বাংলাদেশের মানুষের দিন শুরু হচ্ছে বিষ দিয়ে


সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ , আপডেট করা হয়েছে : 29-07-2026

বাংলাদেশের মানুষের দিন শুরু হচ্ছে বিষ দিয়ে

বাংলাদেশের শিশু থেকে সব বয়সের মানুষের দিন শুরু হচ্ছে বিষ দিয়ে। কেননা দেশে বিক্রি হওয়া প্রতি চারটি টুথপেস্টের মধ্যে প্রায় তিনটিতেই মিলেছে মাইক্রোটপ্লাস্টিক। আর এই প্লাস্টিক ক্ষুদ্র কনাগুলি (মাইক্রোপ্লাস্টিক ) মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ ও শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এছাড়া যেসব জটিলতা দেখা দিতে পারে তার মধ্যে রযেছে শ্বাসতন্ত্র (Respiratory): ফুসফুসের প্রদাহ, ফুসফুসের কার্যক্ষমতা হ্রাস পাওয়া এবং অ্যাজমা ও সিওপিডি (COPD)-র অবনতি। মস্তিষ্কের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব, যার মধ্যে রয়েছে নিউরো-ইনফ্লেমেশন (স্নায়ুপ্রদাহ) এবং জ্ঞানীয় ও চিন্তাশক্তির সক্ষমতা হ্রাস (Cognitive impairment)।

এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন- এসডো’র বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। দেশে ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে (৭৬.৫%) মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। 

এসব তথ্য দিয়ে এসডো আরও জানিয়েছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক শুধু পরিবেশের জন্য নয়, মানবস্বাস্থ্যের জন্যও একটি ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ। এটি পানি ও মাটির মাধ্যমে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্য ও পানীয়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

এসডো আরও জানিয়েছে, বাংলাদেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে আগে কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণা, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বা নিয়মিত নজরদারি ছিল না। এই গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি বিবেচনায় নিয়ে এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো) জুলাই ২০২৫ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত দেশব্যাপী একটি সমন্বিত গবেষণা পরিচালনা করে।

গবেষণায় ভোক্তা জরিপ, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা এবং নিয়ন্ত্রক ও বৈজ্ঞানিক বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার অন্তর্ভুক্ত ছিল, যাতে বাস্তব পরিস্থিতি ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে মূল্যায়ন করা যায়। সর্বসাধারণ মনে করেন, গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, মানদণ্ড নির্ধারণ এবং নীতিমালা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের বড় উদ্বেগের বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি প্রমাণিত হয়েছে। তবে বাংলাদেশে এ ধরনের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন এই প্রথম, যা ভবিষ্যতে নিরাপদ টুথপেস্ট নিশ্চিত করতে মানদণ্ড নির্ধারণ, নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

টুথপেস্ট ব্যবহারের অভ্যাস এবং মাইক্রোপ্লাস্টিক সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা জানতে এই গবেষণায় দেশের বিভিন্ন এলাকার ২,৭৬০ জন ভোক্তার ওপর জরিপ চালানো হয়। পাশাপাশি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি (EHE) ল্যাবরেটরিতে ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি স্টিরিওমাইক্রোস্কোপি ও ফুরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপি (FTIR) ব্যবহার করে পরীক্ষা করা হয়।

গবেষণায় পরীক্ষা করা ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে (৭৬.৫%) মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, আর ৮টিতে (২৩.৫%) কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি। প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। 

পরীক্ষা করা টুথপেস্টগুলো বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে উৎপাদিত। চারটি দেশের উৎপাদিত টুথপেস্টেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের ২৫টি নমুনার মধ্যে ২২টিতে, ভারতের ৫টির মধ্যে ১টিতে, থাইল্যান্ডের ২টির মধ্যে ১টিতে এবং ভিয়েতনামের ২টির দুটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। একটি টুথপেস্টে প্রতি ১০০ গ্রামে সর্বোচ্চ ৩২০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।

