০৪ মার্চ ২০২৬, বুধবার, ০৭:২১:০৩ অপরাহ্ন


দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
জাপানের শেষ ট্রেন
হাবিব রহমান
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৪-০৩-২০২৬
জাপানের শেষ ট্রেন জাপানে ভ্রমণ সংগীদের সাথে লেখক


আমি জাপান ছেড়ে যাচ্ছি। তবে-কবে কখন, এই কথাটা নিকিতার সামনে এখনো স্পষ্ট করে বলিনি। তবু সে জানে। আমার সময় হয়েছে ফেরার। কিছু কথা উচ্চারণ না করলেও চোখে, থেমে যাওয়া নিঃশ্বাসে, চুপ করে থাকা সময়ের ফাঁকে ফাঁকে সব বলা হয়ে যায়। আজ আমাদের অফিসিয়াল কোন ট্যুর প্রোগ্রাম ছিলো না।নিকিতাকে নিয়ে বের হয়েছি একটু অলস সময় কাটাতে। বলা যায় উদ্দেশ্যবিহীন ঘোরাঘুরি। টোকিওর স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আমরা দু’জন।

ট্রেন ছাড়তেই টোকিও পিছিয়ে যেতে থাকে। জানালার বাইরে শহর, সেতু, নদী, সবকিছু দ্রুত পাল্টে যায়-কিন্তু নিকিতা পাশের সিটে বসে একদৃষ্টে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে। মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকায়, আবার চোখ ফিরিয়ে নেয়।

আমরা কথা বলছিলাম-খুব সাধারণ কথা। কোথায় আগে গিয়েছিলাম, কোন ক্যাফেতে কফি ভালো, কোন জায়গায় ইত্যাদি।

নিকিতা হেসেছিল।

আমি সেই হাসিটা বুকের ভেতর তুলে রেখেছিলাম- পরের দিনগুলোর জন্য। ট্রেনের কাচে আমাদের দুজনের প্রতিচ্ছবি একসাথে ভেসে উঠছিল। আমি ভাবছিলাম, এই কাচের মতো যদি সময়টাকেও ধরে রাখা যেত! নিকিতা আমাকে নিয়ে নামলো কারুইজাওয়াতা নামক একটি স্টেশনে। পাহাড়ি হাওয়ার মধ্যে একধরনের নরম বিষণ্নতা থাকে। স্টেশন থেকে একটু হাঁটতেই ছোট একটা ক্যাফে-কাঠের দরজা, ভেতরে কফির গন্ধ আর ধীরে বাজতে থাকা জাপানি জ্যাজ। নিকিতা কফির কাপটা দুই হাতে ধরে বসে থাকে। আমি ওর দিকে তাকিয়ে ভাবি-কত জায়গায় আমরা একসাথে গেছি; টোকিওর আলো, নারার হরিণ, ওকুতামার নদী, কামাকুরার মন্দিরের সিঁড়ি-সব জায়গায় ও ছিল গল্পের ভেতরের চরিত্র নয়, গল্পটাই ছিল।

দুপুরের খাবারে আমরা খুব বেশি কথা বলি না। ও মাঝেমধ্যে হাসে, আবার হঠাৎ চুপ হয়ে যায়। আমি বুঝতে পারি-এই চুপ করাটাই ওর বলা সবচেয়ে বড় কথা। বিকেলে ক্যাফের বাইরে বসে আমরা আড্ডা দিই। কিছু পুরোনো স্মৃতি, কিছু হাসি, কিছু না বলা ভবিষ্যৎ। নিকিতা হঠাৎ বলে-তুমি আবার আসবে তো?

