গুয়াতেমালার উত্তর-পূর্বের ঘন ট্রপিক্যাল রেইনফরেস্ট আর টিকালের মায়ান পিরামিডের রহস্যময় অধ্যায় পেছনে ফেলে আমার পরবর্তী গন্তব্য ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমের পাহাড়ি উপত্যকা-অ্যান্টিগুয়া গুয়াতেমালা (Antigua Guatemala)। ১৯৭৯ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্য (UNESCO World Heritage Site) ঘোষিত এই শহরটি কেবল কোনো দর্শনীয় স্থান নয়, বরং ষোড়শ শতাব্দীর জীবন্ত এক স্প্যানিশ ক্যানভাস।
নিউইয়র্কের ব্যস্ততা ছাড়িয়ে গুয়াতেমালা সিটির লা অরোরা (La Aurora) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যখন পা রাখলাম, বাইরের বাতাসে তখন পাহাড়ি ঠান্ডা আমেজ। পার্কিং স্পেসের কাছে আসতেই চোখে পড়লো একটি মিষ্টি মুখ। উজ্জ্বল রঙের স্থানীয় গুয়াতেমালান পোশাকে দাঁড়িয়ে লুসিয়ান-চটপটে, অপরূপা গাইড। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে সে বললো, নিউইয়র্কের যান্ত্রিক বাতাস পেছনে ফেলে এই মায়াবী উপত্যকায় স্বাগত! আজ তোমাকে নিয়ে যাব সময়ের থমকে যাওয়া এক রূপকথার শহরে।
অ্যান্টিগুয়ার দিকে আমাদের গাড়ি যতই এগোচ্ছিল, চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য ততই বদলাচ্ছিল সবুজের জায়গায় দেখা দিল পাহাড়, বসতি, ছোট ছোট দোকান আর রঙিন বাড়িঘর। লুসিয়ান বললো, তুমি জানো, অ্যান্টিগুয়া একসময় গুয়াতেমালার রাজধানী ছিল? আমি বললাম, তাই নাকি! তাহলে আজ আমরা শুধু একটি শহরে যাচ্ছি না, যাচ্ছি একটি পুরোনো রাজধানীর স্মৃতির ভেতর। লুসিয়ান হেসে বললো, ঠিক তাই। তবে এই শহরকে শুধু ইতিহাস দিয়ে বুঝতে পারবে না। এর রাস্তায় হাঁটতে হবে, মানুষের মুখ দেখতে হবে, গির্জার ঘণ্টা শুনতে হবে।
শহরে ঢুকেই বুঝলাম, লুসিয়ান ঠিকই বলেছিল। অ্যান্টিগুয়া যেন আধুনিক সময়ের মধ্যে আটকে থাকা একটি পুরোনো ছবি। পাথর-বিছানো সরু রাস্তা। দুপাশে রঙিন বাড়ি। কোথাও হলুদ, কোথাও নীল, কোথাও কমলা। পুরোনো গির্জার দেয়ালে সময়ের ক্ষতচিহ্ন। বারান্দায় ফুলের টব। রাস্তা দিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে মানুষ।
কোথাও তাড়াহুড়ো নেই। মনে হলো, এই শহর সময়কে একটু ধীরে চলতে শিখিয়েছে। শহরটিকে ঘিরে প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে তিনটি বিশালাকার আগ্নেয়গিরি-আগুয়া (Volcán de Agua), ফুয়েগো (Volcán de Fuego) এবং আকাতেনাঙ্গো (Volcán de Acatenango)। দূরে ফুয়েগোর চূড়া থেকে ধোঁয়ার হালকা কুণ্ডলী আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে।
শহরে প্রবেশ করতেই গাড়ির চাকা গড়িয়ে চললো পাথরে বাঁধানো প্রাচীন রাস্তায় (Cobblestone streets)। চারপাশে পেস্টেল শেডের হলুদ, গোলাপি আর লাল রঙের স্প্যানিশ উপনিবেশ আমলের একতলা-দোতলা বাড়ি। কাঠের কারুকাজ করা বিশাল দরজা, লোহার গ্রিল আর বারান্দায় ফুটে থাকা উজ্জ্বল বুগেনভিলিয়া ফুল-সব মিলিয়ে যেন ষোড়শ শতকের কোনো ক্যানভাসে পা রাখলাম। লুসিয়ান বললো-১৫৪৩ সালে স্প্যানিশরা এই শহরটি প্রতিষ্ঠা করেছিল। প্রায় দুই শতক ধরে এটি ছিল পুরো মধ্য আমেরিকার রাজধানী। ১৭৭৩ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে শহরটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এর স্থাপত্য আর সৌন্দর্য্য আজও অমলিন।
