১৩ মে ২০২৬, বুধবার, ০৮:০৬:৪৮ অপরাহ্ন


ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ-১০
ভাঙা মন্দিরের শহরে
হাবিব রহমান
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৩-০৫-২০২৬
ভাঙা মন্দিরের শহরে থাইল‍্যান্ডের আয়ুথায়া মন্দির


ব্যাংককের হুয়ালামফং স্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়লো ঠিক ৭টায়। জানালার পাশে বসে আছি একা। শহর ধীরে ধীরে পেছনে সরে যাচ্ছে, উঁচু বিল্ডিং, ব্যস্ত রাস্তা, নিয়ন সাইনের ভিড়। তারপর হঠাৎ করেই সব বদলে গেল। সবুজ ধানক্ষেত, নারকেল গাছের সারি, মাঝে মাঝে ছোট্ট মন্দিরের সোনালি চূড়া-যেন থাইল্যান্ডের আসল মুখটা এখানেই লুকিয়ে আছে। 

গন্তব্য সে বহুদিনের স্বপ্ন, থাইল‍্যান্ডের ইউনেসকো হেরিটেজ-URÑHistoric City of Ayutthaya। দেড় ঘণ্টার যাত্রা। ট্রেনের ঝাঁকুনিতে চোখ বুজে আসছিল, কিন্তু ঘুমাতে মন চাইছিল না। বাইরে চাওয়া ফিরয়ার নদী মাঝে মাঝে চকচক করে উঠছে সকালের আলোয়। জেলেরা ছোট ছোট নৌকায় জাল ফেলছে। একটা বক উড়ে গেল জানালার পাশ দিয়ে সাদা পাখনা মেলে, নিঃশব্দে। আয়ুথায়া স্টেশনে নামতেই বাতাসে একটা আলাদা গন্ধ- ফুলের, ধূপের আর পুরোনো পাথরের মিশ্রণ। 

স্টেশনের বাইরে একটা সাইনবোর্ড ধরে দাঁড়িয়েছিল আমার গাইড নুয়ান। বয়স বড়জোর পঁচিশ। থাই মেয়েদের স্বভাবসিদ্ধ সে উজ্জ্বল হাসিমুখ। কিন্তু চোখে একটা গভীরতা আছে, যেন এই শহরের প্রতিটা পাথরের সঙ্গে তার পুরোনো পরিচয়। পরনে হালকা হলুদ রঙের থাই ড্রেস, চুলে একটা সাদা ফুল গোঁজা। 

Welcome! I’m Nuan. your guide today.

আমি নুয়ানের দিকে হাত বাড়িয়ে বললাম, Habib from Newyork. ও আমার বাড়ানো হাতটা ধরে একটা ঝাঁকি দিয়ে হাসলো। তুমি প্রথমবার এসেছো আয়ুথায়ায়? -জিজ্ঞেস করলো সে। কিন্তু ভঙ্গিটা এমন যে মনে হলো অনেক দিনের চেনা কেউ প্রশ্ন করছে। 

হ্যাঁ, প্রথমবার। 

নুয়ান একটা সাইকেল রিকশা ডাকলো। এটাতে চড়ে পৌঁছলাম ওয়াট মহাথাতে। ঢোকার মুখেই থমকে গেলাম। বিশাল মাঠজুড়ে শুধু ভাঙা স্তম্ভ, মাথাহীন বুদ্ধমূর্তি, আর শ্যাওলাধরা পাথরের স্তূপ। আর সে বিখ্যাত দৃশ্য গাছের শিকড়ের ভেতরে আটকে থাকা বুদ্ধের মাথা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রকৃতি আর ইতিহাস যেন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে। 

নুয়ান এসে পাশে দাঁড়াল। বললো, এটা দেখলে আমার সব সময় মনে হয়, গাছটা বুদ্ধকে ধরে রেখেছে, নাকি বুদ্ধ গাছকে?

দুজন দুজনকে, বললাম। 

সে একটু অবাক হয়ে তাকালো। তারপর মৃদু হাসলো। তারপর শুরু হলো ইতিহাসের গল্প-নুয়ানের কণ্ঠে, যেন সে নিজে সে সময়ের সাক্ষী। ১৩৫১ সালে রাজা উ-থং এ শহর প্রতিষ্ঠা করেন, বললো সে ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে। চারদিকে নদী-চাও ফ্রায়া, লোপবুরি, পাসাক। এ নদীগুলোই ছিল আয়ুথায়ার প্রাচীর। শত্রু আসবে কীভাবে?

