টেক্সাসে ইসলাম ও মুসলিমদের নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক এবং বিভিন্ন উদ্যোগের বিরুদ্ধে স্টেটের মুসলিম কমিউনিটির মধ্যে প্রতিবাদ ও নাগরিক তৎপরতা বাড়ছে। শিক্ষা কারিকুলাম, মুসলিম সংগঠন, অভিবাসন এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনায় মুসলিম অধিকারকর্মী, আইনজীবী, ধর্মীয় নেতা ও সাধারণ বাসিন্দারা সভা, বিক্ষোভ, আইনি পদক্ষেপ এবং আন্তঃধর্মীয় জোট গড়ে তুলছেন। জুনে টেক্সাস স্টেট বোর্ড অব এডুকেশনের একটি দীর্ঘ শুনানিতে প্রায় ৫০০ মানুষ অংশ নেন। সেখানে প্রস্তাবিত সামাজিক বিজ্ঞান কারিকুলাম নিয়ে মতামত দেন তারা। মুসলিম শিক্ষক ইনশিরা দাহের বোর্ডের সামনে বক্তব্য রেখে বলেন, শিক্ষার্থীদের তথ্য ও মতামতের মধ্যে পার্থক্য বোঝার মৌলিক দক্ষতা শেখানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তার অভিযোগ ছিল, এর পরিবর্তে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শুনানিতে কিছু মুসলিম ও আন্তঃধর্মীয় সংগঠনের প্রতিনিধিরা কারিকুলামের সমালোচনা করেন। অন্যদিকে কিছু অংশগ্রহণকারী নো শরিয়া অ্যালাউড লেখা টুপি পরে উপস্থিত হন। রিপাবলিকান পার্টির স্থানীয় নেতা টনি রবার্টসন বোর্ডের কাছে শরিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং দাবি করেন, কারিকুলাম প্রত্যাখ্যান করা না হলে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের পরিবর্তে ইসলামি আইন প্রতিষ্ঠার পথ খুলে যেতে পারে। এ ধরনের দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
টেক্সাস স্টেট বোর্ড অব এডুকেশন ২৬ জুন নতুন সোশ্যাল স্টাডিজ স্ট্যান্ডার্ড অনুমোদন করে। সরকারি নথি অনুযায়ী, নতুন মানদণ্ডে ইসলাম ও ইসলামের ইতিহাস, ইসলামি সভ্যতা, মধ্যযুগের ইউরোপ এবং বিভিন্ন ধর্ম ও সভ্যতার বিকাশ নিয়ে পাঠ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ডালাসের আইনজীবী নূর ওয়াদি বলেন, মুসলিমদের এখন নিজেদের অধিকার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাধীনতা রক্ষায় সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। তার ভাষায়, এ বিষয়ে কিছু না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আগের মতো একই স্বাধীনতা নাও পেতে পারে।
টেক্সাসের মুসলিম কমিউনিটির রাজনৈতিক অংশগ্রহণও গত এক দশকে বেড়েছে বলে অধিকারকর্মীরা উল্লেখ করেছেন। কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনসের টেক্সাস শাখার অন্তর্বর্তী নির্বাহী পরিচালক মুস্তাফা ক্যারল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসী মুসলিম কমিউনিটির একটি বড় অংশ রাজনীতি থেকে দূরে থেকেছে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো অনেককে প্রকাশ্যে নাগরিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করেছে।
টেক্সাসে মুসলিম জনসংখ্যা কয়েক লাখ বলে বিভিন্ন হিসাব রয়েছে। স্টেট মুসলিমদের পরিচালিত বহু মসজিদ রয়েছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুসলিমরা স্থানীয় ও রাজ্য পর্যায়ের নির্বাচিত পদেও এসেছেন। ২০২২ সালে প্রথমবারের মতো দুই মুসলিম স্টেট আইনপ্রণেতা নির্বাচিত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মুসলিম কমিউনিটির সক্রিয়তার একটি বড় পরীক্ষা শুরু হয় ২০২৫ সালে ইপিক সিটি নামে একটি মুসলিমকেন্দ্রিক আবাসন প্রকল্পের পরিকল্পনাকে ঘিরে। উত্তর টেক্সাসের ৪০২ একর জমিতে প্রস্তাবিত প্রকল্পটি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়। গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট প্রকল্পটি নিয়ে একাধিক স্টেট সংস্থাকে তদন্তের নির্দেশ দেন। পরে প্রকল্পটির নাম পরিবর্তন করে দ্য মিডো’ রাখা হয় এবং একটি কাউন্টি বিচারক ফেয়ার-হাউজিং আইন মেনে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেন। রাজ্য কর্তৃপক্ষ ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছে।