আমি উত্তর দিতে দেরি করি। কারণ জানি, আমার হ্যাঁ-এর ভেতরে অনিশ্চয়তা আছে, আর আমার না-এর ভেতরে নিষ্ঠুরতা। সন্ধ্যায় ফেরার ট্রেনে আমরা পাশাপাশি বসে থাকি। শিনকানসেন আবার ছুটে চলে-এইবার যেন সময়টাই আমাদের বিপরীতে দৌড়ায়। নিকিতা ঘুমানোর ভান করে, মাথা জানালার দিকে হেলিয়ে। আমি দেখি, জানালার কাচে ওর চোখের কোণে জমে থাকা আলো-যেটা হয়তো অশ্রু, হয়তো বিদায়ের প্রতিফলন। টোকিও স্টেশনে নামার সময় নিকিতা আমার হাত ধরেছিল। এই প্রথম, এই শেষবার। খুব শক্ত করে নয়-যেন ছেড়ে দেওয়ার জন্যই ধরেছিল।

ও বলল না- “থেকে যাও।”

আমি বলিনি- “ফিরে আসবো।”

কিন্তু আমরা দুজনেই জানতাম, মিথ্যে আশ্বাসের চেয়ে নীরবতাই বেশি মানবিক। আমি হাঁটা শুরু করেছিলাম। পিছনে তাকাইনি। কারণ তাকালে হয়তো দেখতাম- নিকিতা দাঁড়িয়ে আছে, আর আমার দিকে তাকিয়ে আছে অপলক দৃষ্টিতে। আর সেই দৃশ্যটা সারাজীবন বুকে নিয়ে বাঁচতে হবে। আমি জানি, কাল জাপান ছেড়ে চলে যাবো। কিন্তু শিনকানসেনের জানালায়, কারুইজাওয়ার কফির কাপে, আর নিকিতার নীরব চোখে-আমি থেকে যাবো চিরকাল।

জাপানের শেষ সন্ধ্যা

জাপানে প্রায় তিন সপ্তাহের যাত্রা- কত শহর, কত পথ, কত দৃশ্য। টোকিওর ঝলমলে রাত, কিয়োটোর মন্দিরের নীরবতা, হিরোশিমার আকাশে ভাসা অব্যক্ত বিষাদ, নারার শান্ত হরিণেরা, মাউন্ট ফুজির সাদা-মেঘ-ঢাকা চূড়া, লেক আশির জলের প্রতিচ্ছবি-সব কিছুর মাঝেই একটিই ছায়া ছিল আমার পাশে, নিকিতা। স্থানীয় ট্যুর গাইড, কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই হয়ে উঠেছিল আমার যাত্রার নীরব সঙ্গী। নিকিতা কখনো সামনে হাঁটত, কখনো পাশে। কখনো পথ দেখাত, কখনো স্রেফ আমার নিঃশ্বাসের পাশে দাঁড়িয়ে থাকত। সামুরাই ভিলেজের কাঠের পথ থেকে শুরু করে জাপানিজ আল্পসের বরফ-ছোঁয়া ঢাল-সব জায়গাতেই তার উপস্থিতি ছিল নরম, অদৃশ্য, অথচ স্পষ্ট। আজ সেই শেষ দিন। ফিরে যাওয়ার আগের সন্ধ্যা।

টোকিওর একটি ছোট ক্যাফের কোণে বসেছি দু’জন। জানালার বাইরে ম্লান আলো, ভেতরে কফির মিষ্টি গন্ধ। আমাদের দু’জনের চোখেই ক্লান্তি নয়-ছিল এক ধরনের নীরব ব্যথা। নিকিতা কাপ ধরে বসে আছে। তার আঙুলের কাছে ধোঁয়া উঠে যাচ্ছে। আমি বললাম, এই কটা দিন তুমি তো ছায়ার মতো ছিলে আমার পাশে।

সে একটু হাসল-একটু ভাঙা হাসি, যা চোখ পর্যন্ত পৌঁছায়নি। তোমার যাত্রা সুন্দর হোক, এটাই আমার কাজ, সে বলল। কিন্তু কণ্ঠে কাজের পেশাদারিত্ব ছিল না-ছিল এক অদ্ভুত কাঁপুনি। দু’জনই চুপ। ক্যাফের টেবিলের ওপর রাখা দু’টি কফির কাপের চেয়েও বেশি বাষ্প যেন উঠছিল আমাদের বুকের ভেতর থেকে। মনে পড়ে যাচ্ছিল-ফুশিমি ইনারীর লাল টোরি গেটের নিচে হাঁটা সেই বিকেল.., মাউন্ট মিতাকের চূড়ায় নিকিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া.., শিরাকাওয়া-গোর তুষার ভেজা কুঁড়েঘরগুলোর সামনে তার নীরব দৃষ্টি..। গোতেমবার ঠান্ডা বাতাসে দাঁড়িয়ে তার বলা সেই ছোট বাক্য- Japan feels different when someone sees it the way you do. জাপানিজ আল্পসে হাঁটতে হাঁটতে সে আমার হাত ধরে বলেছিল, Careful, the snow is slippery. এই যত্নমাখা শব্দগুলো এখনো আমার কানে বাজে। এখন সেই মানুষটাই আমার সামনে বসে, আর আমার ভেতরে জমছে বিদায়ের শীতলতা।

আমি বললাম, আবার দেখা হবে, হয়তো?