কিন্তু এলো তো? নুয়ান একটু থামলো। কোনো একটা ভাঙা স্তম্ভের গায়ে হাত রাখল আলতো করে। ১৭৬৭ সালে বার্মিজ সেনারা এলো। আট মাস যুদ্ধের পর... সব শেষ। মন্দির পুড়িয়ে দিলো, মূর্তি ভাঙলো, সোনা লুট করলো। ৪০০ বছরের রাজধানী একদিনে ছাই হয়ে গেল। তোমার কথা শুনলে মনে হয় নিজ চোখে দেখেছো? সে ঘুরে তাকালো। চোখে একটা অদ্ভুত আলো। বললো, আমার দাদুর দাদু এখানেই থাকতেন। এ মাটি আমার রক্তে আছে। আমাদের পরের গন্তব্য ওয়াট ফ্রা শ্রি সানফেত। তিনটি বিশাল স্তূপ-তিন রাজার স্মৃতিতে নির্মিত। সাদা চুনাপাথরের এ স্তূপগুলো আকাশের দিকে দাঁড়িয়ে আছে নিরুদ্বেগে। 

নুয়ান বলল, এগুলো দেখলে আমি ভাবি, মানুষ মরে যায়, কিন্তু পাথর থাকে। তাহলে কি পাথরই বেশি সত্যি? না, বললাম। যে মানুষটা এ পাথর গড়েছিল, তার স্বপ্নটা সত্যি। পাথর শুধু সেই স্বপ্নের ছায়া। নুয়ান আমার দিকে তাকিয়ে বললো, তুমি কি কবি? না। শুধু তোমার মতো ভালো গাইড পেলে কবিতা বেরিয়ে আসে-আমি বললাম। নোয়ান আমার কথার জবাব না দিয়ে সামনে হাঁটতে শুরু করলো। আমি তাকে অনুসরণ করলাম। 

রোদ মাথায় চড়তেই নুয়ান নিয়ে গেল একটা ছোট্ট রেস্টুরেন্টে, নদীর ধারে, কাঠের মেঝেতে, বাঁশের বেড়া দেওয়া। ছাদ নেই, উপরে শুধু বিশাল একটা আমগাছের ছায়া। বললো, এখানে ট্যুরিস্ট কম আসে। তাই খাবার অথেনটিক। অর্ডার করলো সে নিজেই। থাই ভাষায় দ্রুত কয়েকটা কথা বললো রান্নাঘরের দিকে। একটু পরে এলো-খাও ম্যান গাই, সিদ্ধ মুরগি, সুগন্ধি চালের ভাত, আদা-রসুনের ঝোল। সঙ্গে টম ক্লা গাই-নারকেল দুধের স্যুপে মুরগি, গালাঙ্গাল, লেমনগ্রাস আর ছোট্ট একটা বাটিতে নাম ফ্রিক পাও-ভাজা মরিচের চাটনি। 

প্রথম চামচ মুখে দিতেই চোখ বন্ধ হয়ে গেল। মিষ্টি, ঝাল, টক, নোনতা-সব একসঙ্গে। কেমন লাগছে? নুয়ান অপেক্ষায়। মনে হচ্ছে এ শহরের পুরো ইতিহাসটা এক বাটি স্যুপে আছে। সে খিলখিল করে হেসে উঠে বললো, তুমি আসলেই একজন কবি। খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে কথা হলো। নুয়ান জানাল, সে চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়েছে। এখন গাইডের কাজ করে। কারণ-বইয়ে যা আছে, সেটা ইতিহাস। কিন্তু মানুষকে সেই ইতিহাস অনুভব করাতে পারলে সেটা হয় স্মৃতি। আমি স্মৃতি তৈরি করতে চাই। আজকের দিনটা আমার স্মৃতিতে থাকবে-আমি বললাম। 

