১৪ জুলাই ২০১২, রবিবার, ০৯:৫৬:২২ পূর্বাহ্ন


সফলভাবে হরতাল-অবরোধে বিব্রত আ.লীগ
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ০১-১১-২০২৩
সফলভাবে হরতাল-অবরোধে বিব্রত আ.লীগ অবরোধে বিএনপির মিছিল/ছবি সংগৃহীত


বিএনপি’র সারাদেশে সফলভাবে হরতালের পাশাপাশি অবরোধ কর্মসূচি পালিত হওয়ার খবরে দেশে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে আওয়ামী লীগ হাই কমান্ড। আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড মনে করে, বিএনপি’র ডাকে হরতাল সফল করে তোলার পেছনে আওয়ামী লীগের নিরব ব্যর্থতা রয়েছে। অন্যদিকে হরতালের পরে অবরোধ কর্মসূচির প্রথম দিনেই বিএনপি’র সফলতায় আওয়ামী লীগে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সাংগঠনিক ব্যর্থতার পাশাপাশি জনসম্পৃক্ততা কমে আসায় আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মাঠে বিএনপি ডাকে এসব কর্মসূচি সফলভাবেই পালন করতে পারছে। এমনটাই মনে করে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড।

বিএনপিসহ দলটির সাথে সমমনারা সারা দেশে হরতাল ডেকেছিল ২৯ আক্টোবর। এতে সংহিসতায় নিহত ৪ জন। আর আহত অর্ধশতাধিক। এর পর ডাকা হয়েছে সারাদেশে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো সারাদেশে তিন দিনের সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচি। গত ৩১ অক্টোবর মঙ্গলবার থেকে এই কর্মসূচি শুরু হয়েছে এই সড়ক, নৌ ও রেলপথ এই অবরোধ। এটি ২ নভেম্বও বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চলবে। দু’টি কর্মসূচির বেলাতেই একেবারে শেষ সময়ে জামায়াতও তাদের অংশ নেয়ার কথা ঘোষণা দেয়। 

কেমন হলো হরতাল 

গত ২৯ অক্টোবর  সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছিল বিএনপি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নয়াপল্টনে ২৮ অক্টোবরে মহাসমাবেশ স্থগিত করে হরতালের ঘোষণা দিয়েছিলেন। নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ২৮ অক্টোবর শনিবার দুপুরে হ্যান্ডমাইকে হরতালের ঘোষণা দেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশি তান্ডবের প্রতিবাদে সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। পরে বিএনপি’র সাথে যুগপৎ আন্দোলন থাকা গণতন্ত্র মঞ্চসহ অন্যান্যরা এই কর্মসূচিতে একাত্মতা ঘোষণা করে। তবে জামায়াতে ইসলামী দলটি একেবারে শেষে দিকে তাদের মতো করে ডাকে হরতাল। দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা, সংঘাত, সংঘর্ষ, গুলি ও পুলিশের গাড়িসহ যানবাহনে অগ্নিসংযোগের মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে বিএনপিসহ সমমনাদের ডাকে এই হরতাল। গণমাধ্যমের খবরে দেখা গেছে রোববার সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতালে কোথাও কোথাও সড়ক অবরোধ হয়েছে। মাত্র কিছু জায়গায় হরতাল সমর্থক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, প্রতিরোধ ও পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে চারজনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। গ্রেফতার করা হয়েছে বিএনপি’র সহস্রাধিক নেতাকর্মীকে। 

নিরবেই জনসমর্থন পেলো বিএনপি’র ডাকা হরতালে

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শাসনামলে টানা ১৫ বছরের মধ্যে বিএনপি’র এই ২৯ অক্টোবর সকাল-সন্ধ্যা হরতালটি ছিল সম্পূর্ণ ব্যাতিক্রমধর্মী। এই হরতালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্কাবস্থানের মধ্যেও রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছেন বিএনপি-জামায়াতকর্মীরা। বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা কয়েকটি দল ও জোট পৃথকভাবে কর্মসূচি পালন করেছে। অবাক করে দেয় সকলকে কারণ এদিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সড়কে ছিল গণপরিবহণ সংকট। ব্যক্তিগত গাড়ি এড়িয়ে চলেছেন অনেকে। এতে চিরচেনা যানজটের শহর ঢাকা ছিল অনেকটাই ফাঁকা। বন্ধ ছিল কিছু কিছু এলাকার দোকানপাট। ভোগান্তিতে পড়েন অফিসগামী মানুষ। অনেকেই প্রকাশ্যেই বলেছেন, এমন হরতাল গত ১৫ বছরে দেখা যায়নি। কেউ কেউ বলেছেন এমন হরতাল সরকারকে আসলে অন্যরকম মেসেজ দিচ্ছে। তাদের মতে, বিএনপি নিরবে হয়তবা জনগণের অনেক সমর্থন পেয়ে গেছে। 

