কিয়েটোর কিয়োমিজু-দেরা


হাবিব রহমান , আপডেট করা হয়েছে : 12-08-2026

কিয়েটোর কিয়োমিজু-দেরা

সকালের হালকা রোদে আমি টোকিও স্টেশনে পৌঁছলাম। গাইড নিকিতা আমার জন‍্য অপেক্ষা করছিল। আমরা বুলেট ট্রেনে চেপে কিয়োটোর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ট্রেনের নরম কম্পনের সঙ্গে আমাদের হাসি আর কথাবার্তা মিলেমিশে যেন আনন্দের সুর তুলছিল। 

প্রায় দুই ঘণ্টার ট্রেনযাত্রার পর কিয়োটো পৌঁছলাম। কিয়োটোর পুরোনো শহরটা সকালবেলায় যেন আরো নীরব মনে হচ্ছিলো। হিগাশিয়ামার ঢালু পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, এ পথ শুধু পর্যটকদের জন্য নয়, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইতিহাস নিজেই এই রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেছে। 

হঠাৎ করেই চোখের সামনে ভেসে উঠল কিয়োমিজু-দেরা টেম্পল-কিয়োটোর সবচেয়ে বিখ্যাত ও প্রাচীন বৌদ্ধমন্দিরগুলোর একটি। অষ্টম শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত এ মন্দির শুধু ধর্মীয় আস্থার প্রতীক নয়, জাপানি স্থাপত্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন। ১৯৯৪ সালে এটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হ্যারিচেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, আর সে স্বীকৃতির ওজন অনুভব করা যায় মন্দির প্রাঙ্গণে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই।

নিকিতা জানায় মন্দিরের মূল আকর্ষণ তার বিশাল কাঠের মঞ্চ, যা পাহাড়ের ঢালে ঝুলে আছে অথচ একটিও লোহার পেরেক ব্যবহার করা হয়নি। নিচে তাকালে দেখা যায় সবুজ বন আর দূরে কিয়োটো শহর। এখানে দাঁড়ালে মনে হবে শহরটা আমাদের নিচে শুয়ে আছে। এ মঞ্চ থেকেই এসেছে জাপানের বিখ্যাত প্রবাদ- ‘Kiyomizu no butai kara tobi oriru’, অর্থাৎ জীবনে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস। একসময় মানুষ সত্যিই এখান থেকে লাফ দিত, বিশ্বাস ছিল বেঁচে গেলে ইচ্ছা পূরণ হবে।এখন আর কেউ লাফ দেয় না, কিন্তু সাহসের সেই প্রতীকটা রয়ে গেছে। মন্দিরের ভেতরটা আমরা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। প্রতিটি প্রাচীন চিত্র, কাঠের খোদাই, লণ্ঠন-সবকিছু যেন অতীতের কথা বলছে। নিকিতা বললো, আগে সাহসী মানুষ কিয়োমিজুর প্ল্যাটফর্ম থেকে লাফ দেয়। তুমি পারবে তো? আমি হেসে উত্তর দিই-তোমাকে আমি সঙ্গীহারা করতে চাই না।

দুপুরে আমরা কিয়েটোর একটি ঐতিহ্যবাহী কাফেতে বসে সুশি আর হরিয়ার মতো স্থানীয় খাবার উপভোগ করলাম। মন্দিরের নিচে রয়েছে Otowa ঝরনা। তিন ধারায় নেমে আসা এই জলকে পবিত্র মনে করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই জল পান করলে স্বাস্থ্য, সাফল্য ও দীর্ঘায়ু লাভ হয়। নিকিতা জানায় তিনটি পৃথক প্রবাহে পানি পড়ে, প্রত্যেকটির একটি আলাদা অর্থ। সে এক চুমুক জল নিয়ে হেসে বললো, ‘তিনটার মধ্যে একটাই নেওয়া যায়, লোভ করলে নাকি কাজ হয় না।

আমি জীবনের সৌভাগ্য কামনা করে পানি নিলাম, নিকিতা স্বাস্থ্য কামনা করলো। তারপর আমরা একত্রে জল চুমুক দিলাম। চারপাশে পর্যটক, ক্যামেরার ক্লিক, প্রার্থনার শব্দ। নিকিতা বলে, বসন্তে চেরি ফুল আর শরতে লাল পাতার সৌন্দর্যে কিয়োমিজু-দেরা আরো মোহময় হয়ে ওঠে। এটি শুধু দেখার জায়গা নয়, অনুভব করারও স্থান।

পাহাড়ের ঢালু বেয়ে নামতে নামতে আমাদের চোখে পড়লো মন্দিরের বিশাল কাঠের ওহান্না প্ল্যাটফর্ম। এর নির্মাণশৈলী আমাদেরকে মুহূর্তে অতীতের জাপানে নিয়ে গেল। আমরা ধীরে ধীরে উপরে উঠলাম। প্ল্যাটফর্ম থেকে কিয়োটো শহরের দৃশ্য যেন এক জীবন্ত চিত্রকলা। মন্দিরের ভেতরটা আমরা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। প্রতিটি প্রাচীন চিত্র, কাঠের খোদাই, লণ্ঠন-সবকিছু যেন অতীতের কথা বলছে। 

আমরা Gion-এর ঐতিহ্যবাহী রাস্তায় হাঁটলাম, যেখানে পুরোনো কাঠের বাড়ি, চায়ের ঘর এবং গেইশার ছায়া চোখে পড়ে। বিকালে আমরা আবার Kiyomizu-Dera-তে ফিরে এলাম। এবার মন্দিরের আলো জ্বলে উঠেছে, এবং সূর্যাস্তের সঙ্গে মন্দেরেপ আলোর রঙ মিশে যেন স্বপ্নের আভা তৈরি করছে। শহরের আলোতে আমাদের ছায়া দীর্ঘ হয়ে গেছে। সন্ধ‍্যার ট্রেন ধরেই আমরা টোকিওর পথে রওনা হলাম।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)