নিকিতা একটু চুপ করে থেকে বলল, হয়তো হবে- হয়তো হবে না। কিছু মানুষ শুধু যাত্রার একটা অংশ হয়ে থাকে। তারা পুরো গল্প হয় না- কিন্তুকখনো কখনো জীবনের গল্পটাকেই বদলে দেয়। আমরা দু’জনই জানি-সময়ের নদী কারো জন্য থেমে থাকে না। কিছু বন্ধুত্ব, কিছু অনুভূতি- শুরু হয় ঠিক যখন শেষের সময়টা কাছে এসে দাঁড়ায়।

ক্যাফের ভেতর স্নিগ্ধ আলো। কফির সুগন্ধ যেন ঘরের ভেতরটাকে আরো নরম করে তুলেছে। আমাদের কথা কমে গেছে। কিন্তু নীরবতাই যেন অনেক না বলা কথা বলে যাচ্ছে। আমি নীরবতা ভেঙে বললাম, নিকিতা- তুমি ছিলে আমার যাত্রার সবচেয়ে সুন্দর অংশ। সে কিছু বলল না।

ক্যাফের মৃদু আলোয় জানালা দিয়ে দেখতে পাচ্ছিলাম বাইরে টুপটাপ বৃষ্টি হচ্ছে। টোকিওর উজ্জল আলোভিজে উঠছে সন্ধ্যার নরম বৃষ্টিতে। দু’জনের সামনে দু’টি কফির কাপ-কিন্তু আমাদের চোখের সামনে কেবলই স্মৃতির দৃশ্যগুলো নড়াচড়া করছে। অনেকক্ষণ পর নিকিতা নীরবতা ভেঙ্গে বললো- তুমি এলে-এই দেশটা আমার কাছে নতুন হয়ে উঠলো। তোমার চোখ দিয়ে আমি আবার জাপানকে দেখলাম। আমি উত্তরে কিছুই বলতে পারলাম না। একটা বেদনা বিধুর কিন্তু উষ্ণ নীরবতা যেন ঘিরে ধরলো আমাকে।

কফির কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। নিকিতা আমার পাশে এসে থামল। মৃদুকন্ঠে বললো, এই বিদায়টাই হয়তো আমাদের গল্পের সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে বেদনাময় অধ্যায়। তারপর অনুচ্চ কণ্ঠে বললো- Some roads never cross twice....But some memories keep waking with you.

Safe journey… and thank you.

তার কণ্ঠে যেন হাজার অনুচ্চারিত কথা জমে ছিল। ক্যাফের বাইরে তখন বৃষ্টি আরও জোরে নেমে আসছে। টোকিওর সড়কে আলো গলে যাচ্ছে জলের রঙে। আর কোন কথা না বলে নিকিতা তার ছোট্ট গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে গেলো। বৃষ্টি থামলে আমিও হাঁটতে শুরু করলাম। মনে হচ্ছিলো টোকিওর কোনো রাস্তায়, কিয়োটোর কোনো গলিতে বা মাউন্ট ফুজির কোনো মেঘের আড়ালে নিকিতা এখনও আমার সাথে হাঁটছে। জাপানে এসে তার সাথে সময় কাটানোটা ছিলো আমার এক সুন্দর অভিজ্ঞতা। কিন্তু আজকের এই বিদায় মুহূর্তটা ছিলো আরও বেশি মর্মস্পর্শী, আরো বেশি দুঃখ আর বেদনার।

আমি সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াই। কত মানুষের সাথে দেখা-পরিচয় হয়। কত ট‍্যুর গাইডের সেবা নিই। কিন্তু প্রতিটি ভ্রমণের শেষে কিছু মানুষ চলে যায় না-তারা রয়ে যায় হৃদয়ের গহীনে ঠিক সেই ছায়ার মতো, যাকে আর কখনও ছুঁতে না পারলেও ভুলে থাকা যায় না।

