সংকটের জালে প্রধান বিরোধী দল জামায়াত


বিশেষ প্রতিনিধি , আপডেট করা হয়েছে : 29-07-2026

সংকটের জালে প্রধান বিরোধী দল জামায়াত

সরকার পতনের ইঙ্গিত দিয়ে আগামী দিনের আন্দোলনের জন্য সবাইকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হন। ঢাকার জন্য ডাক আসবে, ঘরে ঘরে সেই লড়াইয়ের দুর্গ গড়ে তুলতে হবে। দেশ থেকে ফ্যাসিবাদ, চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজ ও দুঃশাসন দূর না হওয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই তীব্র থেকে তীব্রতর হবে। মুক্তির মঞ্জিলে না পৌঁছা পর্যন্ত আমরা থামব না।’ এ বক্তব্য তিনি দিয়েছেন গত শনিবার (২৫ জুলাই) বিকেলে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে।  

সরকারকে জুলাই সনদ মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির  বলেন, ‘ভালোয় ভালোয় জুলাই সনদ মেনে নিন। যদি না মানেন, তাহলে এই দেশের মানুষ জীবন দিয়ে, পঙ্গুত্ব বরণ করে, গুলি খেয়ে শিখে নিয়েছে মুক্তির পথে কিভাবে হাঁটতে হয়।’

সরকারের ভিত নাড়িয়ে জামায়াতের আমির, সেক্রেটারী জেনারেল সহ শীর্ষ নেতৃত্ব এমন বক্তব্য বেশ কিছুদিন থেকেই এমন বক্তব্য দিয়ে আসছেন। এছাড়াও সংসদেও কোনো প্রকার ছাড় নিয়ে একটা পারফেক্ট বিরোধী দল হিসেবে সংসদকে প্রাণবন্ত করেই এগিয়ে চলছে জামায়াত।  

কিন্তু দলের অভ্যন্তরীন কিছু কর্মকান্ডে বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পরে গেছে  জামায়াত। অন্যসব দলের জন্য যে বিষয়গুলো তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, যেখানে জামায়াতের বেলায় মানুষ সেখানে বেশ কঠোর নজরদারী করছে। এর প্রধান কারন দলটির মুল নীতির মধ্যেই রয়েছে ‘আকিমু দ্বীন’। মানে দিন বা ইসলাম প্রতিষ্টা। ফলে এ দলের সবাইকে মানুষ সৎ, নির্ভার, সৎ চরিত্রের মানুষ হিসেবেই দেখতে চায়। ব্যাতিক্রম হলে যে বিপত্তি সেটাতেই পড়েছে দলটি।  

দলটির ইতিহাসে এবারই রেকর্ড জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসেছে। এটি এক অনন্য অর্জন। এ সফলতা উপভোগ না করে বরং দুইশতাধিক আসন লাভ করে সরকার গঠন করা বিএনপিকে একের পর এক প্রেসারে ফেলার চেস্টায় নিমগ্ন ছিল দলটি। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী দলের এই নতুন ভূমিকা ও জনআকাঙ্ক্ষার বিশাল চাপ সামলাতে গিয়ে ‘অপ্রস্তুত’ জামায়াতকে এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে।

জামায়াতের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যার কারন হয়ে দাড়িয়েছে দলীয় সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের বিতর্কিত ঘটনাবলী। যদিও এগুলো দলের জন্য কোনো সমস্যার কারন না। জামায়াত বলেও আসছে যে ব্যাক্তির দায় দল নেবে না। কিন্তু যে দলটি দেশে ইসলামী শরিয়ত প্রতিষ্ঠা করতে চায়, ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে দৃঢ়তা দেখাচ্ছে। সরকার দলের নানা ত্রুটি বিচ্চুতি ধরছে, সে দলের  ত্রুটি এখন বড় করে দেখছে সাধারন মানুষ এটাই স্বাভাবিক। 

সদ্য এক ঘটনায় তোলপাড় দেশ। সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের একটি বিতর্কিত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় দলটিকে চরম ভাবমূর্তি সংকটে ফেলে। শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। দলের রাজনীতিতে এটিই প্রথম কোনো শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে বড় ধরনের স্ক্যান্ডালের প্রকাশ্য রূপ। দলের নেতাদের কেউ প্রকাশ্যে এভাবে একজন শীর্ষ নেতার নৈতিকতার স্খালন নিয়ে সোচ্চার হতে দেখা গেছে। 

বিতর্কনৈতিক স্খলনের দায়ে বহিষ্কার 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক তরুণীর সাথে আপত্তিকর বা “ব্যক্তিগত মুহূর্তের” ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের নিজস্ব তদন্তে তাঁর “নৈতিক স্খলন” ও “পর্দা লঙ্ঘন”-এর প্রমাণ পাওয়ায় তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে। দলের গঠনতন্ত্রের ধারা অনুযায়ী জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ জরুরি বৈঠক ডেকে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং নির্বাচন কমিশনকেও বিষয়টি অবহিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে করে তার সংসদ সদস্য পদে অনিশ্চয়তা তৈরী হয়। বাংলাদেশ সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ ও অস্পষ্টতার কারণে তাঁর সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না তা নিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। যা এখনো চলছে। 

এদিকে এর জের ধরে সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর ও কালীগঞ্জের একাংশ) এলাকায় তাঁর সমর্থক ও জামায়াত কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে; স্থানীয়ভাবে তাঁকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা ও সংসদ সদস্য পদ থেকে অপসারণের দাবিতে মিছিল-সমাবেশ হয়েছে।

