২১ বছর হয়ে গাছে আমাদের অস্ট্রেলিয়ায় প্রবাস জীবনের। ২০০৫
প্রবাসী হওয়ার পর ২০০৯ থেকে করোনার আগে প্রতি বছর অন্তত ২ বছর নানা কাজে নিয়মিত
বাংলাদেশ আসতাম। ২০১৯ থেকে অন্তত একবার এসেছি বাংলাদেশে। অস্ট্রেলিয়া
প্রবাসী এক বাংলাদেশির সঙ্গে এবার ৭ আগস্ট শুক্রবার ব্রিসবেন থেকে চীন হয়ে
বাংলাদেশে এসেছিলাম মূলত গ্যাস বিদ্যুৎ সঙ্কট সময় অনুসন্ধান করতে কিভাবে নিজের
অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কিছুটা কিছু অবদান রাখা যায়। আজ ২১ সেপ্টেম্বর সোমবার। পার হয়ে গেছে ৪৪ দিন। আজ সোমবার ফিরে যাবো প্রশান্ত মহাসাগর পারে আমাদের বর্তমান
ঠিকানায়। অপেক্ষায় আছে প্রিয় মুখ ফাতিমা জোহায়ের। অস্ট্রেলিয়ায় এখন পুস্প শোভিত
বসন্ত কাল।
গত কয়েক সপ্তাহ বিরতিহীন ভাবেই ছুটে বেড়িয়েছি গ্যাস
বিদ্যুৎ সরবরাহ চেনের আনাচে কানাচে। অবহিত হয়েছি নানা সংকট এবং সম্ভাবনার সঙ্গে।
নিবিড় আলোচনা করেছি মাঠ পর্যায়ে কাজ করা কারিগরি কর্মকর্তাদের সঙ্গে , মত বিনিময় করেছি পলিসি মেকার্সদের সাথে, প্রিন্ট মিডিয়ায় লিখেছি ,ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কথা বলেছি। কিছু
পরামর্শ সরকার গ্রহণ করেছে। ৪৪ দিন পরে এখন গ্যাস বিদ্যুৎ পরিস্থিতি অনেকটাই সহনীয়। তবে এখনো
রয়েছে বেশ কিছু সমস্যা। তবে নতুন সরকারকে বর্তমান টার্মে যথেষ্ট সতর্ক এবং
সচেতন মনে হচ্ছে। সরকার পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকার গৃহীত ৫০ এবং ১০০ গ্যাস কূপ
খনন কার্যক্রম অধিকতর বেগবান করার উদ্যোগ নিয়েছে। কয়লা উত্তোলনের কথা ভাবছে ,সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম নিয়ে
এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যুদ্ধ বিগ্রহ এবং ভুরাজনীতির প্রভাবে জ্বালানি বিদ্যুৎ
আমদানি বিশেষত এলএনজি আমদানি পড়েছে সংকটে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র
-ইসরাইল যৌথ বাহিনীর যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় জ্বালানি বাজারে স্মৃতি হয়েছে
অগ্নিমূল্য, হরমুজ প্রনালী
,বাবেল আল
মান্দ জলপথে জাহাজ চলাচল স্থগিত / নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ চেনে সৃষ্টি
হয়েছে অচল অবস্থা। সমন্বিত প্রতিক্রিয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা এখন সঙ্কটাপন্ন।
এবার আমি গ্যাস অনুসন্ধান ,সঞ্চালন, বিদ্যুৎ সঞ্চালন , নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ অবদান বৃদ্ধি এবং জ্বালানি বিদ্যুৎ দক্ষতার
বিষয়ে গবেষণা কার্যক্রম বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করেছি। পরিদর্শন করেছি সিলেটে এসজিএফএল
এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিজিএফসিএল বাস্তবায়নাধীন গ্যাস কূপ খনন কাজ. বিস্তারিত ভাবে
আলোচনা করেছি বাপেক্স, বিজিএফসিএল, এসজিএফএল কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুসন্ধান এবং উন্নয়ন কার্যক্রম
নিয়ে। জিটিসিএল, তিতাস গ্যাস এবং
জালালাবাদ গ্যাস কর্মকর্তাদের সঙ্গেও আলোচনা করেছি গ্যাস সঞ্চালন এবং বিতরণ
