তুষারে ঢাকা জনপদ
যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে শক্তিশালী শীতকালীন ঝড় আঘাত হেনেছে। ফলে স্থানীয় সময় গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সোমবার নিউইয়র্কের অধিকাংশ স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি অফিস ও গণপরিবহন ব্যবস্থায় জরুরি সময়সূচি চালু করা হয়েছে। অঞ্চলজুড়ে ভারী তুষারপাত, প্রবল বাতাস এবং ভ্রমণ বিষয়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তুষারঝড় এরই মধ্যে ওয়াশিংটন থেকে নিউ ইংল্যান্ড পর্যন্ত পূর্ব উপকূলের যাতায়াতব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এয়ারলাইনসগুলো হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল করেছে এবং কর্মকর্তারা জনগণকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না হতে আহ্বান জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ডাক বিভাগ জানিয়েছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শীতকালীন আবহাওয়া ডাক ও পার্সেল প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও বিতরণ কার্যক্রম ধীর করে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম স্কুল ডিস্ট্রিক্ট নিউইয়র্ক নগর সব সরকারি স্কুল ভবন বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। এটিকে প্রচলিত ‘স্নো ডে’ ঘোষণা করা হয়েছে। অনলাইনে কোনো ক্লাস হবে না এবং স্কুল-পরবর্তী সব কার্যক্রমও বাতিল করা হয়েছে।
মেয়র জোহরান মামদানি নিউইয়র্ক নগরে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে গত ২২ ফেব্রুয়ারি রোববার রাত থেকে ২৩ ফেব্রুয়ারি দুপুর পর্যন্ত শহরের রাস্তায় জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সব ধরনের যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করেছেন। মেয়র জানিয়েছেন, তুষারপাত তীব্র হওয়ার কারণে রাস্তা পরিষ্কার রাখতে যান্ত্রিক লাঙল (স্নো প্লাও) ও জরুরি উদ্ধারকারী দলের জন্য রাস্তা খালি রাখা প্রয়োজন। শহরটিতে ২০১৭ সালের পর এবার প্রথমবারের মতো ‘তুষারঝড়’ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
নিউইয়র্ক নগরের সব সরকারি অফিসে সরাসরি সেবাদান বন্ধ থাকবে এবং একান্ত জরুরি নয়, মিউনিসিপ্যাল অফিসের এমন কর্মীরা বাড়ি থেকে কাজ করতে পারবেন। জোহরান বলেন, ‘আমি প্রত্যেক নিউইয়র্কবাসীকে বাড়িতে থাকার অনুরোধ করছি।’
আঞ্চলিক জরুরি অবস্থা
নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুল জানিয়েছেন, লং আইল্যান্ড, নিউইয়র্ক নগর এবং লোয়ার হাডসন ভ্যালিতে সহায়তার জন্য ১০০ ন্যাশনাল গার্ড সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। কারণ, এসব এলাকায় ভারী তুষারপাত এবং উপকূলীয় বাতাসের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি প্রকোপ ছিলো। এই ঝড়ের কারণে ২৩ ফেব্রুয়ারি সোমবার ম্যানহাটানে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দপ্তর কমপ্লেক্সও বন্ধ রাখতে হয়েছে।
ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) জানিয়েছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কিছু অংশে দুই ফুট পর্যন্ত তুষারপাত হয়েছে এবং বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৭০ মাইল পর্যন্ত ছিলো। তাই গাছ উপড়ে পড়া এবং বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। এক হালনাগাদ তথ্যে সংস্থাটি জানিয়েছে, বর্তমানে ডিএইচএসের অর্থায়ন বন্ধ থাকলেও ফেডারেল ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট এজেন্সির (ফেমা) দুর্যোগ তৎপরতা-সংক্রান্ত কাজ নিরবচ্ছিন্নভাবে চলবে। কর্মীদের যাতায়াত, জরুরি কার্যক্রম এবং দুর্যোগকবলিত মানুষের জন্য জরুরি সহায়তাদান এসব কাজের অন্তর্ভুক্ত। এসব কাজে জীবন বাঁচানো ও সম্পদ রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
গত সপ্তাহে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ফেমার শত শত ত্রাণকর্মীকে দেশের বিভিন্ন দুর্যোগকবলিত এলাকায় মোতায়েন স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছে। কারণ, ডিএইচএস বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের গভর্নর মাউরা হিলি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে সরকারি কর্মীদের বাড়িতে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। কানেটিকাট অঙ্গরাজ্যে রোববার সন্ধ্যা থেকে নির্দিষ্ট কিছু মহাসড়কে বাণিজ্যিক যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে জরুরি ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য সরবরাহ এর আওতামুক্ত থাকবে।
নিউ জার্সির গভর্নর মিকি শেরিল রাজ্যজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন এবং বাসিন্দাদের এই ঝড়কে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সিএনএনকে বলেন, ‘মানুষের উচিত এটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া।’
পরিবহনব্যবস্থায় ব্যাঘাত
