৬ মার্চ ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০২:০৭:৪৩ পূর্বাহ্ন


ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ভ্রমণ
আগুন ও বরফের রাজ্যে একদিন
হাবিব রহমান
  • আপডেট করা হয়েছে : ১১-০৩-২০২৬
আগুন ও বরফের রাজ্যে একদিন আইসল্যান্ডে বাসের সামনে লেখক


উত্তর আটলান্টিকের বুক চিরে যখন বিমানের জানালায় প্রথম ধরা দিলো বরফঢাকা এক বিশাল ভূখণ্ড, তখনই বুঝেছিলাম-এ সফর অন্যরকম হতে চলেছে। এবার আমার গন্তব্য আইসল‍্যান্ড। প্রকৃতির নাট্যমঞ্চ, যেখানে আগ্নেয়গিরি ও হিমবাহ পাশাপাশি বাস করে।

রেইকিয়াভিক থেকে দীর্ঘ ড্রাইভ শেষে আমি পৌঁছলাম সেই বিস্ময়ের দরজায় Vatnajkull National Park। ২০১৯ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা পাওয়া এই জাতীয় উদ্যান শুধু একটি ভ্রমণস্থল নয়; এটি পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক নাটকের এক জীবন্ত অধ্যায়।

গাড়ি থেকে নামতেই ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগলো-স্বচ্ছ, কাঁপুনি ধরানো, অথচ অদ্ভুত নির্মল। একই সময়ে আমার নাম লেখা প্লাকার্ড হাতে নিয়ে দেখা করলো গাইড-আনা। হালকা নীল জ্যাকেট, তুষারের মতো স্বচ্ছ হাসি, আর কণ্ঠে নরম সুর। সে হাত বাড়িয়ে বললো, Welcome to the land where fire sleeps under ice.

আনার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে আমি এগোলাম ভাটনাইয়োকুল হিমবাহের দিকে। দূরে যতটা শান্ত মনে হচ্ছিলো কাছে গিয়ে মনে হলো ততটাই মহাকাব্যিক। আনা বললো, এটি ইউরোপের বৃহত্তম গ্লেসিয়ার। আইসল্যান্ডের প্রায় ৮ শতাংশ এলাকা ঢেকে রেখেছে। বরফের বিশাল চাদর সূর্যের আলোয় নীলচে ঝিলিক দিচ্ছিল। কোথাও বরফের গুহা, কোথাও কালো আগ্নেয় ছাইয়ের দাগ-প্রকৃতি এখানে যেন নিজেই শিল্পী।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, এখানে আগ্নেয়গিরিও আছে?

আনা হেসে মাথা নেড়ে বললো, হ্যাঁ। এ বরফের নিচেই ঘুমিয়ে আছে কয়েকটি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি। তাই আমরা বলি, আইসল্যান্ড হলো fire and ice-এর দেশ। আনার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে আমরা প্রবেশ করলাম, একটি প্রাকৃতিক আইস কেভে। ভেতরে ঢ়ুকতেই মনে হলো নীল কাচের ভেতর দাঁড়িয়ে আছি। আলো বরফের স্তর ভেদ করে এসে এক অপার্থিব আভা তৈরি করেছে। আনা বললো, এ গুহাগুলো স্থায়ী নয়। প্রতি বছর নতুন গুহা তৈরি হয়, পুরোনো ভেঙে যায়। প্রকৃতি এখানে সব সময় কাজ করে যাচ্ছে। তার কথায় আমি উপলব্ধি করলাম, এখানে সৌন্দর্য মানেই ক্ষণস্থায়িত্ব।

গুহার নীরবতায় দাঁড়িয়ে আমাদের দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিলো। বাইরে হিমেল বাতাস বইছে, আর ভেতরে সময় যেন জমে আছে। পার্কের ভেতর ড্রাইভ করতে করতে আনা আমাকে দেখালো আগ্নেয় লাভার প্রাচীন ক্ষেত্র, হিমবাহগলিত নদী, আর দূরের জলপ্রপাত। সে বললো, ভাটনাইয়োকুল শুধু একটি গ্লেসিয়ার নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ভূতাত্ত্বিক ল্যাবরেটরি।

এখানে কয়েক কিলোমিটারের মধ্যেই তুমি দেখতে পাবে হিমবাহ, আগ্নেয়গিরি লাভাক্ষেত্র, হিমবাহ-নির্মিত নদী এবং বরফগুহা। বলতে পারো পৃথিবীর বিবর্তনের এত জীবন্ত পাঠ এক জায়গায় বিরল। বিকেলের দিকে আমরা একটি ভিউপয়েন্টে থামলাম। সামনে অনন্ত সাদা, দূরে নীল বরফ, আকাশে ধীরে ভেসে চলা মেঘ। আনা পাশে দাঁড়িয়ে নরম গলায় বললো, People come here for photos… but they remember the silence.

কথাটা শুনে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। সত্যিই এ নীরবতার মধ্যে এক অদ্ভুত রোমান্স আছে। শহরের কোলাহল থেকে বহু দূরে, প্রকৃতির বিশালতার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ নিজেকে নতুন করে চিনতে শেখে। হালকা বাতাসে আনার চুল উড়ছিল। সে দূরের হিমবাহের দিকে তাকিয়ে ছিল। আর আমি ভাবছিলাম-ভ্রমণের আসল সৌন্দর্য হয়তো দৃশ্যে নয়, মুহূর্তে লুকিয়ে থাকে। ফেরার সময় সূর্য ধীরে নেমে যাচ্ছিল দিগন্তে। বরফের ওপর পড়া সোনালি আলো পুরো ভাটনাইয়োকুলকে এক স্বপ্নময় আভায় ঢেকে দিচ্ছিলো। আনা বিদায় জানিয়ে বললো, Next time, come in winter. The northern lights dance above the glacier.

গাড়ি দূরে এগিয়ে যেতে যেতে আমি শেষবারের মতো ফিরে তাকালাম। বরফের সেই বিশাল নীরব রাজ্য তখনো দাঁড়িয়ে অপরিবর্তিত, অনন্ত এবং মহিমান্বিত।

শেয়ার করুন