অভিযুক্ত পিটার মাইকেল লারসেন ও গুরুতর আহত ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম কর্মী সৈয়দ সোহাইল উদ্দিন
যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষ ও ঘৃণাপ্রসূত সহিংসতার আরেকটি নৃশংস ঘটনা ঘটেছে উটাহ স্টেটে। ওয়েস্ট ভ্যালি সিটির ভ্যালি ফেয়ার মলে কর্মরত ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম কর্মী সৈয়দ সোহাইল উদ্দিনকে ধর্মীয় পরিচয় নিশ্চিত করার পর প্রকাশ্যে ১৫ বারেরও বেশি ছুরিকাঘাত এক দুর্বৃত্ত। তদন্তে নেমে পুলিশ বলছে, হামলাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত এবং স্পষ্টভাবে মুসলিমবিদ্বেষপ্রসূত। আদালতে দাখিল করা নথি অনুযায়ী, অভিযুক্ত পিটার মাইকেল লারসেন স্বীকার করেছেন যে তিনি সোহাইলকে মুসলিম হওয়ার কারণেই হত্যা করতে চেয়েছিলেন এবং মলে মুসলমানদের হত্যা করে অন্যদেরও একই ধরনের হামলায় উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন।
গত ১৩ জুলাই দুপুর আড়াইটার দিকে উটাহর ওয়েস্ট ভ্যালি সিটির ভ্যালি ফেয়ার মলের একটি জুয়েলারি কিয়স্কে কর্মরত ছিলেন সৈয়দ সোহাইল উদ্দিন। প্রত্যক্ষদর্শী ও আদালতের নথি অনুযায়ী, ৪৮ বছর বয়সী পিটার মাইকেল লারসেন প্রথমে সোহাইলের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলা শুরু করেন। তিনি জানতে চান, সোহাইল কোথা থেকে এসেছেন। উত্তরে তিনি জানান, তিনি ভারতের বাসিন্দা। এরপর লারসেন জানতে চান তিনি মুসলিম কি না। সোহাইল ‘হ্যাঁ’ বলার পর অভিযুক্ত একটি পানির বোতল চান। সোহাইল বোতল আনতে ঘুরে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই লারসেন পেছন থেকে ছুরি বের করে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে শুরু করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, হামলাকারী সোহাইলকে ১৫ বারেরও বেশি ছুরিকাঘাত করে। তার পেট, বুক, হাত, পিঠ, হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসসহ শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে গুরুতর আঘাত লাগে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে ঘটনাস্থলেই তিনি লুটিয়ে পড়েন। দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা একাধিক জরুরি অস্ত্রোপচার করেন। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তিনি এখনও সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন এবং আরো অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাধারণ মানুষের সাহসিকতায় আরো বড় ট্র্যাজেডি এড়ানো সম্ভব হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাকারীকে থামানোর জন্য তারা চেয়ার, জুতা ও আশপাশের বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে মারতে থাকেন। পরে কয়েকজন ঝাঁপিয়ে পড়ে তার হাত থেকে ছুরি কেড়ে নেন এবং মাটিতে চেপে ধরে রাখেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে লারসেনকে গ্রেফতার করে। হামলাকারীকে আটকের সময় উপস্থিত ব্যক্তিদের ঘুষিতে তার মাথায় আঘাত লাগে এবং চিকিৎসা শেষে তাকে সল্ট লেক কাউন্টি জেলে নেওয়া হয়।
স্থানীয় একটি দোকানের কর্মী অ্যান্ডি রোমেরো বলেন, হঠাৎ চিৎকার ও মানুষের দৌড়াদৌড়ি দেখে তিনি বুঝতে পারেন ভয়াবহ কিছু ঘটেছে। মানুষকে এভাবে আতঙ্কিত হয়ে দৌঁড়াতে দেখলে আমাদের দোকানের গেট বন্ধ করে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার নির্দেশনা থাকে। এমন পরিস্থিতিতে কেউই পড়তে চায় না। এটি ছিল অত্যন্ত ভয়ঙ্কর একটি অভিজ্ঞতা, বলেন তিনি। গত সাত বছর ধরে ভ্যালি ফেয়ার মলে কাজ করা রোমেরো স্মরণ করেন, কয়েক বছর আগে একই মলে একটি গোলাগুলির ঘটনাও ঘটেছিল। তার ভাষায়, সেই আতঙ্কের স্মৃতি এখনও ভুলতে পারিনি। এবারও একই রকম ভয় ফিরে এসেছে।
সোহাইলের সহকর্মী লুনা নুনেজ বলেন, হামলাকারী এতোটাই উন্মত্তভাবে ছুরিকাঘাত করছিল যে তিনি ভেবেছিলেন সোহাইল আর বাঁচবেন না। তিনি বলেন, আমি যা হাতে পেয়েছি তাই ছুড়ে মারছিলাম। লোকটি এতো নির্মমভাবে আঘাত করছিল যে মনে হচ্ছিল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মানুষটি মারা যাবেন।