তুষারঝড়ের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের কবলে পড়েছে উড়োজাহাজ পরিষেবা। ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ‘ফ্লাইটঅ্যাওয়ার’-এর তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত পাঁচ হাজারের বেশি ফ্লাইট ইতিমধ্যে বাতিল করা হয়েছে। এভিয়েশন অ্যানালিটিকস ফার্ম ‘সিরিয়াম’ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৫ হাজারের বেশি ফ্লাইট ছাড়ার কথা ছিল। তবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে আগামীকাল মঙ্গলবারও ফ্লাইট বাতিলের সংখ্যা বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি অঙ্গরাজ্যের সরকারি মালিকানাধীন গণপরিবহন সংস্থা ‘এনজে ট্রানজিট’ ২২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা থেকে বাস, শহরকেন্দ্রিক রেল ব্যবস্থা (লাইট রেল) এবং প্রতিবন্ধী বা শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিদের পরিবহন (অ্যাকসেস লিংক) পরিষেবা স্থগিত করেছে। রাজ্যজুড়ে রেল যোগাযোগও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার পরিষেবা চালু করা হয় পর;িন থেকে।
নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চলের ‘রোড আইল্যান্ড পাবলিক ট্রানজিট অথরিটি’ জানিয়েছে, তারা রাত থেকে আজ পর্যন্ত তাদের প্রতিবন্ধী বা শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিদের পরিবহনসহ (রাইড প্যারাট্রানজিট) সব ধরনের পরিষেবা সেবা স্থগিত রাখছে। আবহাওয়ার উন্নতি হলে আবার কাজ শুরুর পরিকল্পনা ঘোষণা করা হবে।
সাড়ে ৫ হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল
যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে স্থানীয় সময় গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সোমবার একটি প্রবল শীতকালীন ঝড় আঘাত হেনেছে। রেকর্ড তুষারপাতে বাধাগ্রস্ত হয়েছে লাখো মানুষের জীবন। বাতিল করা হয়েছে হাজারো উড়োজাহাজের চলাচল।
রোড আইল্যান্ড ও ম্যাসাচুসেটসের বড় একটি অংশ ৩৭ ইঞ্চি বা প্রায় ৯৪ সেন্টিমিটার পুরু তুষারে ঢাকা পড়েছে। নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে ১৯ ইঞ্চির বেশি পুরু তুষার জমেছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস।
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি নগরটিতে আবহাওয়া-সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা জারি করেছেন। রাষ্ট্রীয় একটি সংস্থা সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, নিউইয়র্কে এখন এমন পরিস্থিতি, সেখানে চলাচল করা ‘কার্যত অসম্ভব’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঝড় আর ব্যাপক তুষারপাতের জেরে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলজুড়ে ছয় লাখের বেশি বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিউজার্সি ও ম্যাসাচুসেটস।
উত্তর ক্যারোলাইনা থেকে নর্থ মেইন পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় শীতকালীন ঝড়ের সতর্কতা দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া পরে কানাডার পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ উত্তরাংশে এই সতর্কতা দেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস সতর্ক করে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ছোট অঙ্গরাজ্য রোড আইল্যান্ডে ঝড়ের সময় সবচেয়ে বেশি তুষারপাত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, অঙ্গরাজ্যটিতে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী তুষারঝড় এটি। অঙ্গরাজ্যের রাজধানী প্রভিডেন্সে ৩৬ ইঞ্চি পুরু তুষার জমেছে। এটা অঙ্গরাজ্যটির ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ তুষারপাতের রেকর্ড। এর আগে ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেখানে ২৮ দশমিক ৬ ইঞ্চি পুরু তুষার জমেছিল।
বোস্টনে ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিসের আবহাওয়াবিদ ক্যান্ডিস হ্রেন্সসিন তুষারপাতের ভয়াবহতা নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘অন্য সবার মতো আমরাও অবাক হয়ে গিয়েছি।’
রোড আইল্যান্ড ও পার্শ্ববর্তী কানেকটিকাটে ‘প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণের’ ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ম্যাসাচুসেটসের গভর্নর মাউরা হ্যালি সেখানে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন।
মাউরা অনলাইন পোস্টে বলেন, ‘আমি দক্ষিণ-পূর্ব ম্যাসাচুসেটসে প্রয়োজন ছাড়া গাড়ি চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছি। সেই সঙ্গে মহাসড়কে সর্বোচ্চ গতিসীমা প্রতি ঘণ্টায় ৪০ মাইলে (প্রায় ২৫ কিলোমিটার) কমিয়ে আনা হয়েছে।’ উড়োজাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ফ্লাইটঅ্যাওয়ার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দরগুলো থেকে ছেড়ে যেতে চাওয়া কিংবা অবতরণে ইচ্ছুক ৫ হাজার ৭০৬টির বেশি উড়োজাহাজের চলাচল বাতিল করা হয়েছে।
ওয়েবসাইটটি বলেছে, নিউইয়র্কের লাগার্ডিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৯৮ শতাংশ ও জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৯১ শতাংশ উড়োজাহাজের চলাচল বাতিল হয়েছে। এসব বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিদিন ৩ লাখ ৩৫ হাজারের বেশি মানুষ চলাচল করেন। দুটি জায়গাতেই প্রায় ১৫ ইঞ্চি বা ৩৮ সেন্টিমিটার পুরু তুষার জমেছে।
বোস্টনের লোগান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সোমবার উড্ডয়নের কথা থাকা প্রায় ৯২ শতাংশ উড়োজাহাজের চলাচল বাতিল করা হয়েছে। নিউজার্সির নিউয়ার্ক লিবার্টি বিমানবন্দরের ৯২ শতাংশ এবং ফিলাডেলফিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রায় ৮০ শতাংশ উড়োজাহাজের চলাচল বাতিল করা হয়েছে।