একিই রকম অবস্থা অবরোধে

রোববার সারাদেশে হরতাল কর্মসূচি শেষে সন্ধ্যায় বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি জানান, বিএনপি ও সমমনা দলগুলো সারাদেশে তিন দিনের সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এমন কর্মসূচিও পালিত হচ্ছে স্বতঃস্ফুর্তভাবে। এমনটাই দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে। 

যে কারণে বিব্রত আওয়ামী

বলা হয় যে, গত রোববার হরতাল কর্মসূচিতে রাজপথ ছিল আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায় বিএনপিসহ সমমনা দলগুলোর ডাকা হরতাল ‘প্রতিরোধে’ মোড়ে মোড়ে লাঠি হাতে ছিল দলটির নেতাকর্মীরা। কিন্তু এর বিপরীতে বিএনপিসহ সমমনারা মাত্র কয়েকটি স্থানে ঝটিকা পিকেটিং করেছে। খোদ রাজধানীতে কয়েকটি জায়গা ছাড়া হরতালের সমর্থনে তেমন একটা তৎপরতা ছিল না বিএনপিসহ সমমনাদের। কিন্তু যে যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেনো রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বিএনপি’র ডাকে হরতাল কর্মসূচি সফলই হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বিএনপি’র ডাকা টানা তিনদিনের অবরোধে আওয়ামী লীগের ভূমিকা কি ছিল? কোথায় কি রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়েছে আওয়ামী লীগ? বিভিন্ন স্থানে অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে দেখা গেছে, তাদের ভূমিকায় কোনো কাজই হয়নি বা তারা জনগণকে বিএনপি অবরোধের বিরুদ্ধে বোঝাতেও সক্ষম হয়নি । তবে অনেকে মনে করেছে বিএনপি অবরোধ যে এভাবে সফলভাবে পালিত হবে তা আওয়ামী লীগের ধারণায় ছিল না। আর একারণে বিএনপি’র অবরোধ কর্মসূচি ঠেকাতে পুরো প্রশাসনের ওপরেই আওয়ামী লীগকে নির্ভর করতে হচ্ছে, যা দলের জন্য বিব্রতকর বলে আলোচিত হচ্ছে সর্বত্র। অথচ আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা বিএনপি’র উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, এই দল (বিএনপি) কখনো জনগণের মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না।’ তিনি মনে করেন, সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির ২৮ অক্টোবর (শনিবার) ছিল সর্বশেষ মহড়া। সেই মহড়ায় ১৫ মিনিট টিকতে পারেনি বিএনপি। তাদের মাজা ভেঙ্গে গেছে। সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সুযোগ আর বিএনপি পাবে না। যতই হরতাল দিক আর অবরোধ দিক। এবার বিএনপি হবে মুসলিম লীগ। বিএনপি এমন একটি দল, কর্মসূচি দেয় কিন্তু রাজপথে থাকতে পারে না। কিন্তু বিএনপি’র ডাকে অবরোধ কর্মসূচি ঠেকাতে আওয়ামী লীগের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিই চোখে পড়েনি। এব্যাপারে আওয়ামী লীগের একজন নেতা এই প্রতিনিধিকে বলেন, অবরোধ ডাকা হয়েছে সারাদেশে। এটা ঢাকায় ডাকা মহা সমাবেশ না। আর সারা দেশে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা এখন অনেক কাহিল। একে অপরের সাথে কোনো যোগাযোগ নেই। গত ১৫ বছরে নেতাদের সাথে কর্মীদের যোগাযোগ নেই বরং দূরত্ব বেড়েছে মারাত্মকভাবে। ফলে রাজনৈতিকভাবে অবরোধ ঠেকাতে আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের উদ্ধুদ্ধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আর এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি’র অবরোধ কর্মসূচি ঠেকাতে প্রশাসনের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে আওয়ামী লীগকে, যা দলের জন্য খুবই বিব্রকবর।

শেয়ার করুন