প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন নাগরিক যাদের কর্মস্থলে কোনো রিটায়ারমেন্ট প্ল্যান নেই এমন ৫৬ মিলিয়ন কর্মী আমেরিকান নাগরিককে অবসরকালীন সঞ্চয় ব্যবস্থার আওতায় আনতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ৭ মে এক গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন। হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ আদেশে স্বাক্ষর করেন। নতুন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট ‘ট্রাম্পআইআরএ ডট গভ’ নামে একটি সরকারি ওয়েবসাইট ১ জানুয়ারি, ২০২৭ চালু করবে, যেখানে সাধারণ কর্মীরা বিভিন্ন বেসরকারি অবসর সঞ্চয় প্রকল্প তুলনা করে নিজেদের জন্য উপযুক্ত পরিকল্পনা বেছে নিতে পারবেন। ট্রাম্প বলেন, আমাদের দেশের মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ কর্মজীবনে কঠোর পরিশ্রম করলেও তাদের অবসর জীবনের জন্য কোনো নিরাপদ সঞ্চয় ব্যবস্থা নেই। এ উদ্যোগ সেই বৈষম্য দূর করবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত পরিকল্পনায় সরাসরি কোনো নতুন সরকারি অবসর তহবিল গঠন করা হচ্ছে না। বরং সরকার একটি কেন্দ্রীয় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে, যার মাধ্যমে কর্মীরা বেসরকারি খাতের বিভিন্ন আইআরএ বা ইন্ডিভিজুয়াল রিটায়ারমেন্ট অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে জানতে পারবেন এবং সহজে তাতে যুক্ত হতে পারবেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বহু কর্মী বিশেষত: খণ্ডকালীন কর্মী, স্বনিয়োজিত ব্যক্তি, ছোট ব্যবসার কর্মচারী ও স্বাধীন ঠিকাদাররা কর্মস্থল থেকে কোনো ৪০১ (কে) বা পেনশন সুবিধা পান না। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, নতুন উদ্যোগ তাদের জন্য অবসর সঞ্চয়ের দরজা খুলে দেবে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৫৬ মিলিয়ন আমেরিকান কর্মীর কর্মস্থলে কোনো অবসর সঞ্চয় সুবিধা নেই। তবে গবেষণায় বলা হয়েছে, এ নতুন উদ্যোগের ফলে অন্তত ২২ মিলিয়ন মানুষ সরাসরি উপকৃত হতে পারেন।
এ নির্বাহী আদেশের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সেভার্স ম্যাচ কর্মসূচি। এটি ২০২২ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময় পাস হওয়া একটি আইনের অংশ। আগামী বছর জানুয়ারি থেকে এ কর্মসূচি কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মীদের অবসর সঞ্চয়ে ফেডারেল সরকার সরাসরি অর্থ যোগ করবে। অর্থাৎ কেউ যদি আইআরএ, রথ আইআরএ বা ৪০১(কে)-এ নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা করেন, তাহলে সরকারও একটি অংশ ‘ম্যাচ’ হিসেবে যোগ করবে। একক করদাতাদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১ হাজার ডলার পর্যন্ত এবং যৌথভাবে কর জমা দেওয়া দম্পতিদের জন্য সর্বোচ্চ ২ হাজার ডলার পর্যন্ত সরকার অবদান রাখতে পারে।বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী, যেসব একক করদাতার বার্ষিক আয় ২০ হাজার ৫০০ ডলারের কম, তারা সর্বোচ্চ সরকারি ম্যাচ পাবেন। আয় ৩৫ হাজার ৫০০ ডলার পর্যন্ত হলে আংশিক ম্যাচ সুবিধা পাওয়া যাবে। যৌথ করদাতাদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সুবিধার সীমা ৪১ হাজার ডলার পর্যন্ত। ৭১ হাজার ডলার পর্যন্ত আয়কারীরাও আংশিক সুবিধা পেতে পারেন। এ সুবিধা আইআরএ, রথ আইআরএ এবং ৪০১(কে)-এ জমাকৃত অর্থের ওপর প্রযোজ্য হবে।
