নর্থইস্ট সিভিল রাইটসমসজিদে অগ্নিসংযোগের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত ৬০ বছর বয়সী ভিনসেন্ট ল্যাংয়ের বিরুদ্ধে এবার ধর্মীয় সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগে ফেডারেল সিভিল রাইটস মামলা যুক্ত হয়েছে। গত ১৬ জুলাই তার বিরুদ্ধে ফেডারেল ক্রিমিনাল কমপ্লেইন দাখিলের পর তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। নতুন এ অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে ল্যাংয়ের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ কারাদণ্ড ৪০ বছর পর্যন্ত হতে পারে বলে জানিয়েছে ফেডারেল প্রসিকিউটররা।
ফেডারেল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ অভিযুক্ত ব্যক্তি ভিনসেন্ট ল্যাং, ৫ জুলাই ভোর প্রায় ২টার দিকে তিনি নর্থইস্ট ফিলাডেলফিয়া ইসলামিক সেন্টারে একটি দাহ্য ডিভাইস ছুড়ে দেন। মসজিদটি তখন খালি থাকায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে ভবনের সামনের বারান্দায় ও ভেতরে অগ্নিকাণ্ডে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়।
ঘটনার ১১ দিন পর ১৬ জুলাই ফেডারেল কর্তৃপক্ষ ল্যাংকে গ্রেফতার করে এবং তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করে। ওই মামলায় তার বিরুদ্ধে আগুন ব্যবহার করে সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করার, অথবা তা করার চেষ্টা করার ফেডারেল অভিযোগ আনা হয়। এ অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ড এবং ন্যূনতম পাঁচ বছরের বাধ্যতামূলক কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
তদন্ত যত এগিয়েছে, ল্যাংয়ের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিদ্বেষের সম্ভাব্য প্রমাণও সামনে এসেছে। প্রসিকিউটরদের ভাষ্য, হামলার দুদিন পর কর্তৃপক্ষ একটি সূত্রের মাধ্যমে ল্যাংয়ের সম্পৃক্ততার তথ্য পায়। এরপর তদন্তকারীরা তার বাড়ির ওপর নজরদারি চালান এবং তার একটি কালো এসইউভি শনাক্ত করেন।
ফেডারেল প্রসিকিউটরদের দাবি, ওই গাড়িতে হোয়াইট প্রাইড এফ ইসলাম এবং ফেডারেল টেরোরিস্ট হান্টিং লাইসেন্সের মতো বার্তা ও স্টিকার ছিল। তদন্তকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ল্যাংয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা কয়েকটি অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করেন। এসব অ্যাকাউন্টে ইসলামবিরোধী বক্তব্যের পাশাপাশি মসজিদে অগ্নিসংযোগের তদন্ত নিয়েও মন্তব্য পাওয়া যায়।
প্রসিকিউটরদের উদ্ধৃত একটি পোস্টে বলা হয়, এটা কীভাবে হেট ক্রাইম হতে পারে? তারা তো ভালোবাসা থেকেই এটা করে থাকতে পারে- যা তদন্তকারীদের কাছে মামলার প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়েছে।
এরপর ৬ আগস্ট ২০২৬ ফেডারেল প্রসিকিউটররা জানান, ল্যাংয়ের বিরুদ্ধে ধর্মীয় সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি ডেভিড মেটক্যালফ বলেন, এ পদক্ষেপ ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংবিধান-স্বীকৃত ধর্মচর্চার অধিকার রক্ষায় সরকারের দৃঢ় অবস্থানকে তুলে ধরে।
নতুন অভিযোগের ফলে মামলাটি শুধু অগ্নিসংযোগ বা সম্পত্তি ধ্বংসের অভিযোগে সীমাবদ্ধ থাকছে না। ফেডারেল কর্তৃপক্ষ এখন এটিকে একটি ধর্মীয় উপাসনালয়কে লক্ষ্য করে সংঘটিত সম্ভাব্য নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা হিসেবেও দেখছে। প্রসিকিউটরদের মতে, নতুন অভিযোগের অধীনে ল্যাংয়ের সর্বোচ্চ সম্ভাব্য কারাদণ্ড ৪০ বছর পর্যন্ত হতে পারে।
ল্যাং গ্রেফতারের পর থেকেই ফেডারেল হেফাজতে রয়েছেন। তার ফেডারেল ডিফেন্ডার নতুন অভিযোগ সম্পর্কে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
এদিকে কেয়ারের ফিলাডেলফিয়া শাখা ফেডারেল তদন্ত ও নতুন অভিযোগকে স্বাগত জানিয়েছে। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ড. আহমেত তেকেলিওগলু বলেন, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো উপাসনালয়কে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলে সেটিকে সাধারণ অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি পুরো একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নাগরিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর আঘাত।