সল্ট লেক কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, গ্রেফতারের পর লারসেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কাছে হামলার কথা স্বীকার করেন। তিনি জানান, আগের একটি সাক্ষাতের মাধ্যমে তিনি জানতেন যে সোহাইল একজন মুসলিম। আদালতের নথি অনুযায়ী, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে মলে গিয়ে মুসলমানদের হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিলেন এবং এ হামলার মাধ্যমে অন্যদেরও যুক্তরাষ্ট্র থেকে মুসলমানদের সহিংসভাবে বিতাড়িত করার মতো কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। তদন্তকারীদের কাছে তিনি আরো বলেন, তিনি মুসলমানদের হত্যা করতে চান এবং নিজেকে একটি সহিংস আন্দোলনের ‘ক্যাটালিস্ট’ বা প্ররোচনাকারী হিসেবে দেখেন।
এ বক্তব্যের ভিত্তিতে সল্ট লেক কাউন্টি প্রসিকিউটর স্যাম গিল আদালতে লারসেনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে হত্যা চেষ্টার গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করেন। প্রসিকিউটর আদালতকে জানান, অভিযুক্ত জননিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং তার সহিংস মতাদর্শ ও পূর্বপরিকল্পিত হামলার কারণে তাকে জামিন দিলে সমাজের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হবে। আদালত তাকে জামিন ছাড়াই আটক রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
আদালতের নথিতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, লারসেনের বিরুদ্ধে অতীতেও সহিংসতার ইতিহাস রয়েছে। ২০২২ সালে তিনি নিজের সম্পত্তিতে আগুন লাগিয়ে অগ্নিনির্বাপক কর্মী ও পুলিশ কর্মকর্তাদের শটগান দিয়ে হুমকি দিয়েছিলেন। ওই ঘটনায় কারাদণ্ড ভোগের পর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি প্যারোলে মুক্তি পান। তদন্তকারীদের মতে, অতীতের এই সহিংস আচরণ বর্তমান হামলার ঝুঁকি মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সোহাইল উদ্দিনের পরিবার জানিয়েছে, তিনি স্ত্রী ও দুই ছোট সন্তানের একমাত্র উপার্জনকারী। তার কোনো স্বাস্থ্যবীমা নেই। চিকিৎসার বিপুল ব্যয় বহন করা পরিবারের পক্ষে সম্ভব না হওয়ায় একটি অনলাইন তহবিল সংগ্রহ অভিযান শুরু করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সোহাইলের হাত, হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসে জটিল অস্ত্রোপচার হয়েছে এবং সামনে দীর্ঘ পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
জুয়েলারি কিয়স্কের মালিক আদনান মোহাম্মদ বলেন, তিনি শুধু পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার জন্য কাজ করছিলেন। একজন মানুষকে হত্যা করার চেষ্টা মানে শুধু একজনকে নয়, একটি পুরো পরিবারকে ধ্বংস করার চেষ্টা। আমাদের সমাজে ঘৃণা ও ধর্মীয় বিদ্বেষের কোনো স্থান নেই।
ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম অধিকারবিষয়ক সংগঠন ইউটাহ মুসলিম সিভিক লীগ আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে হামলার তীব্র নিন্দা জানায়। সংগঠন দুটি সল্ট লেক কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়েরকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, এটি স্পষ্টভাবে মুসলিমবিদ্বেষপ্রসূত সন্ত্রাসী হামলা। তারা জানায়, হামলার উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করা এবং ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়া।
ইউটাহ মুসলিম সিভিক লীগ আরো জানিয়েছে, তারা এমন একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করেছে, যা অভিযুক্তের নামের সঙ্গে মিলে যায় এবং সেখানে মুসলমানদের বিরুদ্ধে চরম বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য ও বিভিন্ন উগ্র ডানপন্থী মতাদর্শের সমর্থনে একাধিক পোস্ট পাওয়া গেছে। তদন্তকারীরা এসব পোস্টও তদন্তের আওতায় এনেছেন।
এ হামলা এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণাপ্রসূত অপরাধ, অনলাইন উগ্রবাদ এবং ধর্মীয় বিদ্বেষ নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ঘৃণামূলক বক্তব্যকে গুরুত্বের সঙ্গে প্রতিহত না করলে এ ধরনের সহিংস হামলা ভবিষ্যতে আরো বাড়তে পারে। তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং নতুন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত অভিযোগ আনার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না প্রসিকিউটররা।