ভুল তথ্য দেয়ার পর জামায়াত নেতা ফেসবুক স্ট্যাটাসে বললেন ‘স্লিপ অফ টাং’


বিশেষ প্রতিনিধি , আপডেট করা হয়েছে : 26-08-2026

ভুল তথ্য দেয়ার পর জামায়াত নেতা ফেসবুক স্ট্যাটাসে বললেন ‘স্লিপ অফ টাং’

গত ২৪ আগস্ট (সোমবার) জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ এক বক্তব্যে দাবি করেন যে বিএনপি সরকারের ৬ মাসে (অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট ২০২৬ সময়কালে) ৫১২ জন গুম হয়েছেন। 

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী ও গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এই বক্তব্যকে “জঘন্য মিথ্যাচার” আখ্যা দিয়ে লেখেন, এই দাবির সময় নাহিদ ইসলামসহ জোট নেতারা পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেও কেউ প্রতিবাদ করেননি। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে জামায়াতের নেতারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মিথ্যা তথ্য প্রচার করেন, আর তাদের জোটসঙ্গী এনসিপিও একই কৌশল রপ্ত করেছে। তিনি জামায়াতের ধর্মীয় পরিচয় তুলে ধরে বলেন, এমন দল “বিসমিল্লাহ বলেও মিথ্যা শুরু করে”।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন অর্থাৎ আযাদের বক্তব্যের সময় বিএনপি সরকারের বয়স প্রায় ৬ মাস। এর আগের শেখ হাসিনা সরকারের আমলে গুমের ব্যাপক অভিযোগ ছিল, যা নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিশন ৩৬ জেলায় গুমের প্রমাণ পেয়েছে এবং গুমের শিকারদের মধ্যে ৭৫% জামায়াত-শিবির ও ২২% বিএনপির বলে জানিয়েছে।

বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে নতুন করে গুমের কোনো ব্যাপক, স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত রিপোর্ট বা মানবাধিকার সংস্থার পরিসংখ্যান আমার অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। এটি মূলত একটি রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি বিবৃতির ঘটনা জামায়াত নেতার একটি সংখ্যাভিত্তিক দাবি এবং সরকারপক্ষের কড়া প্রত্যাখ্যান। ৫১২ সংখ্যাটির সত্যতা যাচাই করতে পারে এমন কোনো স্বাধীন সূত্র (যেমন গুম কমিশন বা মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন) এখনো প্রকাশ্যে আসেনি, তাই এই মুহূর্তে দাবিটি “প্রমাণিত সত্য” বা “প্রমাণিত মিথ্যা” কোনোটিই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোটের সমন্বয়ক ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ গত সোমবার (২৪ আগস্ট) এক প্রেস ব্রিফিংয়ে দাবি করেছেন, ‘বিএনপি সরকারের ৬ মাসে ৫১২ জন ব্যক্তি গুমের শিকার হয়েছেন।’ তার ব্রিফিংয়ের সময় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ ১১ দলীয় ঐক্যজোটের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এর আগে বর্তমান সরকার আওয়ামী লীগের পথেই হাঁটছে উল্লেখ করে বক্তব্য দিয়েছিলেন জামায়াত আমির। 

জামায়াত নেতার দাবিকৃত ওই তথ্যটি নিয়ে ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। যদিও ইতোমধ্যে জামায়াতের সেই নেতা ওই বক্তব্যকে ‘স্লিপ অব টাং’ বলে নিজের ভুল স্বীকার করে ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়েছেন। 

তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সেই বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে বিএনপিকে ‘গুমের সরকার’ বলে প্রচারণা করছেন। এদিকে জামায়াত নেতার ওই বক্তব্যকে মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলে আখ্যায়িত করেছেন বিএনপি নেতারা। তারা বলছেন, এমন মিথ্যাচার কেবল জামায়াতের নেতাদের দ্বারাই সম্ভব। যদিও মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যানুযায়ী, বিএনপি সরকারের ছয় মাসে গুমের কেবল একটিমাত্র ঘটনার অভিযোগ রয়েছে। 

‘জামায়াতের নেতারা বিসমিল্লাহ বলে মিথ্যাচার করে’ 

জামায়াত নেতা হামিদুর রহমান আযাদের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন সংবাদ মাধ্যমে জানান, “জামায়াত একটা গুজব সংগঠন। সেই দলের নেতাকর্মীদের কাজই হচ্ছে গুজব ছড়ানো। তারা মিথ্যাচারের মাত্রা ছাড়িয়েছে। হামিদুর রহমান তার নিকৃষ্ট উদাহরণ। গুমের মতো একটা সেনসেটিভ বিষয় নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে যে মিথ্যাচার করেছে, তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।” 

তিনি বলেন, “হামিদুর রহমানের ওই বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে ফ্যাসিবাদী সরকারের নেতাকর্মীরা বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার ও প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে। এজন্যই আমি সবসময় বলি জামায়াত থাকতে আওয়ামী লীগের দরকার পড়ে না। আওয়ামী লীগের যে মিথ্যাচারের রাজনীতি তা এখন জামায়াত করছে। তাদের নেতারা টুপি খুলে মিথ্যা বলে, সেটিও না হয় সহ্য করা যায়! কিন্তু কিভাবে তারা বিসমিল্লাহ বলে মিথ্যা শুরু করে?” 