ব্যবস্থা নিয়ে। আরপিজিসিএল কর্মকর্তাদের সঙ্গেও আলোচনা করেছি এলএনজি
আমদানির নানা কার্যক্রম নিয়ে।
এক পর্যায়ে জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পীকার খেলার মাঠের অগ্রজ
বন্ধু বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব) হাফিজউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্কাত করেছি, জ্বালানি বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের
প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে মত বিনিময় করেছি। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন ,বাংলাদেশ পাওয়ার এনার্জি রিসার্জ
কাউন্সিলের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। জ্বালানি বিষয়ে কাজ করা
সাংবাদিকদের সঙ্গে নানা বিষয়ে আলাপ হয়েছে।
গাজীপুর ,আশুলিয়া এলাকায় শিল্পাঞ্চলে এবং মেঘনাঘাট এলাকায় সরেজমিনে
উপস্থিত হয়ে গ্যাস বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি দেখেছি। বিদ্যমান পরিস্থিতি উন্নয়ন
সম্ভাবনা অনুধাবন করেছি। বিদ্যুৎ সঞ্চালন এবং বিতরণ ব্যবস্থা নজরদারি করার কাজে
নিয়োজিত পাওয়ার গ্রীড কোম্পানী লিমিটেডের এনএলডিসিতে উপস্থিত হয়ে বিদ্যুৎ
নেটওয়ার্ক পরিচালন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছি।
দীর্ঘ সময় গ্যাস বিদ্যুৎ সরবরাহ চেনের গুরুত্বপূর্ণ সেগমেন্ট
পরিদর্শন, সংশ্লিষ্ট
কারিগরি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার অভিজ্ঞতায় বলতে পারি জ্বালানি নিরাপত্তা এখন
গভীর সংকট কাল অতিক্রম করছে।
দীর্ঘ ৪৪ দিন নিবিড় পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি সংকট উত্তরণ বিষয়ে
সরকারের উপলব্ধি আসলেও ব্যাবস্থাপনা এখনো মূলত আমলা নির্ভর থাকায় উন্নয়নের পথ নকশা
পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন কৌশল এখনো দ্বিধা দ্বন্দ্বের বেড়াজালে জড়িয়ে আছে. নানা
উছিলায় বেশ কয়েকজন দক্ষ যোগ্য কর্মকর্তদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। শীর্ষ
কর্মকর্তাদের মাঝে দ্বিধা আতংক দেখতে পেয়েছি। এমতা বস্তায় দ্রুত জ্বালানি
অনুসন্ধান এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কাংখিত গতি পাচ্ছে না. কিছু কিছু
ক্ষেত্রে সরকারকে ভুল পরামর্শ দিয়ে সিদ্ধান্ত গহনে দ্বিধায় ফেলা হচ্ছে।
বর্তমান সঙ্কটের অন্যতম প্রধান কারণ জ্বালানি ঘাটতি। সেই সূত্রে
প্রয়োজন নিজস্ব জ্বালানি বিশেষত গ্যাস অনুসন্ধান ,উন্নয়ন কার্যক্রম তরান্নিত করা এবং কয়লা
উত্তোলনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ। এই কাজে নিয়োজিত বাপেক্স ,বিজিএফসিএল ,এসজিএফএল সামর্থ অনুযায়ী কাজ করলেও উন্নয়ন
কার্যক্রম ডিপিপি অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ভূমি
অধিগ্রহনের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় ব্যাহত এবং বিঘ্নিত হচ্ছে। এই বিষয়গুলো আমলে নিয়ে
সরকারের উচিত বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের মাদ্ধমে অনুমোদন প্রক্রিয়া সংক্ষিপ্ত করা।
