ক্রমাগত দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) নেতৃবৃন্দ বলেছেন, জনগণের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা দিতে সরকার ব্যর্থ হলে তার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিণতি সরকারকেই ভোগ করতে হবে। রংপুরে একই পরিবারের চার সদস্যের নৃশংস হত্যাকাণ্ড, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশ আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুর এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচে বাধা দেওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের কার্যকর ভূমিকা অনুপস্থিত।
২৬ আগস্ট মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৫টায় পুরানা পল্টন মোড়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সিপিবি সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দনের সভাপতিত্বে ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য লাকি আক্তারের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, ঢাকা মহানগর উত্তর জেলা কমিটির সভাপতি হাসান হাফিজুর রহমান সোহেল, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর মঈন প্রমুখ।
সিপিবি সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ একই পরিবারের চার সদস্যের লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডে দেশবাসী গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার দুই আসামির আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির খবর এসেছে এবং মামলার তদন্তভার গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো ব্যর্থতা থাকলে তারও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য সম্পর্কে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে সিদ্ধান্তে না গিয়ে সকল দিক খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি।
সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা পুলিশের আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উগ্র গোষ্ঠীর বাধা, পরবর্তী হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পুলিশ লাইনের মতো একটি নিরাপত্তাবেষ্টিত স্থানে আয়োজিত অনুষ্ঠানও যদি হামলা ও ভাঙচুরের শিকার হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অত্যন্ত স্বাভাবিক। তিনি আরও বলেন, সিলেটের বিয়ানীবাজারে সুনাই নদীর দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ বন্ধের দাবিতে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে একটি গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং এ নিয়ে স্থানীয়ভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়াও একই প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ। সংবাদ মাধ্যমে আগামী বছর থেকে নৌকাবাইচ বন্ধের সিদ্ধান্তের খবর এসেছে। নেতৃবৃন্দ বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের নীতি হওয়া উচিত আইন ও নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা, কোনো গোষ্ঠীর চাপের কাছে সাংস্কৃতিক অধিকার সংকুচিত করা নয়।
সমাবেশে সিপিবি নেতৃবৃন্দ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে হত্যা, ডাকাতি, ছিনতাই, চুরি, নারী ও শিশু নির্যাতন, অপহরণ, মব তৎপরতা, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধাদানের ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করেছে। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যদি অপরাধ ও দুর্বৃত্তায়ন কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।
নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির দায় কেবল মাঠপর্যায়ের প্রশাসনের ওপর চাপিয়ে সরকার দায়িত্ব এড়াতে পারে না। অপরাধীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা না করে নিরপেক্ষভাবে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দলীয় ও গোষ্ঠীগত প্রভাবমুক্ত রেখে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের নিরাপত্তা, মর্যাদা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংস্কৃতি চর্চার অধিকার রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কোনো অজুহাত জনগণ মেনে নেবে না।
সমাবেশ থেকে রংপুরের গণপতি চক্রবর্তী পরিবারের হত্যাকাণ্ডসহ সকল হত্যা, ধর্ষণ ও অপরাধের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং সকল দায়ী ব্যক্তির বিচার, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, দেশের সকল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও লোকজ ঐতিহ্যের আয়োজনে নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং নাগরিকের সাংস্কৃতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার দাবি জানানো হয়।