গাজী নজরুল ইসলাম ১৯৯১ সালে প্রথম সাতক্ষীরা-৫ (বর্তমান সাতক্ষীরা-৪) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ২০০১ এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের নির্বাচনেও একই এলাকা থেকে নির্বাচিত হন। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাতক্ষীরা জেলা শাখার আমীর এবং কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্য হিসেবে দীর্ঘকাল দায়িত্ব পালন করেছেন। এর পাশাপাশি তিনি একজন নিবন্ধিত বীর মুক্তিযোদ্ধাও। 


যশোর-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (এমপি) গোলাম রসুল/ছবি সংগৃহীত 


সদ্য যশোর-৪ আসনের জামায়াতদলীয় সংসদ সদস্যকে কেন্দ্র করে তাঁর কন্যার আচরণ নিয়ে এলাকায় উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। জানা যায় এমপি কন্যা তার বাড়ীর সঙ্গেই থাকা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের প্রহর করেছেন। এ ছাড়া এলাকাবাসী বেশ কিছুদিন থেকে এমন কর্মকান্ডে বিরক্ত। সর্বশেষ তারা সংগঠিত হয়ে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী এমপির বাড়ি ঘেরাও করেন। হামলা, ভাংচুরের চেষ্টা চালায়।

এমপি কন্যা সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত দাবী করে জামায়াত নেতা ফেসবুকে লাইভে এসে ক্ষমা চাইলেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সহজ হয়নি। পরবর্তীতে বিএনপির নেতাকর্মীদের মদদে এমপির বাসভবনে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ এনেছে জামায়াত, যা স্থানীয় রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা তৈরি করেছে। 

এদিকে এ ব্যাপারে জামায়াত বিএনপির ওই এলাকার কতিপয় নেতার উস্কানী এহেন ঘঠনা ঘটেছে দাবী করে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। একইভাবে একজন সংসদ সদস্যের বাড়ীর নিরাপত্তা প্রদানে সরকার ব্যর্থ বলে উল্লেখ করেছেন।

জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (এমপি) গোলাম রসুল পরবর্তীতে পরিস্থিতি সামাল দিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লাইভে এসে নিজের মেয়ের মানসিক অসুস্থতার কথা জানিয়ে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। 

নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে ফেসবুক লাইভে এসে এমপি গোলাম রসুল তার মেয়েকে মানসিক রোগী হিসেবে দাবি করেন। তিনি বলেন, ভারতের হায়দরাবাদ ও দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে তার মেয়ের চিকিৎসা করানো হয়েছে। উদ্ভূত অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য তিনি গভীর মর্মাহত এবং এই ভুলের জন্য সকলের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তিনি জানান, তারা সবার সঙ্গে মিলেমিশে শান্তিতে বসবাস করতে চান। 


সরকারি বরাদ্দ নিয়ে বিতর্ক

 ত্রাণ ও সরকারি অনুদান বণ্টনে জামায়াতের কয়েকজন সংসদ সদস্য ও স্থানীয় নেতার বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এই বিতর্কের জবাবে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব প্রশাসনিকভাবে বেশ কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে- 

দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের স্বাক্ষরিত নির্দেশনায় সব এমপির জন্য পারিবারিক সদস্য, আত্মীয়স্বজন, ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) বা সচিবদের সরকারি বরাদ্দ বা অনুদানের সুপারিশ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও স্থানীয় পর্যায়ের অনিয়মের অভিযোগে ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকজন স্থানীয় নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।


জোট রাজনীতিতে ভাঙন ও রাজনৈতিক মেরুকরণ

অভ্যন্তরীন এ সমস্যার পাশাপাশি বড় একটি চ্যালেঞ্চ জোট টিকিয়ে রাখা নিয়ে। কওমিভিত্তিক রাজনীতি জোরদার হওয়ার পর এবং হেফাজতে ইসলামের নতুন জোট গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্যে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট থেকে বের হয়ে গেছে খেলাফত মজলিস। জোটে অন্যান্য শরীকদের থাকা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জামায়াত নেতাদের ধারণা, বিরোধী নেতৃত্ব থেকে কওমি ঘরানার দলগুলোকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা চলছে। ফলে যে জোট শক্তি নিয়ে গত নির্বাচনে ব্যাপক সারা ফেলতে পেরেছিল দলটি, সেখান থেকে সহযোগীদের বিদায়ে জনমনে কিছুটা দুর্বলতা ডেকে আনবে। সামনেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময় জোটে ভাঙন, শুভ লক্ষণ নয় মোটেও।  


দল কঠোর অবস্থানে 

সাম্প্রতিক এই সংকট ও ক্ষুণ্ন হওয়া ভাবমূর্তি রক্ষায় জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত রুকন সম্মেলনে সতর্কবাণী দিয়ে বলেন, “সাদা কাপড়ে দাগ লাগলে তা বেশি স্পষ্ট হয়... ভেরি কেয়ারফুল! নৈতিকতার প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামীতে কোনো ছাড় নেই।”

সবশেষ 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত এতকাল কেবল আন্দোলনমুখী রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচালিত হলেও এখন রাষ্ট্র পরিচালনার বিকল্প শক্তি ও প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ফলে দলটির প্রতিটি সিদ্ধান্ত, সংসদ সদস্যদের আচার- আচরণ এবং দলীয় শৃঙ্খলার ওপর সারা দেশের মানুষের চোখ রয়েছে।

সংসদ, জনপ্রতিনিধিদের নৈতিকতা, জোট টিকিয়ে রাখা এবং জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ এই চার চ্যালেঞ্জ সামলে উঠতে জামায়াতকে এখন দলীয় পরিপক্বতা ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতার চূড়ান্ত পরীক্ষা দিতে হচ্ছে।  

  


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)