তিতাস গ্যাস ক্ষেত্র এবং হরিপুরের চিকনাগুলে কূপ খনন কাজ
সরেজমিনে পরিদর্শন করে গ্যাস আবিষ্কার বিষয়ে আশাবাদী হয়েছি। তিতাস গ্যাস ক্ষেত্রের
গভীর স্তরে বিশাল গ্যাস ভান্ডার আবিষ্কারের আলামত মিলেছে। সিলেট ১০ এবং ১০X কূপ দুটি থেকেও উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগের
মাদ্ধমে উল্লেখযোগ্য হরে গ্যাস উত্তোলনের সুযোগ আছে. তেল প্রাপ্তির সম্ভাবনা আছে।
আমি দ্রুত ছাতক। টেংরাটিলা এবং একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম
এলাকার চিন্নিত ব্লকে দ্রুত গ্যাস অনুসন্ধানের সুপারিশ করছি। সরকার সম্ভবত
ভোলার গ্যাস সঞ্চালন পাইপ লাইন নির্মাণের মাদ্ধমে বরিশাল হয়ে খুলনায় জাতীয় গ্রীডে
সংযুক্তি বিষয়ে দ্বিধা দ্বন্দে আছে. বিশেষ ব্যাবস্থার মাদ্ধমে জিটিসিএল ৩ বছর সময়ে
গ্যাস সঞ্চালন পাইপ লাইন নির্মাণ করতে সক্ষম। এই কাজে আমার দেশ বিদেশে ব্যাপক
বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে সহায়তা করতে সম্মত আছি।
অন্তর্বর্তী সরকারের ভ্রান্ত নীতির কারণে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি
টার্মিনাল নির্মাণের জন্য সামিট এনার্জির সঙ্গে চুক্তি পুনঃ স্থাপন
করা সরকারের জন্য হতে পারতো চৌকষ সিদ্ধান্ত। যে কোন নতুন উদ্যোক্তার জন্য এই কাজ
করতে ২-৩ বছর সময় লাগবে। সরকার ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো
উপলব্ধি না করেই ২-৩ টি নতুন টার্মিনালের কথা ভাবছে, আইএসও ট্যাংকের মাদ্ধমে এলএনজি আমদানি করতে
চাচ্ছে। বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে মাতারবাড়ি ,মহেশখালী ছাড়া অন্য কোথাও টার্মিনাল স্থাপনের
চিন্তার অবকাশ নেই. এই অবস্থায় মাতারবাড়িতে দ্রুত ল্যান্ড বেসড টার্মিনাল নির্মাণ
কাজ ত্বরান্বিত করা জরুরি। একই সঙ্গে মহেশখালীতে অন্তত একটি ভাসমান টার্মিনাল
দ্রুত স্থাপন করতে হবে. জিটিসিএল মহেশখালী থেকে দ্রুত তৃতীয় সমান্তরাল গ্যাস পাইপ
লাইন পর্যায়ক্রমিক ভাবে নির্মাণ কাজ দ্রুত হাতে নিতে পারে।
আমি খুব নিশ্চিত নোই পেট্রোবাংলার আহবানে সাগরে গ্যাস
অনুসন্ধানে আশাব্যাঞ্জক সাড়া পড়বে কিনা? বাংলাদেশে বিদ্যমান অরাজক পরিস্থিতি এবং মিডিয়ায় নিয়ত ফলাও করে
আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রচারিত সংবাদ কোন যোগ্য বিনিয়োগকারীকে বাংলাদেশে
ঝুঁকি বিনিয়োগ নিতে উৎসাহিত করছে না. দেখা যাক কি হয়. বর্তমান অবস্থায় সাগরের
পাশাপাশি স্থলভাবেও বিদেশী পুঁজি বিনিয়োগের জন্য পিএসসি বিডিডিঙ আহবান করা যেতে
পারে।
পরিশেষে বলবো বাংলাদেশে জ্বালানি বিদ্যুৎ খাতে দক্ষ যোগ্য
কর্মকর্তাদের সংখ্যা খুব সীমিত। এই অবস্থায় সংকীর্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে যোগ্য
কর্মকর্তাদের কোনঠাসা করা হলে সঙ্কট ঘনীভূত হবে। জাতীয় স্বার্থে বিভিন্ন
সংস্থায় চর দখলের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।
আগস্টে এসেছিলাম সেপ্টেম্বরে ফিরে যাচ্ছি আশা নিরাশার মিশ্র
অনুভূতি নিয়ে। ভালো থাকে যেন মায়ের দেশ বাংলাদেশ।