আমরা হেঁটে গেলাম অ্যান্টিগুয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত প্রতীক-আর্ক অব সান্টা ক্যাটালিনা (Arco de Santa Catalina)-র নিচে। হলুদ রঙের এই ঐতিহাসিক তোরণের পেছনে দূর থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে আগুয়া আগ্নেয়গিরি। লুসিয়ানের সঙ্গে এই খিলানের নিচে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার মুহূর্তটি যেন স্মৃতির ফ্রেমে বন্দি হয়ে রইল। Antigua-তে ঢুকতেই মনে হলো সময় ১৭০০ সালে আটকে আছে। কোবলস্টোনের রাস্তা, হলুদ-লাল বাড়ি, লোহার গ্রিলের জানালা। চারপাশে Parque Central। মাঝে ফোয়ারা। চারদিকে ক্যাথেড্রালের ধ্বংসাবশেষ।
এটা Catedral de Santiago- সে বললো, আঙুল দিয়ে দেখালো। ১৭১৭-এর ভূমিকম্পে ভেঙেছে। আমরা আর বানাইনি। স্মৃতি হিসেবে রেখে দিয়েছি। আমি ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে হাঁটলাম। গাছ গজিয়েছে দেয়ালে। লুসিয়ান বললো, অ্যান্টিগুয়ার সবচেয়ে গভীর অনুভূতিগুলোর একটি লুকিয়ে আছে তার ধ্বংসপ্রাপ্ত গির্জা ও স্থাপনাগুলোর মধ্যে। ভূমিকম্প বহুবার এই শহরকে কাঁপিয়েছে। ভেঙে দিয়েছে গির্জা, ভবন, প্রাসাদ। কিন্তু মানুষ শহর ছেড়ে চলে যায়নি পুরোপুরি। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই জীবন নতুন করে জায়গা করে নিয়েছে। একটি পুরোনো গির্জার সামনে দাঁড়িয়ে লুসিয়ান বললো, আমাদের ইতিহাসে ভূমিকম্পের স্মৃতি খুব গভীর।
আমি ভাঙা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বললাম, প্রকৃতি কখনো কখনো শহর ভেঙে দেয়, কিন্তু মানুষ যদি ফিরে আসে, শহর আবার বেঁচে ওঠে। লুসিয়ান আমার দিকে তাকিয়ে বললো, তুমি দার্শনিকের মতো কথা বলছ। আমি বললাম, দোষটা এই শহরের। দুপুরের রোদের তাপ বাড়তে লুসিয়ান আমাকে নিয়ে গেল সেন্ট্রাল পার্কের (Parque Central) পাশে এক মনোরম রেস্তোরাঁয়। চারপাশে মার্বেলের ঝরনা আর স্প্যানিশ স্থাপত্যের ছায়ায় বসে আমরা উপভোগ করলাম দুপুরের খাবার। পাত্রে ধোঁয়া ওঠা সুস্বাদু কাক’ইক-এটি মায়ান ঐতিহ্যের টার্কি বা ভেড়ার মাংসের এক ধরনের ঝাল-মসলাযুক্ত লাল স্যুপ, যা নরম ভুট্টার টরটিলা ও চালের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। লুসিয়ান আমার প্লেটে একটু লেবু দিয়ে বললো, এটা মায়া আর স্প্যানিশের মিশেল। আমাদের মতোই। খেলাম। ঝালে জিভ জ্বলে, মনে শান্তি।
বিকালে হঠাৎ করেই বৃষ্টি নামল। আমরা ঢুকলাম Café Condesa-তে। ১৮০০ শতকের বাড়ি। কাঠের টেবিল, মোমবাতি। দুই কাপ Antigua Coffee। পৃথিবীর সবচেয়ে মসৃণ কফি। জানালা দিয়ে দেখা যায় Arco de Santa Catalina - হলুদ তোরণ। লুসিয়ান বললো-জানো এই তোরণের নিচে দাঁড়িয়ে অনেকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। আমি বললাম-তাহলে জায়গাটা ভালো। সে হেসে চোখ নামিয়ে নিলো।
সন্ধ্যায় Cerro de la Cruz-এ উঠলাম। পুরো Antigua পায়ের নিচে। সামনে ঋঁবমড় আগ্নেয়গিরি থেকে মাঝে মাঝে ধোঁয়া। লুসিয়ান আমার পাশে দাঁড়িয়ে বললো, সুন্দর না? হ্যাঁ, বললাম, শহরও আর যে দেখাচ্ছে সেও। লুসিয়ান কিছু বললো না। গভীর দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল, তার মায়াবী চোখে বিকেলের রোদের আলো খেলা করছিল।
