তারেক রহমানকে ‘হেলিকপ্টারে’ পালানোর পথ দেখাচ্ছেন নাহিদ


বিশেষ প্রতিনিধি , আপডেট করা হয়েছে : 23-09-2026

তারেক রহমানকে ‘হেলিকপ্টারে’ পালানোর পথ দেখাচ্ছেন নাহিদ

সংসদে বিরোধী আসনে বসেও রাজপথের চরম ভাষায় কথা বলছে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। সাত মাস বয়সী একটি নির্বাচিত সরকারকে “একদফা”র ভয় আর “পালানোর” খোঁচা দেওয়া নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। 

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লংমার্চ শুরু হয় সকালে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে, শেষ হয় রাতে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে। দুই সমাবেশেই সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারির সুর ছিল এক: চলমান আট দফা যেকোনো সময় একদফায় গড়াতে পারে।

এদিন সকালের উদ্বোধনী সমাবেশে এনসিপি আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে বলেন, তাঁর সামনে দুটি পথ: হেলিকপ্টারে দেশ ছাড়বেন, নাকি সম্মানের সঙ্গে পদত্যাগ করবেন। সিদ্ধান্ত তাঁকেই নিতে হবে। একই বক্তব্যে তিনি বলেন, দফা বাড়ছে, কিন্তু সব দফা শেষ পর্যন্ত এক দফায় ঠেকবে, সেজন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। 

২৮ এপ্রিল ১৯৯৮ সনে জন্ম নেয়া নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বিগত ১৬ বছর আমরা লড়াই করেছিলাম মানবাধিকারের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য। আপনারা (বিএনপি) আমাদের সঙ্গে ছিলেন। এই বিএনপি এখন সরকারে এসে নিজেরাই জনগণের মানবাধিকার হরণ করছে। গণতন্ত্রকে ধ্বংস করছে। ফলে যারা অতীতে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে, তাদের স্থান হয়েছে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে। তারেক রহমানকে নির্ধারণ করতে হবে, তিনি কীভাবে ক্ষমতা থেকে চলে যাবেন। তিনি কি হেলিকপ্টারে করে পালিয়ে দেশ থেকে যাবেন? নাকি সম্মানের সঙ্গে ক্ষমতা থেকে পদত্যাগ করবেন? এরশাদও অনেক সম্মানের সঙ্গে পদত্যাগ করেছিলেন। ফলে তারেক রহমানকে তার যাওয়ার রাস্তা নিজেকেই নির্ধারণ করতে হবে।’

সরকারের সমালোচনা করে এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘এই সরকারের দায়িত্ব ছিল মানবাধিকারের সুরক্ষা দেওয়া। কিন্তু তারা মানবাধিকার হরণের সব ধরনের প্রেক্ষাপট তৈরি করছে। শেখ হাসিনার সরকার জনগণের অধিকার হরণ করেছে যেসব আইন ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, বর্তমান সরকারও ঠিক একই আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহার করা শুরু করেছে।’

লংমার্চের পক্ষে দেশজুড়ে ঐতিহাসিক গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে দাবি করে তিনি আরও বলেন, ‘এই গণজোয়ারকে প্রতিরোধ করার জন্য গতকাল (১৮ সেপ্টেম্বর) রাত থেকে ১১ দলের ব্যানার-ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে এর সঙ্গে সিটি করপোরেশনও যোগ দিয়েছে। কিন্তু ব্যানার-ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলে এই লংমার্চের গণজোয়ার বন্ধ করা সম্ভব হবে না। আমাদের দাবি বাড়ছে এবং শেষ পর্যন্ত সব দফা এক দফায় এসে ঠেকবে।’

উল্লেখ্য, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে এই লংমার্চ করছে ১১ দলীয় জোট। 

যুক্তির জায়গায় উত্তেজনা

“হেলিকপ্টারে পালানো” কথাটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিছক রূপক নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের স্মৃতি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। সেই পরিণতির সঙ্গে সাত মাসের একটি নির্বাচিত সরকারকে তুলনা করার তথ্যভিত্তি কোথায়, বক্তব্যে তা দেখানো হয়নি। হাসিনা ক্ষমতায় ছিলেন ১৫ বছর, ভোটারবিহীন নির্বাচন, গুম-খুন আর গণহত্যার অভিযোগ নিয়ে। বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে সংকট ও ব্যর্থতার অভিযোগ আছে, কিন্তু সেটি জবাবদিহির বিষয়। সরকারপ্রধানকে “পালাবেন কি না” প্রশ্ন করা জবাবদিহি চাওয়া নয়, উসকানি।

প্রথমত, পদ্ধতির প্রশ্ন। বিরোধী দল জবাবদিহি চাইবে, এটা তাদের দায়িত্ব। কিন্তু সরকার বদলের বৈধ পথ নির্বাচন বা সংসদীয় প্রক্রিয়া। সংসদে আসন নিয়ে, বিরোধীদলীয় নেতা ও চিফ হুইপের পদ ভোগ করে, একই সঙ্গে রাজপথে “পদত্যাগ নয়তো পলায়ন” বলাটা স্ববিরোধী। শফিকুর রহমান নিজেই বলেছেন, সংসদে প্রতিবাদ চলবে, সমান্তরালভাবে রাজপথেও আন্দোলন।

দ্বিতীয়ত, সময়ের প্রশ্ন। সাত মাসে সরকারকে সবকিছুর জন্য দায়ী করা কঠিন। বিদ্যুৎ-গ্যাস-সার সংকট, তিস্তা প্রকল্প, দ্রব্যমূল্য, সবই দীর্ঘদিনের জমা সমস্যা। সরকারের ধীরগতি সমালোচনাযোগ্য, কিন্তু সেই সমালোচনা পদত্যাগের দাবিতে গড়ানোর মতো যথেষ্ট কারণ কি না, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

শেষ কথা

বিরোধী দলের কাজ সরকারকে চাপে রাখা, সেই অধিকার গণতন্ত্রেরই অংশ। কিন্তু সাত মাসের সরকারকে “পালাবেন নাকি পদত্যাগ করবেন” প্রশ্নে ঠেলে দেওয়া চাপ নয়, রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা। সংসদ, তথ্য ও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব নিয়ে সরকারকে জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড় করানোই ছিল পরিণত বিরোধী রাজনীতির পথ। উল্টো পথে হাঁটলে জনগণের সহানুভূতি নয়, ক্লান্তিই বাড়বে।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)