ওভাল অফিসে নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষরের সময় ট্রাম্প বলেন, যেসব আমেরিকান কর্মীর কোনো নিয়োগকর্তা-প্রদত্ত অবসর পরিকল্পনা নেই, তাদের জন্য এটি সত্যিই বিপ্লবী পদক্ষেপ হবে। তিনি আরো বলেন, আমাদের দেশের মহান শ্রমজীবী মানুষ,যারা আমেরিকাকে গড়ে তুলেছেন। তাদের অবসর জীবন সুরক্ষিত হওয়া উচিত। ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণেও ট্রাম্প একই বিষয় উল্লেখ করেছিলেন। তখন তিনি বলেন, দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ কর্মস্থলে অবসর সঞ্চয় সুবিধা পান না। আমরা এ বৈষম্য দূর করতে চাই।
ট্রাম্প প্রশাসন শুধু নিম্ন আয়ের কর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। হোয়াইট হাউসের ন্যাশনাল ইকোনমিক কাউন্সিলের পরিচালক কেভিন হাসেট জানান, প্রশাসন কংগ্রেসের সঙ্গে আলোচনা করছে যাতে আয়ের সীমা বাড়িয়ে আরো বেশি মানুষকে সেভার্স ম্যাচ কর্মসূচির আওতায় আনা যায়। হাসেট বলেন, শুধু নিম্ন আয়ের মানুষ নয়, অনেক মধ্যবিত্ত কর্মীরও কোনো অবসর পরিকল্পনা নেই। আমরা চাই আরো বেশি মানুষ এ সুবিধা পাক।
যুক্তরাষ্ট্রে অবসরকালীন সঞ্চয় ব্যবস্থা অনেকাংশে নিয়োগকর্তা-নির্ভর। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত ৪০১(কে) পরিকল্পনা দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে কর্মীর জমার সঙ্গে নিয়োগকর্তাও অতিরিক্ত অর্থ যোগ করে। কিন্তু ছোট প্রতিষ্ঠান, অস্থায়ী চাকরি কিংবা গিগ ইকোনমিতে কর্মরত লাখো মানুষ এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এএআরপির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৫৬ মিলিয়ন আমেরিকান কর্মীর কর্মস্থলে কোনো অবসর পরিকল্পনা নেই। এদের মধ্যে রয়েছেন স্বাধীন ঠিকাদার, উবার বা ডেলিভারি অ্যাপভিত্তিক কর্মী, খণ্ডকালীন কর্মচারী, ছোট ব্যবসার কর্মী এবং স্বনিয়োজিত ব্যক্তি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে অবসর সঞ্চয় না থাকলে এ জনগোষ্ঠীর বড় অংশ বার্ধক্যে আর্থিক সংকটে পড়তে পারে।
পিউ রিসার্চের ২০২৪ সালের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, সেভার্স ম্যাচ কর্মসূচি থেকে অন্তত ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ উপকৃত হতে পারেন। অন্যদিকে রিটায়ারমেন্ট ক্লিয়ারিংহাউস ও বোস্টন রিসার্চ টেকনোলজিসের গবেষণায় দেখা গেছে, এ কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে অবসর সঞ্চয়ের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। গবেষণা অনুযায়ী, কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক কর্মীদের বড় অংশ তরুণ, তাদের আয় তুলনামূলক কম এবং অবসরকালীন সঞ্চয়ও সাধারণত কম। ফলে সরকারি ম্যাচিং সুবিধা তাদের জন্য বিশেষ সহায়ক হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নারীরা পুরুষদের তুলনায় বেশি সময় কর্মজীবনের বাইরে থাকেন বিশেষত সন্তান লালন-পালন বা পারিবারিক দায়িত্বের কারণে। ফলে তাদের অবসর সঞ্চয়ও প্রায়ই কম হয়। নতুন কর্মসূচি কম আয়ের নারী কর্মীদের জন্য বাড়তি উৎসাহ হিসেবে কাজ করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সরকারি ম্যাচিং সুবিধা নারীদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে। ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি ‘ট্রাম্পআইআরএ ডট গভ’ চালুর পরিকল্পনা করছে। এ ওয়েবসাইটে ব্যবহারকারীরা বিভিন্ন আইআরএ পরিকল্পনা তুলনা করতে পারবেন, ফি ও বিনিয়োগ সুবিধা দেখতে পারবেন, নিজেদের আয় অনুযায়ী সম্ভাব্য সরকারি ম্যাচ হিসাব করতে পারবেন এবং সরাসরি নিবন্ধন করতে পারবেন। সরকারের দাবি, এ প্ল্যাটফর্ম অবসর সঞ্চয় ব্যবস্থাকে আরো সহজ ও স্বচ্ছ করবে।
