নিউইয়র্কের স্কুলে ইএলএতে দক্ষ মাত্র অর্ধেক শিক্ষার্থী


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 12-08-2026

নিউইয়র্কের স্কুলে ইএলএতে দক্ষ মাত্র অর্ধেক শিক্ষার্থী

নিউইয়র্ক সিটির পাবলিক স্কুলে শিশুদের পড়ার সক্ষমতা নিয়ে যে উদ্বেগ দীর্ঘদিনের, গত জুনে সর্বশেষ পরীক্ষার ফলাফল সেই উদ্বেগকেই আরো গভীর করে তুলেছে। তৃতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণির মাত্র ৫০ দশমিক ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বা ইএলএ পরীক্ষায় গ্রেড অনুযায়ী দক্ষতার মানদণ্ড পূরণ করেছে। এক বছর আগেও এ হার ছিল প্রায় ৫৬ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শহরের শিক্ষার্থীদের ইএলএ দক্ষতার হার প্রায় ছয় শতাংশ পয়েন্ট কমেছে। তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে তৃতীয় শ্রেণিতে। মাত্র ৪৪ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রফিশিয়েন্ট হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ পয়েন্ট কম।

নিউইয়র্ক স্টেট এডুকেশন ডিপার্টমেন্টের ৭ আগস্ট প্রকাশিত প্রাথমিক তথ্য এমন একটি সময়ে সামনে এসেছে, যখন নিউইয়র্ক সিটির পাবলিক স্কুলব্যবস্থা পড়াশোনা শেখানোর পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন বাস্তবায়ন করছে। ২০২৩ সালে নিউইয়র্ক সিটি পাবলিক স্কুলস বা এনওয়াইসিপিএস ‘এনওয়াইসি রিডস’ কর্মসূচি চালু করে। শিক্ষা বিভাগের দাবি, গবেষণাভিত্তিক এ উদ্যোগ সায়েন্স অব রিডিং এবং ফিনিক্সভিত্তিক শিক্ষাপদ্ধতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু নতুন ফলাফল সামনে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে। নতুন পদ্ধতির বাস্তবায়ন কি প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে, নাকি পরিবর্তনের মধ্যবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আরো পিছিয়ে পড়ছে?

ফলাফলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গণিত। একই শ্রেণিগুলোর প্রায় ৫৭ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতে প্রফিশিয়েন্ট হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ০.১ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। অর্থাৎ গণিতে বড় ধরনের পরিবর্তন না হলেও পড়ার ক্ষেত্রে যে পতন ঘটেছে, সেটি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি তীব্র। ফলে ইএলএ ফলাফলের এ পতন কেবল সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনের ফল, নাকি বিশেষভাবে সাক্ষরতা শিক্ষার পদ্ধতি, বাস্তবায়ন এবং শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন ব্যবস্থার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ তদন্তের বিষয় হয়ে উঠেছে।

স্কুলস চ্যান্সেলর কামার স্যামুয়েলস অবশ্য এনওয়াইসি রিডস থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেননি। তিনি বলেছেন, শিক্ষার্থীদের সর্বজনীন সাক্ষরতা নিশ্চিত করাই শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্য এবং তারা এনওয়াইসি রিডস ও সায়েন্স অব রিডিংএর পথেই এগিয়ে যাবে। শিক্ষা কর্মকর্তারাও ফলাফলের আকস্মিক ওঠানামা নিয়ে আরো গভীর বিশ্লেষণের কথা জানিয়েছেন। তাদের মতে, পরীক্ষার স্কোর শিক্ষার্থীরা বাস্তবে কতটা শিখছে তার সঠিক প্রতিফলন করছে কি না, সেটিও যাচাই করা জরুরি।

