জ্বালানি বিদ্যুৎ সেক্টরে বিএনপি সরকারের প্রাধিকার


সালেক সুফী , আপডেট করা হয়েছে : 29-07-2026

জ্বালানি বিদ্যুৎ সেক্টরে বিএনপি সরকারের প্রাধিকার

অতীতের সব সরকার বিশেষত ২০০০-২০২৬ ক্ষমতায় থাকা সব সরকারের ভ্রান্ত নীতি, কৌশল আর দুর্নীতির কারণে দেশ এখন মহাজ্বালানি বিদ্যুৎ সংকটে। সংকটের ব্যাপ্তি আর গভীরতা এতো ব্যাপক যে খুব শিগগির এ সংকট থেকে বেরিয়ে এসে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা প্রায় অসম্ভব। সেক্টরের মূল সমস্যা নিজেদের প্রাথমিক জ্বালানিসম্পদ গ্যাস, কয়লা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিসম্পদ আহরণ এবং ব্যবহারকে উপেক্ষা করে সিন্ডিকেটের স্বার্থে জ্বালানি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়া, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চয়তার চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় না রেখে মাত্রাতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন, জ্বালানি বিদ্যুৎ সেক্টর ব্যবস্থাপনাকে আমলাদের নিয়ন্ত্রণে দিয়ে দক্ষ পেশাদারদের উপেক্ষা, সেক্টরকে দুর্নীতির অভয়ারণ্য বানানো। এ ধরনের সংক্রামক ব্যাধি আক্রান্ত জ্বালানি বিদ্যুৎ খাতকে জরুরি ভিত্তিতে শুশ্রূষা করে সুস্থ করতে সরকারকে প্রথমেই নিমো থেকে ব্যাপক সংস্কার করে একটি সঠিক দক্ষ পেশাদার প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে। জ্বালানি বিদ্যুৎ খাতের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে পেশাদারদের দায়িত্ব দিয়ে স্বচ্ছ জবাবদিহিমূলক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। 

দেশের গ্রিড সংযুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াটের অধিক থাকায় ২০৩০ পর্যন্ত একমাত্র রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়া ২০৩০ পর্যন্ত আর কোনো ফসিল ফুয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রয়োজন নেই। বরং ২৪ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ ক্ষমতায় চালু হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং অদক্ষ গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র অবসরে পাঠাতে হবে। ২০২৭-২০৩০ এ সময়টা বিদ্যুৎ সেক্টরে সঞ্চালন এবং বিতরণ ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করে বিদ্যুতের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সম্ভাব্য সকল উপায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান বাড়াতে হবে। গ্রিড অথবা অফ গ্রিড পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে আন্দোলন সৃষ্টি করতে হবে।

জ্বালানি মিক্সে নিজেদের জ্বালানির অবদান বৃদ্ধির জন্য সরকার সাহসী ভূমিকা নিয়ে নিজেদের কয়লা উত্তোলনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ২০২৭ থেকে ফুলবাড়ী আর বড়পুকুরিয়ায় উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন কার্যক্রম শুরু হলে ২০৩১-৩২ নাগাদ খনিমুখেই ৭০০০-১০,০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা অর্জন সম্ভব। আধুনিক প্রযুক্তিতে খনন এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদণ করে পরিবেশ দূষণ গ্রহণযোগ্য মাত্রায় রক্ষা সম্ভব। যে যাই বলুক নিজেদের কয়লা উত্তোলন এবং ব্যবহার ছাড়া বাংলাদেশ সুদূর বা অদূর ভবিষ্যতে জ্বালানি নিরাপত্তা অর্জন করতে পারবে না।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন হাব-আশুগঞ্জ, ঘোড়শাল, মেঘনাঘাট, যমুনা নদীর পশ্চিম পাড়, মাতারবাড়ী অঞ্চলগুলোর পার্শবর্তী এলাকায় শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলে ডিস্ট্রিবিউটেড জেনারেশন ব্যবস্থা করা বিবেচনা করতে হবে। সারা দেশে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা ছড়িয়ে দিয়ে পল্লীবিদ্যুৎ অবকাঠামোকে ব্যাপক ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। অঞ্চলভিত্তিক সোলার পার্ক স্থাপন করে মিনি গ্রিড, মাইক্রো গ্রিড বাংলাদেশের জন্য অনেক উপযোগী হবে।

বর্তমান সরকার এ টার্মের কার্যকালে ভোলার গ্যাস ক্ষেত্রগুলোকে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সংযুক্ত করার কার্যক্রম প্রাধিকার ভিত্তিতে ২০৩০-এর মধ্যে সম্পাদন করতে হবে। একই সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে ছাতক, টেংরাটিলা, পটিয়া, জলদী, সীতাপাহাড়, কাসালং এলাকায় ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়ে গ্যাস আহরণ করে মনোযোগ দিতে হবে। আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোকে সঠিক প্রণোদনা দিয়ে স্থলভাগ এবং সাগরে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দিয়ে মনিটরিং করা হলে ২০৩০ নাগাদ সুফল মিলতে শুরু হবে।

গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থাকে সুসমন্বিত করতে হলে আশুগঞ্জ, এলেঙ্গা, আনোয়ারা, ধনুয়া, বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্র, মেঘনাঘাট, ফৌজদারহাট সঞ্চালন হাবসমূহকে আধুনিকায়ন করে স্কাডা ব্যবস্থার নিবিড় নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। গ্যাস সিস্টেম থেকে সিস্টেম লস শূন্যের কোঠায় আনতে হবে। গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় সংস্কার এনে প্রাধিকার ভিত্তিতে শুধু শিল্পে এবং সার উৎপাদনে প্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

মাতারবাড়ীতে ল্যান্ড বেসড এলএনজি, এলপিজি টার্মিনাল স্থাপন কার্যক্রম তরান্বিত করা হলে ২০৩২ নাগাদ সুফল মিলবে। পাশাপাশি মাতারবাড়ী থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত ৪২” ব্যাসের তৃতীয় সমান্তরাল পাইপলাইন স্থাপন করতে হবে।

তরল জ্বালানি আমদানি ব্যবস্থা তরান্বিত করতে অবিলম্বে গভীর সাগর থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত নির্মিত এসপিএম চালু করতে হবে। ইস্টার্ন রিফাইনারি দ্বিতীয় ইউনিট চালুর পাশাপাশি দ্বিতীয় রিফাইনারি নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে।

উপরের কাজগুলো পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং পরিচালনা করার সক্ষমতা বা যোগ্যতা বর্তমান অবস্থায় বিপিডিবি, পেট্রোবাংলা, বিপিসি বা স্রেডার নেই। ব্যাপক সংস্কার করে যোগ্য পেশাদারদের নিয়োগ দেয়া না হলে অর্থ সময়ের অপচয় হবে। সংকট থেকে পরিত্রাণ মিলবে না। জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে সরকার নিজেই অস্তিত্বের অনিশ্চয়তায় নিপতিত হবে।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)