যদিও ট্রাম্প প্রশাসন এ উদ্যোগকে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছে, সমালোচকরা বলছেন এটি পুরোপুরি নতুন কোনো ধারণা নয়। কারণসেভার্স ম্যাচ কর্মসূচি মূলত বাইডেন প্রশাসনের সময় পাস হওয়া আইনের অংশ। ট্রাম্প প্রশাসন সে সুবিধা বাস্তবায়নের জন্য একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে মাত্র। কিছু বিশ্লেষক আরো বলছেন, শুধু ওয়েবসাইট তৈরি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নিম্ন আয়ের মানুষদের নিয়মিত সঞ্চয়ের সক্ষমতা সীমিত। ফলে বাস্তবে কতজন এতে অংশ নেবেন, সেটি বড় প্রশ্ন।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি স্টেটে অটো-আইআরএ নামে কর্মসূচি চালু রয়েছে। এতে যেসব কর্মীর কর্মস্থলে অবসর পরিকল্পনা নেই, তাদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইআরএতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এএআরপি জানিয়েছে, ইতোমধ্যে ১০ লাখের বেশি আমেরিকান এসব কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছেন। মর্নিংস্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদি ফেডারেল পর্যায়ে জাতীয় অটো-আইআরএ কর্মসূচি চালু হয়, তাহলে আরো ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ অবসর সঞ্চয় ব্যবস্থায় যুক্ত হতে পারেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এ পদক্ষেপ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক-দুদিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে শ্রমজীবী ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ভোটারদের আকৃষ্ট করতে রিপাবলিকান প্রশাসন অবসর সঞ্চয় ইস্যুকে সামনে আনছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ট্রাম্প বিশেষভাবে ‘ভুলে যাওয়া আমেরিকান শ্রমিকদের’ কথা উল্লেখ করেছেন, যা তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বার্তার অংশ। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এ উদ্যোগ ইতিবাচক ফল দিতে পারে, যদি মানুষ নিয়মিত সঞ্চয়ে উৎসাহিত হয়। কারণ অবসর সঞ্চয়ে ‘কম্পাউন্ড গ্রোথ’ বা চক্রবৃদ্ধি হারে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুবিধা রয়েছে। অল্প বয়সে সামান্য সঞ্চয় শুরু করলেও কয়েক দশক পরে তা বড় অঙ্কে পরিণত হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বিনিয়োগ ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে, নিম্ন ফি-সম্পন্ন পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে এবং সাধারণ মানুষকে আর্থিক শিক্ষা দিতে হবে।
বর্তমানে ট্রেজারি বিভাগ ও কংগ্রেসের সঙ্গে আলোচনা চলছে। প্রশাসন আয়ের সীমা বাড়ানো এবং আরো বেশি মানুষকে সরকারি ম্যাচিং সুবিধার আওতায় আনার চেষ্টা করছে। যদি পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের অবসর সঞ্চয় ব্যবস্থায় এটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে গিগ ইকোনমি, খণ্ডকালীন চাকরি এবং স্বনিয়োজিত কর্মসংস্থানের যুগে, যেখানে প্রচলিত পেনশন সুবিধা দ্রুত কমে যাচ্ছে, সেখানে এ উদ্যোগ নতুন সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর ভিত্তি তৈরি করতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত এর সফলতা নির্ভর করবে মানুষ কতটা সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়, রাজনৈতিক সমর্থন কতটা থাকে এবং সরকার বাস্তবায়নে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে তার ওপর।