সায়েনারা জাপান, বিদায় নিকিতা

টোকিওর আকাশে তখন সন্ধ্যার নরম আলো। মনে হচ্ছিলো শহরের বাতাসে যেন অদ্ভুত এক বিষণ্নতা। চার সপ্তাহ জাপান ভ্রমন শেষে আজ নিউইয়র্কে আমার ফিরে যাবার দিন। একটু পরেই ফ্লাইট। ফিরে যাবো সেই দূর শহরে আমার প্রতিদিনের কর্মব‍্যস্ত জীবনে। গাড়ি ছুটে চলেছে হানেদা এয়ারপোর্টের দিকে। জানালার বাইরে আলো জ্বলা শুরু হয়েছে। রাস্তাগুলো ঝলমল করছে, তবু মনে হচ্ছে পৃথিবীটা নিস্তব্ধ হয়ে আছে। পাশে বসে আছে নিকিতা। আমাকে বিদায় জানাতে সেও চলেছে এয়ারপোর্টে।

জাপান ভ্রমনের পথচলার প্রতিটি মুহূর্তের সে ছিলো নীরব সাক্ষী। এই চার সপ্তাহে টোকিওর আলো ঝলমলে রাত, জাপানের প্রাচীন রাজধানী নারা’র শান্ত হরিণেরা, মাউন্ট ফুজি’র সাদা মেঘঢাকা চূড়া, আর লেক আশি’র জলে প্রতিফলিত আকাশ-সব কিছুর মাঝেই সব সময় একটি নরম ছায়া ছিল আমার পাশে। সেই ছায়ার নাম নিকিতা। তার উপস্থিতি ছিল নীরব, অদৃশ্য, অথচ স্পষ্ট-যেন ভোরের আলো, যা চোখে পড়ে না, কিন্তু চারপাশ উজ্জ্বল করে দেয়। কিন্তু আজ সে আমার পাশে থেকেও যেন দূরে। কারণ আমরা দু’জনেই জানি-আজকের যাত্রা অন্য যাত্রার মতো নয়- আজ আমি ফিরে যাচ্ছি নিউইয়র্ক, পেছনে রেখে যাচ্ছি জাপানকে, আর সাথে নিকিতাকেও।

আজ আমি আমার চিরচেনা নিউইয়র্কের পথে। কিন্তু বিদায়ের এই প্রহরটুকুও নিকিতা জাপানি আতিথেয়তার চরম পরাকাষ্ঠা দিয়ে আগলে রেখেছে। টোকিও থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত দীর্ঘ ধূসর রাস্তাটি আজ আমাদের যৌথ পদচিহ্নের শেষ সাক্ষী। আমরা দুজনেই চুপচাপ। আমাদের মাঝে শব্দের চেয়ে নৈশব্দই বেশি ভারী। যে মানুষটি গত চার সপ্তাহ জাপানের ইতিহাস আর সংস্কৃতি নিয়ে অনর্গল কথা বলেছে, আজ সেও যেন বিষণ্ণতার এক মৌন চাদর মুড়ি দিয়ে বসে আছে।

গাড়ির ভেতরে দু’জনের শ্বাস-প্রশ্বাসের ভারী ছন্দ। নিকিতার দিকে চেয়ে দেখছিলাম হালকা কমলা আলো তার মুখে পড়ে যেন এক ধরনের বিষণ্ণ সৌন্দর্য সৃষ্টি করছিলো। গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে সামনে। জানালার বাইরে শহরটা যেন ধীরে ধীরে পেছন সরে যাচ্ছে। টোকিওর স্কাইস্ক্র্যাপারগুলো ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে, দূরে সরে যাচ্ছে সেই শহর, যেখানে আমরা একসাথে হেসেছি, ঘুরেছি, গল্প করেছি।

নিকিতা নীরবতা ভেঙে বললো-রাতের ফ্লাইটগুলো খুব লোনলি হয়, তাই না! তার কণ্ঠে এমন এক কাঁপুনি ছিল, যা আমায় ভিতর পর্যন্ত নাড়িয়ে দিলো। আমি তার দিকে তাকালাম। ম্লান আলোয় তার চোখ কেমন চকচক করছিল-হয়তো আলো, হয়তো অশ্রু।