শুধু জায়গার কারণে? প্রশ্নটা করেই সে জানালার বাইরে নদীর দিকে তাকিয়ে রইলো। আমিও কোনো উত্তর দিলাম না। কিছু কথার উত্তর নীরবতাতেই সুন্দর। বিকালে গেলাম নদীর ওপারে-নৌকায় করে। এ মন্দিরটা আলাদা। আঙ্কোর ভাটের অনুপ্রেরণায় তৈরি। বিকালের সোনালি আলোয় ইটের লাল রঙ যেন জ্বলছে। নুয়ান বললো, এ মন্দিরের প্রতিটা ইট এখনো গরম থাকে সূর্য অস্ত যাওয়ার পরেও। যেন ভেতরে আগুন আছে। মন্দিরের সিঁড়িতে পাশাপাশি বসলাম। নদীর ওপার থেকে বাতাস আসছে। নুয়ানের চুলের সেই সাদা ফুলটা একটু কাঁপছে। 

তুমি কি কখনো একা একা এখানে আসো? প্রতি পূর্ণিমায়। রাতে এ মন্দির অন্যরকম হয়ে যায়। চাঁদের আলোয় ছায়াগুলো কথা বলে, নুয়ান বলে। পরের পূর্ণিমায় আমিও আসবো-আমি বললাম। সে পাশ ফিরে তাকালো। গোধূলির আলোয় তার চোখ দুটো একটু বেশি উজ্জ্বল মনে হলো। 

বললো, তুমি সত্যি আসবে? তুমি গাইড থাকলে অবশ্যই।

-আমি বললাম। সে আর কিছু বললো না। তার নোট বুকের একটা পাতা ছিড়ে ফোন নম্বরটা লিখে আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো। ট্রেনের সময় হওয়ার আগে নুয়ান নিয়ে গেল একটা ক্যাফেতে। নাম ইধধহ ইড়ৎধহ ঈধভল্ক- পুরোনো থাই বাড়িকে ক্যাফেতে রূপান্তরিত করা হয়েছে। কাঠের মেঝে, পুরোনো সাদাকালো ছবি দেওয়ালে, কোণে একটা ছোট্ট ফোয়ারা। দুটো থাই আইসড কফি এলো- ঘন কনডেন্সড মিল্কের সঙ্গে কফি, বরফ ভাসছে। 

প্রথম চুমুকেই বললাম, এ কফির মতো আজকের দিনটাও- মিষ্টি, কিন্তু শেষে একটা তিক্ততা আছে। কোনো তিক্ততা? নুয়ান অবাক হয়ে জানতে চাইলো! চলে যেতে হবে-আমি বললাম। নুয়ান আমার দিকে না তাকিয়ে কফির গ্লাসটা টেবিলে রাখলো। বাইরে দিয়ে একটা টুকটুক গেল রাস্তায়, ধুলো উড়িয়ে। আমি আবার বললাম, ইতিহাসও তো শেষ হয়ে যায়। কিন্তু আমরা তো মনে রাখি। তোমাকে মনে রাখবো-নুয়ান বললো। 

ব‍্যাংককের ট্রেনে উঠলাম সন্ধ্যায়। স্টেশনে নুয়ান দাঁড়িয়ে থাকল যতক্ষণ ট্রেন দেখা যায়। জানালা দিয়ে দেখলাম আকাশে তারা উঠেছে। ধানক্ষেতগুলো ডুবে গেছে অন্ধকারে। শুধু মাঝে মাঝে গ্রামের আলো জ্বলছে। দূরে কোথাও একটা মন্দিরের চূড়া অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। ভাবছিলাম আয়ুথায়া একটা শহর নয়। এটা একটা অনুভূতি-যে শহর একবার ধ্বংস হয়েছে, কিন্তু মরেনি। যার পাথরে এখনো উষ্ণতা আছে, যার মাটিতে নুয়ানের মতো মেয়েরা ইতিহাসকে শ্বাস দিয়ে বাঁচিয়ে রাখছে। আয়ুথায়া, ইতিহাসের শহর। যেখানে পাথর কথা বলে, আর মানুষ কবিতা হয়ে যায়। ট্রেন এগিয়ে চললো ব্যাংককের দিকে। আর আমি পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম, নুয়ানের ফোন নম্বরটা আমার হাতের মুঠোয়। পরের পূর্ণিমা বেশি দূরে নয়। আমাকে আরো একবার আসতে হবে। 

শেয়ার করুন