মুসলিম অধিকারকর্মীদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লড়াই হয়েছে টেক্সাসের স্কুল ভাউচার কর্মসূচি নিয়ে। শুরুতে অনুমোদিত তালিকা থেকে কয়েকটি ইসলামিক স্কুল বাদ পড়ার পর তিনটি ইসলামিক স্কুল ও মুসলিম অভিভাবকদের একটি দল মামলা করে। আদালত রাজ্য কর্তৃপক্ষকে স্কুলগুলোকে কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়ার পর তারা অনুমোদন পায়।
এদিকে মুসলিম অধিকারকর্মীরা অভিবাসন নিয়েও সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। ডালাসের মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্য মারওয়ান মারুফকে ২০২৫ সালে আইসিই আটক করার পর তার মুক্তির দাবিতে স্থানীয় কর্মী ও আইনজীবীরা বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। পরে তাকে জর্ডানে ফেরত পাঠানো হয়। একই সময়ে মুসলিম শিল্পী ও কর্মী ইয়াকুব ইরা ভিজান্দ্রেকে আইসিই আটক করে; তার মামলা এখনো আদালতে চলমান।
মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন কেয়ারকে নিয়ে টেক্সাসের গভর্নর কার্যালয়ের পদক্ষেপও বিতর্ক তৈরি করেছে। কেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে এবং সংগঠনটির বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের সাংবিধানিক ও আইনি বৈধতা আদালতে চ্যালেঞ্জ করেছে।টেক্সাসের মুসলিম আইনজীবীরাও নিজেদের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়েছেন। ডালাস-ফোর্ট ওয়ার্থ মুসলিম বার অ্যাসোসিয়েশনের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে প্রায় ১৫০ মুসলিম আইনজীবী বিভিন্ন মামলা ও আইনি কৌশল নিয়ে তথ্য বিনিময় করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজ্য পর্যায়ে ‘শরিয়া’ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও অব্যাহত রয়েছে। মুসলিম রাজ্য প্রতিনিধি সালমান ভোজানি এবং সুলেমান লালানি ধর্মীয় স্বাধীনতা ও আন্তঃধর্মীয় সংলাপ নিয়ে পৃথক ককাস গঠন করেছেন। জুনে ভোজানি সান অ্যান্টোনিও ও হিউস্টনে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদি, হিন্দু ও জরথুস্ত্রীসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ অংশ নেন।
মুসলিম নেতারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা শুধু নিজেদের কমিউনিটির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে অন্য ধর্মীয় ও নাগরিক সংগঠনের সঙ্গে জোট গড়ার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন। আইনজীবী মারিয়াম উদ্দিন বলেন, সরকারি বা রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির চরিত্র সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হলে তা সংশোধনে আইনি ও সামাজিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো জরুরি।
টেক্সাসে ইসলাম ও মুসলিমদের নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত থাকায় মুসলিম কমিউনিটির পক্ষ থেকেও আদালত, শিক্ষা বোর্ড, সিটি কাউন্সিল ও জনপরিসরে অংশগ্রহণ বাড়ছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হিসেবে তারা ধর্মীয় স্বাধীনতা, সমান অধিকার এবং নিজেদের বক্তব্য সরাসরি তুলে ধরার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।