কিন্তু শিক্ষকদের সংগঠন ইউনাইটেড ফেডারেশন অব টিচার্স বা ইউএফটি বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছে। সংগঠনটির শিক্ষাবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট মেরি ভ্যাকারোর দাবি, সাক্ষরতা শিক্ষায় কী কাজ করে তা নিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার আবারও মৌলিক প্রশ্নে ফিরে যাওয়া উচিত। তার মতে, একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা, বিজ্ঞানভিত্তিক ও শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি পাঠ্যক্রম এবং শিক্ষকদের জন্য কার্যকর পেশাগত প্রশিক্ষণ ছাড়া কেবল নতুন নতুন কর্মসূচি ও মূল্যায়ন যোগ করলে কাক্সিক্ষত ফল আসবে না। ভ্যাকারোর অভিযোগ, গত শিক্ষাবর্ষে স্কুল ব্যবস্থায় একের পর এক কর্মসূচি, মূল্যায়ন, পরামর্শক ও পাঠ্যক্রম যুক্ত করা হলেও একটি সুসংহত পরিকল্পনার অভাব ছিল। তার ভাষায়, আরো বেশি যোগ করলেই যে আরো ভালো ফল পাওয়া যাবে, সেই ধারণাই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে।

অন্যদিকে মেয়র মামদানি এনওয়াইসি রিডস কর্মসূচির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তার বক্তব্য, শিশুদের প্রমাণভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করেছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রমাণভিত্তিক সাক্ষরতা শিক্ষার মাধ্যমে উন্নতির উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, নিউইয়র্কও একই পথে এগিয়ে যাবে। তবে এবারের ফলাফল নিয়ে আরো গভীরভাবে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি স্বীকার করেছেন। বিশেষ করে পরীক্ষার স্কোর কীভাবে তৈরি হয়েছে এবং এগুলো শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শেখার অগ্রগতি কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে তুলে ধরছে, তা বোঝার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিয়ে কাজ করা অ্যাডভোকেটস ফর চিলড্রেন অব নিউইয়র্কের নির্বাহী পরিচালক মারিয়া ওডমের বক্তব্যেও পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা স্পষ্ট। তার মতে, নতুন ফলাফল অনেক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার বদলে আরো বেশি প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ফলাফলে এক বছরে প্রায় ১৪ শতাংশ পয়েন্টের পতন কেন হলো, এ প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

সব মিলিয়ে এবারের ফলাফল নিউইয়র্কের শিক্ষাব্যবস্থার সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। শহরের প্রাথমিক ও মধ্যম স্তরের প্রতি দুই শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় একজন এখনো গ্রেড অনুযায়ী পড়ার দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। আর তৃতীয় শ্রেণির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক। প্রায় ১০ জনের মধ্যে ৬ জন শিক্ষার্থী নির্ধারিত ইএলএ দক্ষতার মানদণ্ডে পৌঁছাতে পারেনি।

তবে এ ফলাফলকে সরাসরি এনওয়াইসি রিডস কর্মসূচির ব্যর্থতার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ এখনই নেই। কারণ কর্মসূচিটি বাস্তবায়নের সময়কাল, শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ড, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রম বাস্তবায়নের মান এবং পরীক্ষার মূল্যায়ন পদ্ধতি, সবকিছুই ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। একইভাবে, এক বছরের ফলাফলের ভিত্তিতে পুরো শিক্ষা সংস্কারকে সফল বলাও যুক্তিযুক্ত হবে না। কিন্তু ফলাফলের এতো বড় পতন, বিশেষ করে তৃতীয় শ্রেণিতে কেন ঘটেছে, সেটি খুঁজে বের করা এখন আর কেবল পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের বিষয় নয়। এটি নিউইয়র্কের শিশুদের ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি নীতিগত প্রশ্ন।নিউইয়র্কের শিক্ষা প্রশাসন এখন বলছে, তারা তথ্যের গভীর বিশ্লেষণ করবে। সেই বিশ্লেষণই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। শিক্ষার্থীরা কি সত্যিই কম শিখছে, নাকি পরীক্ষার ফলাফল শিক্ষার্থীদের শেখার বাস্তব চিত্র পুরোপুরি তুলে ধরছে না? আর যদি শেখার ঘাটতিই প্রকৃত কারণ হয়, তাহলে ‘এনওয়াইসি রিডস’ কি সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারছে? এ প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে নিউইয়র্কের বর্তমান সাক্ষরতা সংস্কার কোন পথে এগোবে।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)