এ মামলার সময়রেখা এখন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে দাঁড়িয়েছে, গত ৫ জুলাই নর্থইস্ট ফিলাডেলফিয়ার মসজিদে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা। ১৬ জুলাই ল্যাং গ্রেফতার এবং ফেডারেল ফৌজদারি মামলা দাখিল এবং ৬ আগস্ট ধর্মীয় সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত করার নাগরিক অধিকার অভিযোগ যুক্ত করার উদ্যোগ।
মামলাটি এখন ফেডারেল আদালতে এগোচ্ছে। তবে ল্যাংয়ের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। তিনি আইন অনুযায়ী দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ বলে বিবেচিত হবেন।
সিনসিনাটির ইসলামিক সেন্টারে ব্যাপক ভাঙচুর ও চুরি
যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের সিনসিনাটি ইসলামিক কমিউনিটি সেন্টারে ৫ আগস্ট চুরি ও ব্যাপক ভাঙচুরের পর মুসলিম সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে সহায়তার আহ্বান জানানো হয়েছে। দুর্বৃত্তরা উপাসনালয়টিতে ঢুকে বিভিন্ন জিনিসপত্র চুরি করার পাশাপাশি ভবনের দেয়াল ও জানালায় ব্যাপক ক্ষতি করেছে। হামলায় সেন্টারের দেয়ালে গর্ত করা হয়েছে, জানালার কাচ ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং খাদ্যসহায়তা কেন্দ্র তছনছ করা হয়েছে। নিরাপত্তা সরঞ্জামও ধ্বংস করা হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি নিরাপত্তা ক্যামেরা চুরি হয়েছে।
শারীরিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি ঘটনার কারণে মুসল্লিদের মধ্যে গভীর নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। কমিউনিটি সংগঠক জেসি হাইজার বলেন, এ ধরনের ঘটনা একটি পুরো সম্প্রদায়কে বোঝানোর চেষ্টা করে যে তারা নিরাপদ নয় এবং তাদের স্বাগত জানানো হয় না।
ঘটনার পর ইসলামিক সেন্টারের পাশে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ধর্মীয় নেতা ও অধিকারকর্মীরা। কেউ কেউ ঘটনাটিকে ঘৃণাপ্রসূত হামলা হিসেবে বর্ণনা করলেও তদন্তকারীরা এখনো হামলার উদ্দেশ্য বা এর পেছনে কোনো বিদ্বেষমূলক কারণ ছিল কি না, সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি।
গত মে মাস থেকে ওহাইওতে ইসলামিক সেন্টার গুলোকে লক্ষ্য করে ১৭টি নথিভুক্ত ঘটনার তথ্য প্রকাশ করেছে সিনসিনাটির মুসলিম অধিকার কর্মীরা। সিনসিনাটি ইসলামিক কমিউনিটি সেন্টারের সদস্যদের দাবি, এটি তাদের কেন্দ্রকে লক্ষ্য করে তৃতীয় হামলা।
সিনসিনাটির সিটি নেতারাও ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। সিটি ভাইস মেয়র জ্যান মিশেল লেমন কার্নি বলেন, এটি একটি অত্যন্ত নিন্দনীয় ঘটনা এবং ঘৃণা কোনোভাবেই সিনসিনাটির কোনো সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
স্থানীয় বাসিন্দা, ধর্মীয় নেতা ও অধিকারকর্মীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি হামলার জন্য দায়ীদের শনাক্ত করে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে। তবে ঘটনার পরও ধর্মীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন ইসলামিক সেন্টারের মুসল্লিরা। সেন্টারের নাশিদ শাকির বলেন, এটিও একদিন পেরিয়ে যাবে। আমরা পুনর্গঠন করব।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, তদন্তকারীরা এখনো কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তি বা আগ্রহের ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে পারেননি। একই সঙ্গে হামলার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যও প্রকাশ করা হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত ভবন মেরামত এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা পুনর্গঠনের ব্যয় মেটাতে সিনসিনাটি ইসলামিক কমিউনিটি সেন্টার তহবিল সংগ্রহ শুরু করেছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা ও সমর্থকদের কাছ থেকেও আর্থিক সহায়তার আহ্বান জানানো হয়।