দেশে তৈরি ও আমদানি করা উভয় ধরনের টুথপেস্টেই মাইক্রোপ্লাস্টিক মিলেছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, শিশুদের জন্য বিক্রি হওয়া ৬টি টুথপেস্টের মধ্যে ৪টিতেই (৬৬.৭%) মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এসব টুথপেস্টে প্রতি ১০০ গ্রামে ২০ থেকে ১৪০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। বাকি ২টি নমুনায় কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পরীক্ষা করা কোনো টুথপেস্টের মোড়ক বা লেবেলে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা কৃত্রিম পলিমার ব্যবহারের তথ্য উল্লেখ ছিল না। ফলে ভোক্তারা যেমন জানতে পারছেন না তারা কী ব্যবহার করছেন, তেমনি নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্যও এসব পণ্য কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। গবেষণায় শুধু টুথপেস্টেই নয়, ভোক্তাদের সচেতনতাতেও বড় ঘাটতি উঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় সবাই নিয়মিত টুথপেস্ট ব্যবহার করলেও, ৪১.৯% মানুষ জানতেনই না যে টুথপেস্টের মতো মুখের পরিচর্যার পণ্যেও মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকতে পারে। মাত্র ২৬.৯% উত্তরদাতা এ বিষয়ে সচেতন বলে জানিয়েছেন। এই ফলাফল স্পষ্টভাবে দেখায় যে, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও কার্যকর নজরদারির পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানোও এখন সময়ের দাবি।

তবে এসডো স্পষ্ট করেছে যে, এই গবেষণার উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড বা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা নয়। বরং বাংলাদেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে কোনো জাতীয় মানদণ্ড, গ্রহণযোগ্য সীমা, পরীক্ষার নির্দেশিকা বা লেবেলে তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা না থাকায় বর্তমান পরিস্থিতি বৈজ্ঞানিকভাবে তুলে ধরাই ছিল এই গবেষণার মূল লক্ষ্য। এই গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে একটি জাতীয় বৈজ্ঞানিক ভিত্তি (Baseline) তৈরি হয়েছে। এই তথ্য ভবিষ্যতে নিরাপদ পণ্য নিশ্চিত করতে জাতীয় মানদণ্ড প্রণয়ন, নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নজরদারি জোরদার এবং প্রয়োজনীয় নীতিমালা গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এসডোর মহাসচিব ও সিনিয়র টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার ড. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, টুথপেস্ট আমাদের প্রতিদিনের ব্যবহারের একটি পণ্য। অথচ গবেষণায় দেখা গেছে, এতে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকতে পারে- এ বিষয়ট সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষই জানেন না। তাই আরও গবেষণার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি, পণ্যের লেবেলে উপাদানের স্পষ্ট তথ্য উল্লেখ এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রক তদারকি এখন অত্যন্ত জরুরি।

এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দীকা সুলতানা বলেন, এই গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক শূন্যতা পূরণ হয়েছে। এর ফলাফল ভবিষ্যতে ওরাল কেয়ার পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের মানদণ্ড নির্ধারণ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং তথ্যভিত্তিক নীতিমালা প্রণয়নে সহায়ক হবে।

দন্ত চিকিৎসক, অধ্যাপক ডা. মোঃ মোশাররফ হোসেন খন্দকার, সাবেক লাইন ডিরেক্টর (এমই ও এইচএমডি), স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিজিএমই) বলেন, আমাদের মুখ পরিষ্কারে ব্যবহৃত পণ্যগুলোতে এ ধরনের ক্ষতিকর উপাদান থাকা মোটেও উচিত নয়। দাঁতের সুরক্ষায় ফ্লোরাইড, কার্বনেট ও সিলিকাকে সবচেয়ে ঈস্খয়োজনীয় মনে করা হয়। মাইক্রোপ্লাস্টিক তার ঘর্ষণ ক্ষমতার (Abrasive properties) কারণে দাঁত সাদা করতে পারলেও, এটি দাঁতের এনামেলের ওপর অত্যন্ত বিরূপ ও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই)-এর উপ-পরিচালক মোঃ মনজুরুল করিম বলেন, টুথপেস্ট তৈরির স্ট্যান্ডার্ড ও প্রয়োজনীয়তার ওপর ভিত্তি করে অনুমোদিত ৪০টি উপাদানের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তবে এই তালিকায় এখনো মাইক্রোপ্লাস্টিক অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আমরা এই বিষয়টি আমলে নিচ্ছি এবং দ্রুতই এসআরও (SRO) সংশোধন করে তালিকায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের মানদণ্ড বা সর্বোচ্চ সহনশীল মাত্রা যুক্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

পরিবেশ অধিদপ্তরের ইন্সপেক্টর মাহমুদা তামান্না খান বলেন, আমরা আজ যে বিষয়টি উন্মোচিত করেছি, তার ওপর ভিত্তি করে কাজ করতে অত্যন্ত আগ্রহী এবং বিএসটিআই-কে সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত। সরকারি সংস্থা ও এনজিওগুলো একযোগে কাজ করলেই ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)