আমি নরম স্বরে বললাম-তোমাকে রেখে রাতের আকাশে উড়ে যাওয়াট খুব কঠিন লাগছে। নিকিতা হাসার চেষ্টা করলো। কিন্তু সেই হাসি পুরোটা পৌঁছতে পারল না তার চোখে। গাড়ি ধীরে ধীরে হানেদার দিকে মোড় নিল। চোখে পড়ছিলো এয়ারপোর্টের আলো দূর থেকে জ্বলজ্বল করছে। গাড়ি থামার পরে আমরা নামলাম। রাতের ঠান্ডা বাতাস শরীরে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছিলো। আমি স্যুটকেস নামিয়ে নিকিতার দিকে তাকালাম। এই প্রথম সে সরাসরি আমার চোখে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে ছিল অসহায়তা, আকুলতা, আর না বলা হাজার কথা।

তুমি গেলে-টোকিও আমার কাছে খুব quiet হয়ে যাবে, নিকিতা ফিসফিস করে বলল। তার চোখ ভিজে উঠল। মনে হলো রাতের আলোয় এক ফোঁটা অশ্রু যেন চিকচিক করে উঠলো। দূরে লাউডস্পিকারে বোর্ডিং টাইমের ঘোষণা শোনা গেলো। আমার বুকের ভেতরটা টনটন করে উঠল। নিকিতা এগিয়ে এসে খুব ধীরে, প্রায় শ্বাসের মতো নরম স্বরে বলল-Its not a goodbye, See you again. আমি মাথা নেড়ে বললাম-না, গুড বাই নয়। তুমি তো আমার জাপান ভ্রমণের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি। আর স্মৃতিগুলো কখনো জীবন থেকে মুছে যায়না, বিদায় নেয় না কখনো।

নিকিতা মাথা নিচু করে জাপানি কায়দায় শেষ অভিবাদন জানালো। কিন্তু আমি জানি, ঐ নিচু হওয়া মাথাটি আসলে একরাশ আবেগ আড়াল করার চেষ্টা। আমি হেঁটে যেতে লাগলাম গেটের দিকে। বোর্ডিং পাস হাতে নিয়ে ভেতরে ঢ়ুকে পড়লাম। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন ভারী হয়ে আসছিলো। একবার পিছনে তাকালাম। ভিড়ের মাঝেও তাকে আলাদা করে চেনা যায়। সে দাঁড়িয়ে আছে নীরব স্থির। দাঁড়িয়ে আছে ঠিক আগের সেই জায়গায়। রাতের বাতাসে তার চুল উড়ছে, এয়ারপোর্টের উজ্জল নিয়ন আলোয় তার চোখ মুখ চিকচিক করছে। মনে মনে ভাবছিলাম, জাপানকে আমি মনে রাখবো তার মন্দির, তার পাহাড়, তার সাগর, তার শহরগুলোর জন্য। কিন্তু সবচেয়ে বেশি মনে রাখবো এই এক নীরব সঙ্গীকে-যে আমার ভ্রমণকে শুধু পথচলা নয়, এক অনুভূতিতে পরিণত করেছিলো।

জাপান শুধু একটা দেশ নয়, নিকিতা শুধু একজন গাইড নয় বরং এমন এক অনুভূতি-যাকে রেখে যাওয়া যায় কিন্তু ভুলে থাকা যায় না। বিমান যখন আকাশে উঠলো টোকিও শহরটি নিচে ছোট হয়ে এলো। মনে হচ্ছিলো আমি শুধু জাপান ছেড়ে যাচ্ছি না বরং প্রশান্ত মহাসাগরের এই তীরে ফেলে যাচ্ছি আমার এক অকৃত্রিম বন্ধুকে।

জানালা দিয়ে তাকিয়ে বললাম- সায়োনারা জাপান। আর বিদায়, নিকিতা। তুমি ছিলে আমার ভ্রমণের নীরব আলো।

এই ভ্রমণ লেখার শেষ পাতায় তাই তোমারই নাম লেখা রইলো।

শেয়ার করুন