তিনি আরও বলেন, “নতুন বন্দোবস্তের দল এনসিপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে গিয়ে ঠিক এইরকম মিথ্যাচার শিখেছে। তারা সরকারের ১৮০ দিনের ব্যর্থতা নিয়ে সম্মেলন করেছে! এনসিপি নেতাদের বক্তব্যও ঠিক হামিদুর রহমান আযাদের মতোই অপতথ্যে ভরপুর থাকে। এজন্যই মানুষজন বলা শুরু করেছে, আত্মবিশ্বাসের সহিত গুজব, মিথ্যা ও প্রপাগাণ্ডা প্রচারে জামায়াত- এনসিপির ইতোমধ্যে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।” 

গুজব ছড়ানোর দায়ে আইনের আওতায় আনার দাবি 

গুজব ছড়িয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার দায়ে জামায়াত নেতা হামিদুর রহমান আযাদকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র আবু হানিফ। তিনি বলেন, “জামায়াত নেতা হামিদুর রহমান কোন সংস্থার জরিপ থেকে এই তথ্য পেলেন এবং আইনশৃঙ্খলার কোন কোন বাহিনী ৫১২ জনকে গুম করেছে তার ঠিক হিসাব কোথায়? গুম হওয়া ৫১২ জন, পরিবারের অভিযোগ কোথায়?” 

আবু হানিফ বলেন, “তার এই বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তার কাছে তথ্য-প্রমাণ থাকলে সেই তথ্য-প্রমাণ জনগণের সামনে হাজির করার দাবি জানাই। যদি কোন তথ্য না থাকে, তাহলে মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন তথ্য ছড়ানোর দায়ে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া উচিত। একই সঙ্গে গুজব ছড়িয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার দায়ে তাকে আইনের আওতায় আনা হোক।” 

তিনি আরও বলেন, “একটা বিষয় মনে রাখা উচিত বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্য আওয়ামী লীগ পুঁজি করে প্রোপাগান্ডা চালাতে পারে। জামায়াতের সেই নেতা কি তাহলে আওয়ামী লীগের পারপাস সার্ভ করার জন্য এই মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে বক্তব্য দিয়েছেন? প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে আওয়ামিলীগের পারপাস সার্ভ করা কি বিরোধী দলের রাজনীতি? যদিও বর্তমান সরকারের আমলে সবচেয়ে আলোচিত গুমের ঘটনা ছিলো, ধর্ষণ মামলা থেকে বাঁচতে শিবির নেতার গুমের নাটক।” 

সমালোচনার মুখে ‘গুম’ নিয়ে দেওয়া বক্তব্যকে অনিচ্ছাকৃত ভুল দাবি 

গুম নিয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে দেওয়া বক্তব্যকে অনিচ্ছাকৃত ভুল দাবি করে ২৬ আগস্ট মঙ্গলবার বিকালে দেওয়া ফেসবুক স্ট্যাটাসে হামিদুর রহমান আযাদ লিখেছেন, “১১ দলীয় ঐক্যের বৈঠক শেষে গতকালের সংবাদ সম্মেলনে আমার বক্তব্য দেওয়াকালীন সময়ে গত ৬ মাসে বর্তমান সরকারের সময়ে হামলা-মামলা, জুলুম-নির্যাতন ও গুম-খুন সংক্রান্ত পরিসংখ্যান বলতে গিয়ে একটি তথ্য অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুলভাবে (শব্দগত-অপহরণের স্থলে গুম) উপস্থাপিত হয়েছে। পরবর্তীতে বিষয়টি যাচাই করে অসঙ্গতিটি আমার নজরে এসেছে। যা ছিল পুরোপুরি অনিচ্ছাকৃত। সংশ্লিষ্ট সবাইকে উক্ত তথ্যটি আমলে না নেওয়া ও এ বিষয়ে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য বিনীতভাবে অনুরোধ করছি।” 

তিনি আরও বলেন, “বর্তমান সরকারের গত ৬ মাসের হামলা-মামলা, জুলুম-নির্যাতন ও গুম-খুনের পরিসংখ্যান উপস্থাপনের সময় ‘অপহরণ’ বলতে গিয়ে ‘স্লিপ অব টাং’-এর কারণে ‘গুম’ শব্দটি উচ্চারিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, আমি ৫১২টি অপহরণের ঘটনার তথ্য উল্লেখ করতে চেয়েছিলাম, যার সূত্র দৈনিক প্রথম আলো, ১৯ আগস্ট ২০২৬। অপহরণের ৫১২ টি ঘটনা সঠিক যা পুলিশ সদর দপ্তরের রিপোর্টেও প্রকাশিত হয়েছে।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)