সূর্য যখন আগ্নেয়গিরির চূড়ার আড়ালে ধীরে ধীরে ঢলে পড়ছে, পুরো অ্যান্টিগুয়া শহর তখন সোনালী আর রক্তিম আলোয় ভেসে যাচ্ছে। ঐতিহাসিক সান ফ্রান্সিসকো গির্জা (Iglesia de San Francisco)-এর প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে প্রাচীন ঘণ্টাগুলোর গম্ভীর ধ্বনি শুনছিলাম। বাতাসে হালকা পাহাড়ি হাওয়ার শিহরণ। লুসিয়ান আমার একটু কাছে ঘেঁষে দাঁড়ালো। তার রেশমি চুলগুলো বাতাসে উড়ছিল।- টিকালের প্রাচীন জঙ্গল থেকে অ্যান্টিগুয়ার এই রঙিন গলি... গুয়াতেমালা কি তোমাকে খুব বেশি আপন করে নিল?-সে আলতো করে জিজ্ঞেস করলো।
আমি তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে উত্তর দিলাম-অ্যান্টিগুয়ার এই ক্বলিস্টোন রাস্তা, শত বছরের পুরনো গির্জা আর আগ্নেয়গিরির দৃশ্য অবশ্যই অপূর্ব, লুসিয়ান। কিন্তু এই শহরের আসল সৌন্দর্য তো ছড়িয়ে আছে তোমার ওই মায়াবী চোখের হাসিতে। তুমি না থাকলে এই রঙিন শহরটা হয়তো কেবল এক নিরুত্তাপ পাথরের জাদুঘর মনে হতো। লুসিয়ান একটু লজ্জায় চোখ নামাল। তারপর মিষ্টি এক হাসি দিয়ে বললো, স্প্যানিশদের তৈরি এই শহরের দেয়ালগুলো নাকি অনেক গোপন প্রেম আর স্মৃতির কথা ধরে রাখতে পারে। জানো, এই শহরে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক আসে, কিন্তু তোমার সঙ্গে কাটানো এই বিকেলটা আমার শহরের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি হয়ে থাকবে। আবার কি দেখা হবে লুসিয়ান? নাকি এই স্মৃতিগুলো কেবল নিউইয়র্কের কনকনে ঠান্ডা রাতে আমার বইয়ের পাতাতেই বন্দি থাকবে?
আমি কিছুটা আবেগঘন কণ্ঠে জানতে চাইলাম। লুসিয়ান আমার হাতের ওপর তার উষ্ণ হাতটি রাখল। তার চোখে তখন গোধূলির আলোর মতোই এক আবেগি আভা। যদি ভাগ্য আমাদের আবার মেলায়, তবে হয়তো অন্য কোনো দেশের অন্য কোনো প্রাচীন শহরে আমাদের কফি খাওয়া হবে। কিন্তু অ্যান্টিগুয়ার এই গোধূলি আর আমাদের এই না, বলা কথাগুলো এই আগ্নেয়গিরির ছায়াতেই চিরকাল থেকে যাবে। বিকাল ৫টা। এয়ারপোর্টে যাওয়ার পথ। গাড়ি আস্তে চলছে। দুজনেই চুপ। গাড়ি ধীরে ধীরে অ্যান্টিগুয়ার পাথরের রাস্তা ছেড়ে এয়ারপোর্টের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। পেছনে রয়ে গেল রঙিন বাড়ি, পুরোনো গির্জা, সান্তা ক্যাতালিনা আর্চ আর আগ্নেয়গিরির ছায়া। আর আমার মনে রয়ে গেল একটি শহর, যে শহর ভূমিকম্পে ভেঙেছে, কিন্তু হার মানেনি। যে শহরের দেয়ালে ক্ষত আছে, অথচ চোখে এখনো সৌন্দর্য। অ্যান্টিগুয়া তাই শুধু গুয়াতেমালার একটি ঐতিহাসিক শহর নয়, এটি সময়ের সঙ্গে মানুষের লড়াই করে টিকে থাকার এক সুন্দর জনপদ।
এয়ারপোর্টে নেমে লুসিয়ান আমার কোটের কলার ঠিক করে দিল। Gracias por venir- আসার জন্য ধন্যবাদ। আমি বললাম, Gracias por mostrarme tu mundo- তোমার পৃথিবী দেখানোর জন্য ধন্যবাদ।
লুসিয়ান আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো, Vuelve. Las monta-as te esperan-ফিরে এসো। পাহাড়গুলো তোমার জন্য অপেক্ষা করবে।
চোখে পানি। আমারও।
আমি গেটের কাছে গিয়ে একটু থেমে পেছনে চাইলাম। দেখলাম খিলানের নিচে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে লুসিয়ান। তার পেছনে নীরব প্রহরীর মতো জেগে আছে সুবিশাল আগ্নেয়গিরি। আমার সঙ্গে থেকে গেল গুয়াতেমালার কফির সুবাস, রঙিন স্প্যানিশ শহরের মোহিনী মায়াজাল, আর একটি বিদায়বেলার না-বলা তীব্র অনুভূতি। প্লেন উড়লো। নিচে Antigua। হলুদ বাড়ি, পাথরের রাস্তা, আর তিনটা আগ্নেয়গিরি। Antigua আমাকে শিখিয়ে গেলো, শহর ভেঙে যায়, কিন্তু সৌন্দর্য ভাঙে না। আর দুদিনের পরিচয়ও কখনো কখনো একটা আগ্নেয়গিরির মতো বুকের ভেতর জ্বলে।