা আছে। দেখলাম, ঢাকায় একটি আলোচনা সভায় জ্বালানিমন্ত্রী, সরকারি-বেসরকারি ব্যক্তিরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। কেউ কিন্তু সাহস করে কয়লা আহরণ নিয়ে কথা বলছে না। বিদ্যমান অবস্থায় গ্যাস উত্তোলন কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি কয়লা উত্তোলন বিষয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সিডন্ট নেওয়া অপরিহার্য। সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান বাড়ানোর জন্য নানা উদ্যোগের কথা বলছে। সেখানেও ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করে ব্যাক্তিখাতকে নিয়ন্ত্রণের অধীনে সুযোগ করে দেয়া না হলে সুফল মিলবে না।

আমি বর্তমান সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদে নিম্নবর্ণিত কাজগুলো দ্রুত সম্পাদনের আশা করবো।

গ্যাস-বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় সিটেম লস নামের চুরি যথাশিগগির ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনার পাশাপাশি ব্যবহারে কৃচ্ছ্রতাসাধন।

কয়লা উত্তোলন এবং ব্যবহার বিষয়ে দ্রুত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

ভোলার আবিষ্কৃত গ্যাস দ্রুত গ্রিডে সংযোগের ব্যবস্থা গ্রহণ।

ছাতক, টেংরাটিলা, পার্বত্য চট্টগ্রামে দ্রুত গ্যাস অনুসন্ধান করা।

গভীর সাগরের পাশাপাশি স্থলভাগেও পিএসসির মাধ্যমে আইওসিদের নিয়োগ।

পেট্রোবাংলা, স্রেডা, বিপিসি প্রয়োজনীয় সংস্কার করে সঠিক পেশাদারদের কাজের পরিবেশ উন্নতকরণ। স্বচ্ছতা আর জবাবদিহিতা সৃষ্টি।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান বৃদ্ধির জন্য ব্যাক্তি খাতকে সুস্থ পরিবেশে সম্পৃক্তকরণ।

মনে রাখতে হবে, জ্বালানি সংকটের ব্যাপ্তি আর গভীরতা এতো ব্যাপক যে যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গৃহীত না হলে সরকার ২০২৭ থেকে ২০৩০ নানাভাবে বিব্রত হবে। দেশের অর্থনীতি, শিল্পায়ন ব্যাপক হুমকির মুখে পড়বে। বাংলাদেশ অদূর বা সুদূর ভবিষ্যতেও আমদানিকৃত জ্বালানিনির্ভর হয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে না।

সমাধানের উদ্যোগ কোথায় 

বাংলাদেশে যে মারাত্মক গ্যাস সংকট আর সেই সূত্রে জ্বালানি সংকট চলছে সেই অবস্থা থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসার কোনো ম্যাজিক ফরমুলা নেই। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশের দৈনিক গ্যাস চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট বলা হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে চাহিদা ৪২০০-৪৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ২৩-২৪ জুলাই ২০২৬ গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে ২ হাজার ২১৮ মিলিয়ন ঘনফুট। তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সম্প্রতি একটি সেমিনারে জানিয়েছেন, খোদ তিতাস বিতরণ এলাকার চাহিদাই আছে দৈনিক ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তিতাসকে ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ দেওয়া হলে কোনো মতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়। দেশের গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর ক্রমহ্রাসমান উৎপাদন ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট নেমে এসেছে। দুটি এফেসারু থেকে ১০৫০-১১০০ আর এলএনজি সরবরাহ করা হতো। মার্কিন কোম্পানি পরিচালিত এফেসারও যান্ত্রিক গোলযোগ হওয়ায় ৪২০ এমএফসিএফডি সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাস বিতরণ এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যুৎ, শিল্প, সিএনজি, গৃহস্থালি সব শ্রেণির গ্রাহক আছে মহাসংকটে। সরকার দ্রুত এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাবে এমন সম্ভাবনা নেই। এফেসারও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলেও দৈনিক ঘাটতি থাকবে ১০০০-১২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। দ্রুততম সময়ে কূপ খনন আর এফেসারও স্থাপন করা হলেও ২০৩০-এর আগে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নয়নের কোন সম্ভাবনা নেই। গ্যাস সংকটের কারণে বিপর্যস্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানাগুলোতে মারাত্মক সংকট, সার কারখানাগুলোর অধিকাংশ বন্ধ, সিএনজি সরবরাহ অচল হয়ে আছে। এমতাবস্থায় সরকার যতই আন্তরিক হোক না কেন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা আপাতত নেই। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কার করা না হলে বিদ্যমান অবস্থায় যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়ে কয়লা গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি বা এলএনজি আমদানির অবকাঠামো স্থাপনের ত্বরান্বিত ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।

সরকারকে এখনই কয়লা উত্তোলনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ভোলার গ্যাস গ্রিড সংযুক্ত করতে হবে, ছাতক, টেংরাটিলা, পটিয়া, সীতাপাহাড়, কাসালং, জলদিতে গ্যাস কূপ খনন করতে হবে, এফেসারও এবং ল্যান্ড বেসড এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ শুরু করতে হবে। এর পাশাপাশি গ্যাস বিদ্যুৎ ব্যবহারে কৃচ্ছ্রতা বজায় রেখে সিস্টেম লস নামে চুরি নির্মূল করতে হবে. সরকারি কোম্পানিগুলোতে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে এগুলোর কিছুই অর্জন আশা করা যাবে না।

সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান বৃদ্ধির পরিকল্পনা নিয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান অবস্থায় সে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কতটুকু হবে সংশয়ের যৌক্তিক কারণ রয়েছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এখনো আছে। সরকার সংকটের গভীরতা বা ব্যাপ্তি এখনো সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। ৬ মাস হতে চলেছে নতুন সরকারের। প্রস্তুতি আদৌ আশাপ্রদ না। শিল্পের সংকট না মিটলে অর্থনীতির সংকট ঘনীভূত হবে। প্রবৃদ্ধি শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। বেকার সমস্যা বাড়বে। সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হবে। সরকারের উচিত সব স্টেকহোল্ডারকে সম্পৃক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)